Advertisement

অরুন্ধতী রায়ের কলাম/ককরোচ ডেমোক্রেসি: নিরস্ত্র কিন্তু বিপজ্জনক

অরুন্ধতী রায়
ককরোচ ডেমোক্রেসি: নিরস্ত্র কিন্তু বিপজ্জনক
২০ জুলাই ভারতের পার্লামেন্টের অভিমুখে পদযাত্রার সময় নিরাপত্তা কর্মীরা এক বিক্ষোভকারীকে আটক করেন। ছবি: সংগৃহীত

সব মানুষকে কি সব সময়ের জন্য বোকা বানিয়ে রাখা যায়? সারাক্ষণ কি ১৫০ কোটি মানুষের একটি দেশকে লাশের মতো টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া যায়? তা কখনো যায় না। ‘ককরোচ’ তথা তেলাপোকারা এখন রাজপথে নেমে এসেছে। বহু বছর পর আবার নিজেকে একজন ভারতীয় হিসেবে ভাবতে ভালো লাগছে। ঠিক যখন মানুষ সব আশা হারিয়ে ফেলছিল, তখনই তারা এল। বৃষ্টির তোড়ে ভেসে আসা তরতাজা একদল তরুণ তেলাপোকা। এক বিচারক আর এক তামাশার অপবিত্র মিলনে এদের জন্ম।

আমরা সবাই এই গল্পটি জানি। তবুও ইতিহাসের পাতায় ধরে রাখার জন্য এটি আরেকবার বলা দরকার। ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এক অহংকারী ও অবমাননাকর মন্তব্য করেছিলেন। তিনি ভারতের কয়েকজন বেকার যুবককে ‘তেলাপোকা’ বলে উপহাস করেন। এর প্রতিক্রিয়ায় বোস্টনে বসবাসরত ভারতীয় ছাত্র অভিজিৎ দীপকে ইনস্টাগ্রামে একটি পোস্ট দেন। তিনি লেখেন, ‘সব তেলাপোকা যদি একসঙ্গে দল বাঁধে, তবে কী হবে?’

মুহূর্তেই লাখ লাখ মানুষ তার এই ডাকে সাড়া দেয়। আর এভাবেই জন্ম নেয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। দীপকে হয়ে ওঠেন এই আন্দোলনের মূল কাণ্ডারি। আন্দোলনের প্রথম দাবি ছিল শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। একটি দুর্নীতিগ্রস্ত ও পচে যাওয়া মন্ত্রণালয়ের মাথায় বসে আছেন তিনি। তার আমলেই একের পর এক সরকারি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে। বিরোধী দলগুলোর হিসাব অনুযায়ী, ২০১৪ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১৫২ বার প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে।

এই প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা লাখ লাখ তরুণ-তরুণীর জীবন ধ্বংস করে দিয়েছে। বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম করে তারা পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছিল। সন্তানদের পড়াশোনার খরচ ও পরীক্ষার ফি জোগাতে অনেক অভিভাবককে জমি বা বাড়ি বিক্রি করতে হয়েছে। এটি মূলত বৈধ উপায়ে চাঁদাবাজির এক নতুন রূপ। সম্প্রতি ‘নিট’ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে ১২ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন।

অনলাইনে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ যখন সুনামির মতো ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন ৬ জুন বোস্টন থেকে ফিরে আসেন দিপকে। বিমানবন্দর থেকে তিনি সরাসরি দিল্লির বিখ্যাত প্রতিবাদস্থল যন্তর মন্তরে যান। লাদাখের সুপরিচিত সমাজকর্মী ও শিক্ষা সংস্কারক সোনম ওয়াংচুক তার সঙ্গে যোগ দেন। তিনি অনির্দিষ্টকালের জন্য অনশন ধর্মঘট ঘোষণা করেন।

কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়ার (লিবারেশন) ছাত্রসংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (আইসা) ছয় শিক্ষার্থীও তাদের পাশে দাঁড়ান। তারা হলেন নেহা বোরা, মনীশ কুমার, আমিন আমিতোষ, দানিশ আলী, হৃষীকেশ ও দীপক। তারাও পাশে অন্য একটি মঞ্চে অনশন শুরু করেন। ভারতের অন্যান্য শহরেও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। অনশনকারীদের শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকলে ইন্টারনেটে সক্রিয় তরুণ তেলাপোকারা সশরীরে যন্তর মন্তরে জড়ো হতে থাকেন।

ককরোচ জনতা পার্টি ঘোষণা করে, ২০ জুলাই সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন শুরুর দিন তারা সংসদ ভবন অভিমুখে পদযাত্রা করবে। এই পদযাত্রার দুই দিন আগে পুলিশ সোনম ওয়াংচুককে প্রতিবাদ মঞ্চ থেকে জোর করে তুলে নিয়ে যায়। প্রথমে তাকে একটি সরকারি হাসপাতালে আটক রাখা হয়। পরে তার স্ত্রীর জোরাজুরিতে একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানেও তিনি অনশন চালিয়ে যান। ২০ জুলাই সকালে পদযাত্রার দিন আইসা শিক্ষার্থীরা তাদের অনশন ভঙ্গ করেন।

দলে দলে তরুণ আন্দোলনকারীরা পুরো রাজধানী কাঁপিয়ে দেন। তারা ট্রেন, বাস, বিমান ও মেট্রোতে চড়ে আসতে শুরু করেন। প্রতি ঘণ্টায় তাদের সংখ্যা বাড়ছিল। দিল্লির বর্ষার আকাশে সূর্যের প্রথম আলো ফোটার আগেই যান্তর মন্তরে লাখো তরুণ জড়ো হন। সূর্য ওঠার পর একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে যায়। যে তরুণদের চোখের সামনে তাদের ভবিষ্যত কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তারা এবার মাঠে নেমেছেন। আমাদের পূর্বপুরুষেরা যে অধিকারগুলো ছেড়ে দিয়েছিলেন, তা উদ্ধার করতে এসেছেন তারা।

তারা নাগরিক অধিকার ও মর্যাদা ফিরে পেতে মরিয়া। তরুণদের সাহস, শালীনতা ও কৌতুকবোধের সামনে আমাদের চিরচেনা ভয় ও জড়তা কর্পূরের মতো উড়ে যায়। দিনের শেষে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে এই আন্দোলন শুধু নেতাদের তোলা দাবির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এটি আরও বড় আকার ধারণ করেছে। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান এখন কোনো বড় বিষয় নন। লড়াইটা আরও অনেক বড় জায়গায় পৌঁছে গেছে। পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার গোড়া থেকে চূড়া পর্যন্ত যে পচন ধরেছে, তা এখন পচা লাশের মতো গন্ধ ছড়াচ্ছে। এমনকি সাত-আট বছর বয়সী ছোট্ট আন্দোলনকারীরাও সেটি খুব স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দিচ্ছিল।

পদযাত্রার কয়েক দিন আগে সরকার অতি গোপনে একজন নতুন পুলিশ প্রধান নিয়োগ দেয়। আমাদের ক্ষমতাধর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভয়ংকর সব পরিকল্পনার কথাও বাতাসে ভাসছিল। কিন্তু পুলিশ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০ জুলাইয়ের ওই জনসুনামি রুখতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়। তারা আন্দোলনের গভীরতা বুঝতে ভুল করেছিলেন। সরকার সব ধরনের চেষ্টা করেছিল। তারা বাস, রাস্তা ও মেট্রো স্টেশন বন্ধ করে দেয়। কিন্তু তাতে কোনো লাভ হয়নি।

তারা ইন্টারনেট বন্ধ করারও চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ইন্টারনেটের দুনিয়ায় বাস করা এই তরুণদের তা দিয়ে দমানো যায়নি। তারা একটার পর একটা ব্যঙ্গাত্মক ছবি (মিম) ও ভিডিও দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভাসিয়ে দেন। এগুলো দেখে একই সঙ্গে হাসি ও কান্না পায়। দিল্লির মতো একটি অনিরাপদ শহরেও তরুণী আন্দোলনকারীরা ভিড়ের মধ্যে নিরাপদ বোধ করার কথা জানিয়েছেন। যদিও কয়েকজন পুলিশের বিরুদ্ধে আপত্তিকর স্পর্শের অভিযোগ তুলেছেন।

