চার বিশ্বকাপ খেলেও শিরোপা ছোঁয়া হলো না নেইমারের

এশিয়া পোস্ট স্পোর্টস
চার বিশ্বকাপ খেলেও শিরোপা ছোঁয়া হলো না নেইমারের
ছবি: সংগৃহীত

শেষ বাঁশির পর আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি নেইমার। নিউ জার্সির মাঠে নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ শেষ হতেই চোখের জলে ভেঙে পড়েন সেলেসাওদের নম্বর ১০। সতীর্থরা এসে সান্ত্বনা দেন, রাফিনিয়া তাকে জড়িয়ে ধরেন, কিন্তু সেই মুহূর্তে নেইমারের মুখে ছিল অপূর্ণতার দীর্ঘ ছায়া।

নেইমারের ক্যারিয়ারে এটি শুধু আরেকটি বিশ্বকাপ-বিদায় নয়। এটি এক বেদনাদায়ক রেকর্ডের রাতও। ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ ও ২০২৬, চারটি বিশ্বকাপে খেলেও শিরোপা জিততে পারলেন না তিনি। ব্রাজিলের হয়ে চার বিশ্বকাপে খেলা ফুটবলারদের তালিকায় অনেক কিংবদন্তি আছেন। কিন্তু তাদের বেশির ভাগের হাতেই উঠেছে বিশ্বকাপ। নেইমারের নাম সেখানে আলাদা হয়ে থাকবে অপূর্ণতার কারণে।

পেলে, নিলতন সান্তোস, লেওঁ, কাস্তিলিও, কাফু, জালমা সান্তোস, রোনালদো নাজারিও, ব্রাজিলের চার বিশ্বকাপের গল্পে এমন অনেক বড় নাম আছে। তাদের কেউ খেলোয়াড় হিসেবে, কেউ স্কোয়াড সদস্য হিসেবে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বাদ পেয়েছেন। নেইমার ও থিয়াগো সিলভার নাম সেই আলোচনায় আলাদা, দীর্ঘ পথ পেরিয়েও তাদের হাতে ওঠেনি বিশ্বকাপ ট্রফি।

নরওয়ের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচে নেইমার শুরু থেকে ছিলেন না। দ্বিতীয়ার্ধে বদলি হিসেবে মাঠে নামেন তিনি। তখনও ম্যাচের ফল নির্ধারিত হয়নি। ব্রাজিলের আশা ছিল, অভিজ্ঞ নম্বর ১০ হয়তো শেষ দিকে কোনো জাদু দেখাবেন। কিন্তু মাঠে নামার পর ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে নরওয়ের দিকে যেতে থাকে।

৭৯ মিনিটে আর্লিং হালান্ডের প্রথম গোল ব্রাজিলকে ধাক্কা দেয়। আন্দ্রেয়াস শেলদেরুপের ক্রস থেকে শক্তিশালী হেডে গোল করেন ম্যানচেস্টার সিটির স্ট্রাইকার। ৮৯ মিনিটে আবারও হালান্ড। দ্বিতীয় গোলের পর ব্রাজিলের ফেরার পথ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।

যোগ করা সময়ে পেনাল্টি থেকে গোল করেন নেইমার। স্কোরলাইন হয় ২-১। সেটিই ছিল ম্যাচে ব্রাজিলের একমাত্র গোল। কিন্তু গোলটি শুধু ব্যবধান কমিয়েছে, বিদায় আটকাতে পারেনি। গোল করেও ব্রাজিলকে ফিরিয়ে আনতে না পারার হতাশাই যেন শেষ বাঁশির পর তাঁর চোখের জলে ফুটে ওঠে।

এই গোলের মধ্য দিয়ে নেইমার অবশ্য আরেকটি বিরল কীর্তিতে পেলের পাশে দাঁড়ান। ব্রাজিলের হয়ে চারটি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করা ফুটবলারের তালিকায় এখন পেলে ও নেইমারের নাম পাশাপাশি। ২০১৪, ২০১৮, ২০২২-এর পর ২০২৬ বিশ্বকাপেও গোল পেলেন নেইমার। কিন্তু ব্যক্তিগত রেকর্ডের রাতটিও শেষ পর্যন্ত ঢেকে গেল দলীয় ব্যর্থতার অন্ধকারে।

নেইমারের বিশ্বকাপ গল্প সবসময়ই অপূর্ণতার সঙ্গে জড়িয়ে। ২০১৪ সালে ঘরের মাঠে তিনি ছিলেন ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় ভরসা। কলম্বিয়ার বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে চোট পেয়ে সেমিফাইনালের আগেই তার টুর্নামেন্ট শেষ হয়ে যায়। এরপর জার্মানির কাছে ৭-১ গোলের দুঃস্বপ্ন দেখে ব্রাজিল।

২০১৮ সালে রাশিয়ায় ব্রাজিল কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের কাছে হেরে যায়। ২০২২ সালে কাতারে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে নেইমারের গোল ব্রাজিলকে স্বপ্ন দেখিয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পেনাল্টি শুটআউটে বিদায় নেয় সেলেসাওরা। ২০২৬ সালে আবারও ইউরোপীয় প্রতিপক্ষ, আবারও নকআউট, আবারও হতাশা।

এবারের বিশ্বকাপে নেইমারের ভূমিকা ছিল সীমিত। চোট ও ফিটনেসের কারণে তিনি টুর্নামেন্টের বড় অংশে পূর্ণ ছন্দে ছিলেন না। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে বদলি হিসেবে ফিরে আসেন। নরওয়ের বিপক্ষেও দ্বিতীয়ার্ধে নামেন। আগের নেইমারের মতো টানা ৯০ মিনিট ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করার অবস্থায় তাকে আর দেখা যায়নি।

তবু তার উপস্থিতি ব্রাজিল সমর্থকদের আবেগে আলাদা জায়গা করে নিয়েছিল। কারণ এই প্রজন্মের ব্রাজিল ফুটবলের সবচেয়ে বড় মুখ তিনিই। পেলের পর ব্রাজিলের নম্বর ১০ জার্সির সঙ্গে যে প্রত্যাশা, যে সৌন্দর্য, যে চাপ জড়িয়ে আছে, সেটির ভার সবচেয়ে বেশি বহন করেছেন নেইমারই।

কিন্তু বিশ্বকাপ তার হাতে ধরা দিল না। গোল আছে, রেকর্ড আছে, স্মরণীয় মুহূর্ত আছে, কান্নাও আছে; নেই শুধু সেই ট্রফি।