২০ জুলাই ভারতের পার্লামেন্টের কাছে উইন্ডসর প্লেস গোলচত্বর ও লা মেরিডিয়ান হোটেলের এলাকায় পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছোড়ার পর বিক্ষোভকারীরা তাদের মুখ ঢেকে ফেলছেন। ছবি: সংগৃহীত
২০ জুলাই ভারতের পার্লামেন্টের কাছে উইন্ডসর প্লেস গোলচত্বর ও লা মেরিডিয়ান হোটেলের এলাকায় পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছোড়ার পর বিক্ষোভকারীরা তাদের মুখ ঢেকে ফেলছেন। ছবি: সংগৃহীত

আমরা সেখানে মুসলিম, হিন্দু, খ্রিষ্টান, শিখ, বৌদ্ধসহ সব ধর্মের ও সব শ্রেণির মানুষকে একত্র হতে দেখেছি। পুলিশের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তারা একে অপরকে সাহায্য ও রক্ষা করছিলেন। তারা আমাদের সামনে কোনো বড় বড় বক্তৃতা দেননি। বরং কাজের মাধ্যমে দেখিয়ে দিয়েছেন আমাদের স্বপ্নের সেই সুন্দর ভারত কেমন হতে পারে।

এই পরিস্থিতি সামলাতে পুলিশ তাদের ধাতব হলুদ ব্যারিকেডগুলো ঝালাই করে আটকে দেয়। তারা পাথরের ট্রাক এবং আগে থেকেই ভেঙে রাখা কিছু গাড়ি নিয়ে আসে। এর মাধ্যমে তারা দেখাতে চেয়েছিল যে আন্দোলনকারীরা সহিংস হয়ে উঠেছে এবং পুলিশ কেবল আত্মরক্ষা করছে। পুলিশ লাঠি সোটা নিয়ে ছদ্মবেশী গুন্ডাবাহিনী নামিয়ে দেয়।

মারমুখী অভিযানের প্রস্তুতি হিসেবে র‍্যাপিড অ্যাকশন ফোর্সের (র‍্যাফ) সদস্যরা নিজেদের ইউনিফর্ম থেকে নামফলকগুলো খুলে ফেলেন। সরকারের অনুগত গণমাধ্যমগুলো মিথ্যা খবর প্রচারের জন্য প্রস্তুত ছিল। তাদের কেউ কেউ তো ঘটনাই ঘটেনি এমন খবর আগেভাগেই প্রচার করা শুরু করে দেয়। ভারতের সংবাদমাধ্যমগুলো বর্তমানের চেয়ে ভবিষ্যত নিয়ে বেশি চিন্তিত থাকে।

কিন্তু তাদের কোনো ফন্দিই কাজ করেনি। পুলিশ ও র‍্যাফ বেপরোয়া লাঠিচার্জ শুরু করে। এতে শিশুদের মাথা ফেটে যায় ও অনেকের হাত-পা ভেঙে যায়। তারা কাঁদানে গ্যাসও ছুড়েছে। তবুও তরুণরা পদযাত্রা থামায়নি। তারা সরাসরি সংসদের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। সংসদ ভবনের কাছাকাছি পৌঁছালে নিরাপত্তাকর্মীরা নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের দিকে একে-৪৭ তাক করে অবস্থান নেন।

তবুও তরুণদের পদযাত্রা থামেনি। তারা যতই এগিয়েছেন, ততই সরকারের মুখোশ উন্মোচিত হয়েছে। প্রকাশ পেয়েছে সরকারের আসল ফ্যাসিবাদী রূপ। এই জান্তব গোষ্ঠী দেশের বৈচিত্র্য ও ইতিহাস বুঝতে পুরোপুরি অক্ষম। তারা কেবল ঘৃণা করতে জানে, ভালোবাসতে বা চিন্তা করতে জানে না।

আন্দোলনকারীরা যখন কাছে চলে আসেন, তখন আমাদের সাহসী ও বুক ফুলিয়ে চলা প্রধানমন্ত্রীকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। আইনপ্রণেতাদের নতুন চকচকে ‘সংবিধান সংসদ’ ভবন থেকে বের হতে দেওয়া হয়নি। এই নতুন সংসদ ভবনের মূল উদ্দেশ্যই মনে হয় প্রতিদিন সংবিধানের অবমাননা করা।

সন্ধ্যার দিকে পুলিশ প্রতিবাদস্থলের প্রধান মঞ্চটি ভেঙে দেয়। কিন্তু রাতের মধ্যেই সাধারণ মানুষ সেটি আবার পুনর্নির্মাণ করে নেয়। রাতের বেলা পুলিশ যখন সেখান থেকে চলে যাচ্ছিল, তখন আন্দোলনকারীরা দাঁড়িয়ে তালি দিয়ে তাদের অভিবাদন জানায়। শিশুদের ওপর লাঠিচার্জ করার জন্য এই বাহবা! বাহ মোদিজি! বাহ!

এই আন্দোলন থেকে রাতারাতি বড় কোনো পরিবর্তনের আশা করা বোকামি হবে। তবে একে তুচ্ছ ভাবাও ঠিক নয়। এখন যে ভারতের গণমাধ্যমগুলো বিদেশি অর্থায়ন বা মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর ষড়যন্ত্রের মতো নানা গুজব ছড়াবে, তা বলাই বাহুল্য। একজন গর্বিত ‘আন্দোলনজীবী’ (মোদিজি আমাদের এই উপহাসমূলক নামে ডাকেন) হিসেবে স্বীকার করছি, শুরুতে আমিও কিছুটা সন্দিহান ছিলাম।

আমার ভয় হচ্ছিল, আমরা আবার ২০১১ সালের আন্না হাজারের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের মতো কোনো ঘটনার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি কি না। শুরুতে ভালো উদ্দেশ্য থাকলেও সেই আন্না হাজারের আন্দোলনই আমাদের উপহার দিয়েছিল এমন এক স্বৈরাচারী দল, যারা ভারতের সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে দিয়েছে। তারা রাজনৈতিক দল ও সরকারের মধ্যে কোনো পার্থক্য বোঝে না। তারা দেশ বা নাগরিক কাউকেই সম্মান করে না। তারা আমাদের আন্তর্জাতিকভাবে লজ্জিত করেছে এবং ভারতকে নতজানু করে ফেলেছে।

কিন্তু ককরোচ জনতা পার্টির প্রতি ভারতের মূলধারার গণমাধ্যমের শত্রুতা দেখে আমার সব সন্দেহ দূর হয়ে যায়। এটিই ছিল আমার কাছে সবচেয়ে আশ্বস্ত হওয়ার মতো লক্ষণ। আমি এটি জেনে অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিলাম যে আন্দোলনের প্রধান মুখ অভিজিৎ দীপকে একজন দলিত পরিবারের সন্তান। আরও আনন্দের বিষয় হলো, কেউ তার এই জাত-পরিচয় নিয়ে মাতামাতি করেনি।

সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আমার মনের মধ্যে আসে যখন আমি তার মুখে একটি কথা শুনি। তিনি বলেছিলেন, ‘আমার নাম যদি খালিদ হতো কিংবা আমি যদি মুসলিম হতাম, তবে এতক্ষণে আমি কারাগারে থাকতাম।’ ভারতের বিচারব্যবস্থা ও সমাজের বাস্তব করুণ চিত্রটি তুলে ধরার সাহস দেখিয়েছেন তিনি। আমাদের দেশে সবার জন্য আইন সমান নয়। সবকিছু নির্ভর করে আপনার ধর্ম, জাত, শ্রেণি, বংশ ও লিঙ্গের ওপর। এটি অত্যন্ত গভীর একটি পর্যবেক্ষণ।

মধ্যপ্রদেশের ছতরপুর জেলায় ১৯ জুলাই ‘কেন-বেতোয়া লিঙ্ক’ ও অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্পের বিরুদ্ধে আয়োজিত আন্দোলনের নেতা অমিত ভাটনগর। ছবি: সংগৃহীত
মধ্যপ্রদেশের ছতরপুর জেলায় ১৯ জুলাই ‘কেন-বেতোয়া লিঙ্ক’ ও অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্পের বিরুদ্ধে আয়োজিত আন্দোলনের নেতা অমিত ভাটনগর। ছবি: সংগৃহীত

এমন এক সময়ে তিনি এ কথা জনসমক্ষে বলেছেন, যখন বিরোধী রাজনৈতিক নেতারাও হিন্দু ভোটারদের ক্ষোভের ভয়ে ‘মুসলিম’ শব্দটি মুখে না এনে কেবল ‘সংখ্যালঘু’ বলেন। তার এই সাহসী বক্তব্যই আমাকে যন্তর মন্তরের দিকে টেনে নিয়ে যায়। আমি জানতাম, দিপকে যখন ‘খালিদ’ নামটি ব্যবহার করেছিলেন, তখন তিনি হয়তো দিল্লির জেনইউ-এর ছাত্র উমর খালিদের কথাই বলছিলেন। উমর খালিদ, শারজিল ইমামসহ অনেকেই আজ প্রায় ছয় বছর ধরে বিনা বিচারে কারাগারে বন্দি আছেন।

উমরের অপরাধ কী ছিল? তিনি ২০২০ সালে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের (সিএএ) বিরুদ্ধে অহিংস আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন। সেই সময় উগ্রপন্থি হিন্দুরা দিল্লিতে অগ্নিসংযোগ, হত্যা ও মসজিদে আগুন দেওয়ার তাণ্ডব চালাচ্ছিল। পুলিশ নিষ্ক্রিয় দাঁড়িয়ে সেই ধ্বংসযজ্ঞ দেখছিল, কোনো কোনো ক্ষেত্রে অংশও নিচ্ছিল। অথচ উমরের জামিনের একের পর এক আবেদন খারিজ করে দিচ্ছেন আমাদের বিচারকেরা। তারা ন্যায়বিচার করার সাহস হারিয়ে ফেলেছেন।

আন্দোলনকারীদের ভিড় যত বাড়ছিল, আমার মনে হচ্ছিল ভাগ্যিস এঁদের বেশিরভাগই মুসলিম, শিখ, খ্রিষ্টান কিংবা আদিবাসী নন! তাহলে হয়তো এতক্ষণে তাদের পিষে ফেলা হতো, গুলি করে মারা হতো কিংবা জেলে পুরে রাখা হতো। ভাগ্যিস তারা কেউ কাশ্মীরি নন! নয়তো ছররা গুলিতে এতক্ষণে তাদের চোখ অন্ধ করে দেওয়া হতো। ভাগ্যিস তারা বেশিরভাগই হিন্দু। ভারতের বর্তমান পরিস্থিতি ঠিক কতটা শোচনীয়, তা এই একটি চিন্তা থেকেই বোঝা যায়। তবে যে কোনো মুহূর্তে পরিস্থিতির মোড় ঘুরে যেতে পারে। অন্যান্য রাজ্য থেকে বিমানে করে হাজার হাজার আধাসামরিক সেনা আনা হচ্ছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। সামনের দিনগুলোতে কী ঘটতে চলেছে, তা আমরা কেউ জানি না।

এই পরিস্থিতি আমাদের কোথায় নিয়ে দাঁড় করাচ্ছে? আন্না হাজারের আন্দোলনের সময় বড় বড় করপোরেট গণমাধ্যমগুলো দিনরাত ২৪ ঘণ্টা অবিরাম প্রচার চালিয়েছিল। কিন্তু ককরোচ জনতা পার্টির ভরসা কেবল ইন্টারনেট। আন্না হাজারের আন্দোলনকে আরএসএস নিজেদের দখলে নিয়েছিল এবং মোদির বিজেপি তার রাজনৈতিক সুবিধা পুরোপুরি ঘরে তুলেছিল। কিন্তু এই তরুণদের পেছনে কোনো সংগঠিত রাজনৈতিক দল নেই।

এখন আমরা যে স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভ দেখছি, তা একসময় মিলিয়ে যাবে যদি না কোনো কার্যকর রাজনৈতিক কাজ শুরু হয়। দেশের সচেতন নাগরিক ও বিরোধী দলগুলোকে নিজেদের মধ্যকার ঝগড়াঝাঁটি বন্ধ করে এই তরুণদের পাশে দাঁড়াতে হবে। সরকার জানে যে বিরোধী দলগুলো হয়তো এক হতে পারবে না। তাই তারা নিশ্চিন্তে বসে আছে। কারণ তারা জানে রাষ্ট্র অপেক্ষা করতে পারে, কিন্তু সাধারণ মানুষ পারে না।

এই মুহূর্তে ভারতে আরও কয়েকটি বিক্ষোভ চলছে। মধ্যপ্রদেশের আদিবাসীরা কেন-বেতওয়া নদী সংযোগ প্রকল্পের প্রতিবাদ করছেন। উত্তরাখণ্ডের গ্রামবাসীরা নির্বিচারে গাছ কাটার বিরুদ্ধে আন্দোলন করছেন। গ্রেট নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের পরিবেশ ধ্বংসের বিরুদ্ধে মানুষ সোচ্চার হচ্ছেন। মণিপুর জ্বলছে। চাকরি হারিয়ে যাচ্ছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম আকাশচুম্বী। মানুষের ক্ষোভ ক্রমে বাড়ছে।

এরই মধ্যে বিজেপি-আরএসএসের ‘ঐশ্বরিক’ রাজনৈতিক খেলা মানুষের সামনে ফাঁস হয়ে গেছে। এটি ছিল আসলে একটি প্রতারণা। অযোধ্যার রাম মন্দিরকে কেন্দ্র করে যে লুণ্ঠন শুরু হয়েছে, তা কোনো সস্তা বলিউড সিনেমার চিত্রনাট্যের মতো আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠছে। ভণ্ড সাধু ও দুর্নীতিবাজ রাজনেতারা এখন সেখানে পাঁচতারা হোটেল তৈরি করছেন, জমি দখল করছেন এবং বিলাসবহুল গাড়িতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। গরিব মানুষের সরল বিশ্বাসকে পুঁজি করে তাঁরা আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন। দুর্নীতির এই কালো হাত এখন দেশের একেবারে সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত।

কিন্তু তরুণদের এই ‘তেলাপোকা শক্তি’ কি আমাদের এই গর্ত থেকে টেনে তুলতে পারবে? কাজটা মোটেও সহজ নয়। ভারতের গণআন্দোলনগুলোর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা খুব একটা আশার আলো দেখতে পাই না। ষাট ও সত্তরের দশকে নকশাল আন্দোলনের মতো বিভিন্ন সশস্ত্র বিদ্রোহ কৃষকদের মাঝে জমি বণ্টনের দাবি তুলেছিল। সেগুলো নিষ্ঠুরভাবে দমন করা হয়েছিল। আশির দশকে ‘নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন’ এবং পরবর্তীতে অন্ধ্রপ্রদেশ, ছত্তিশগড় ও ঝাড়খণ্ডে কৃষকদের জমি বাঁচানোর লড়াই হয়েছিল। সেই আন্দোলনগুলোও দমন করা হয়।

২০০০ সালের দিকে এসে গরিব মানুষ কেবল ১০০ দিনের কাজের নিশ্চয়তা স্কিম নিয়েই খুশি থাকতে বাধ্য হয়েছিল। ন্যূনতম মজুরিতে তিন মাসের কর্মসংস্থান, যা দিয়ে শহরের একটি বড় রেস্তোরায় এক বেলার ভালো খাবার কেনাও কঠিন। বর্তমান সরকার সেই সুযোগটিও কেড়ে নিয়েছে। এর বদলে মোদির ছবিযুক্ত ব্যাগে করে সামান্য কিছু রেশন গরিব মানুষের দিকে ছুড়ে দেওয়া হচ্ছে। যেমনটা চুরির গাড়ি থেকে ভিক্ষুকদের দিকে ভিক্ষা ছুড়ে দেওয়া হয়। দেশের অর্থনৈতিক মন্দার কারণে এখন এই ন্যূনতম রেশন সুবিধাও হুমকির মুখে পড়েছে।

আজ ২০২৬ সালে এসে আমরা নিজেদের ভোটাধিকার ও নাগরিকত্ব রক্ষার লড়াইয়ে নেমেছি। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) ও জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি) হলো ১৯৩৫ সালের নাৎসি জার্মানির নুরেমবার্গ আইনের হিন্দুত্ববাদী সংস্করণ। সেই সময় জার্মানিতে বংশলতিকার কাগজ দেখে নাগরিকত্ব দেওয়া হতো। আমাদের ভারতের কতজনের কাছে এমন প্রাচীন কাগজ আছে?

সিএএ-বিরোধী আন্দোলনকারীদের নির্মমভাবে হত্যা ও জেলে পুরে রাখার মাধ্যমে আন্দোলন দমন করা হয়েছিল। তবে আন্দোলনের কারণে সরকার এই আইন বাস্তবায়নের গতি কিছুটা কমিয়েছিল। এখন সেই আইন ভোটার তালিকা সংশোধনের (এসআইআর) নামে নতুন করে ফিরে এসেছে। আমাদের জানানো হয়েছে যে এমনকি পাসপোর্টও আমাদের নাগরিকত্বের কোনো প্রমাণ নয়।

পশ্চিমবঙ্গের নদীয়ায় ভোটার তালিকা সংশোধনের বিশেষ নিবিড় কর্মসূচির (এসআইআর) শুনানির সময় কয়েকজন তাদের নথিপত্র গুছাচ্ছেন। ছবি: সংগৃহীত
পশ্চিমবঙ্গের নদীয়ায় ভোটার তালিকা সংশোধনের বিশেষ নিবিড় কর্মসূচির (এসআইআর) শুনানির সময় কয়েকজন তাদের নথিপত্র গুছাচ্ছেন। ছবি: সংগৃহীত

লাখ লাখ মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে কেটে দেওয়া হচ্ছে। সারা দেশের মানুষ এখন বংশলতিকার কাগজের খোঁজে হন্যে হয়ে ঘুরছে। আমরা আজ কোথায় দাঁড়িয়ে আছি, তা নিজেরাও জানি না। আমরা কি বৈধ নাগরিক নাকি অবৈধ? আমাদের কি কোনো অধিকার আছে? আমাদের কার স্থান হবে ওই বিশাল ডিটেনশন ক্যাম্পে? ফ্যাসিবাদের মূল হাতিয়ারই হলো মানুষের মধ্যে বিশৃঙ্খলা ও বিভ্রান্তি ছড়ানো।

আমাদের আতঙ্ক ও হতাশা হয়তো এই তরুণদের আন্দোলনের প্রতি আমাদের অতিরিক্ত আশাবাদী করে তুলছে। অনেকে একে বাংলাদেশ, নেপাল বা শ্রীলঙ্কার তরুণদের আন্দোলনের সঙ্গে তুলনা করছেন, যার মাধ্যমে সে দেশের সরকার পতন হয়েছিল। কিন্তু ভারত অনেক বড় দেশ, এখানে এমন ঘটা সহজ নয়।

আবার অনেকে একে ১৯৭৭ সালে ইন্দিরা গান্ধীর পতনের নেপথ্যে থাকা জয়প্রকাশ নারায়ণের আন্দোলনের সঙ্গে তুলনা করছেন। কিন্তু ককরোচ জনতা পার্টি কোনোটির মতোই নয়। এটি সম্পূর্ণ নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে গড়া এক নতুন আন্দোলন। এটি একটি নিষ্ঠুর ও প্রতিহিংসাপরায়ণ সরকারের বিরুদ্ধে এ দেশের নিরুপায় তরুণদের লড়াই। সরকার ইতিমধ্যেই এই আন্দোলনের মূল নেতাদের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার ছক কষছে।

যে সরকার দিন দিন মানুষের কাছে এত অপ্রিয় হয়ে উঠছে, তারা কীভাবে এত আত্মবিশ্বাস পায়? কারণ তারা জানে কীভাবে নির্বাচনকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। তারা সব রাষ্ট্রীয় যন্ত্র কবজা করেছে। নির্বাচন কমিশন এখন আর নিরপেক্ষ নেই। ইভিএম মেশিনগুলো নিজেদের সুবিধামতো সাজানো হয়েছে। প্রকৃত ভোটারদের নাম বাদ দিয়ে ভুয়া নাম ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নির্বাচন তদারকিকারী আমলারা সরকারের আজ্ঞাবহ হিসেবে কাজ করছেন।

আদালতগুলো নির্বাচনে কারচুপির ঘটনাগুলোতে চোখ বন্ধ করে রাখছে। পুলিশ নিরপেক্ষতার অর্থই বোঝে না। আর গণমাধ্যমগুলো ক্ষমতার ইশারায় মাথা নত করে থাকে। ক্ষমতাসীন দল বিজেপিকে জেতাতে নির্বাচনী আসনগুলোর সীমানা নতুন করে নির্ধারণ করা হচ্ছে। তাই এই দলের ভয়ের কিছু নেই। তারা কেনই বা সাধারণ মানুষের কথা শুনবে? বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দল এটি। বিশ্বের সবচেয়ে ধনী শিল্পপতিরা তাদের পেছনে আছেন। তারা মনে করে, অর্থ দিয়ে সব কেনা সম্ভব।

কিন্তু এই খেলা কি চিরকাল চলবে? সব মানুষকে কি সব সময় বোকা বানিয়ে রাখা যায়? ১৫০ কোটি মানুষের একটা দেশকে কি চিরদিন লাশের মতো টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব? অসম্ভব। তেলাপোকারা এখন রাজপথে নেমে এসেছে। ভারতের কৃষকেরা ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির বিরুদ্ধে আবারও দিল্লির দিকে মার্চ করা শুরু করেছেন। এই ক্ষতিকর চুক্তিতে ভারত সরকার দাসত্বের সই করতে যাচ্ছে। দিল্লির সীমান্ত সিল করে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু তা দিয়ে কৃষকদের রোখা যাবে না। আমাদেরও কৃষক ও তরুণ আন্দোলনকারীদের কাছ থেকে শিক্ষা নেওয়া দরকার। এই তরুণরা আমাদের এক নতুন সুযোগ উপহার দিয়েছেন। এখন এই সুযোগকে কাজে লাগানোর দায়িত্ব আমাদের সবার।

একজন প্রধানমন্ত্রী যখন শারীরিকভাবে আন্দোলনের মুখ থেকে পালিয়ে যান, তখন তার রাজনৈতিকভাবে পতনের সময়ও ঘনিয়ে আসে।

তবে এই শাসক দল সহজে ক্ষমতা ছাড়বে না। রাজধানীর বুকে এমন অপমান তারা সহ্য করবে না। আমাদের সামনে হয়তো আরও রক্তক্ষয়ী দিন আসছে। তরুণদের ধৈর্য বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। যে কোনো মুহূর্তে আন্দোলনের কেউ হয়তো ক্ষোভের মাথায় নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলতে পারেন। আর পুলিশ তখনই গুলি চালানোর অজুহাত পেয়ে যাবে। তারা আমাদের আন্দোলন ভেঙে দিতে সম্ভাব্য সব ধরনের দমনপীড়ন চালাবে। আমাদের উচিত যে কোনো মূল্যে তাদের রুখে দেওয়া।


লেখক পরিচিতি

একজন ভারতীয় ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক ও রাজনৈতিক কর্মী। তিনি সাহিত্য, মানবাধিকার, পরিবেশ, বৈশ্বিক পুঁজিবাদ, কাশ্মীর এবং ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে স্পষ্ট ও সমালোচনামূলক অবস্থানের জন্য পরিচিত।