এমবাপ্পে-দেম্বেলের ঝড়ে শেষ ৩২-এ ফ্রান্স

এশিয়া পোস্ট স্পোর্টস
এমবাপ্পে-দেম্বেলের ঝড়ে শেষ ৩২-এ ফ্রান্স
কিলিয়ান এমবাপ্পে। ছবি: সংগৃহীত

বৃষ্টি, বজ্রপাতের সতর্কতা, দীর্ঘ বিরতি—কিছুই ফ্রান্সের পথ আটকাতে পারল না। ফিলাডেলফিয়ায় ঝড়ের কারণে দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হতে দেরি হলো প্রায় দুই ঘণ্টা। কিন্তু মাঠে ফিরেই নিজেদের কাজ সেরে ফেলল দিদিয়ের দেশমের দল। কিলিয়ান এমবাপ্পের জোড়া গোল ও ওসমান দেম্বেলের গোলে ইরাককে ৩-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপের শেষ ৩২ নিশ্চিত করেছে ফ্রান্স।

Advertisement

গ্রুপ ‘আই’-এর ম্যাচে ফ্রান্স শুরু থেকেই ছিল বড় ফেভারিট। প্রথম ম্যাচে সেনেগালকে ৩-১ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপ শুরু করেছিল তারা। ইরাকের বিপক্ষে লক্ষ্য ছিল নকআউট নিশ্চিত করা। সেটিই তারা করেছে খুব বেশি চাপ ছাড়াই, নিয়ন্ত্রিত ফুটবল খেলেই।

ফ্রান্সের জয়ের নায়ক এমবাপ্পে। ১৪ মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে বাঁ পায়ের জোরালো শটে গোল করে দলকে এগিয়ে দেন তিনি। এই গোলেই বিশ্বকাপে তার গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ১৫। দ্বিতীয়ার্ধে আরেক গোল করে পৌঁছে যান ১৬-তে। তাতে মিরোস্লাভ ক্লোসের ১৬ গোলের পাশে উঠে গেলেন ফরাসি ফরোয়ার্ড।

পুরুষদের বিশ্বকাপের গোলদাতার তালিকায় এখন এমবাপ্পের সামনে শুধু লিওনেল মেসি। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল করে মেসি রেকর্ড নিয়ে গেছেন ১৮ গোলে। এমবাপ্পে এখন ১৬। বয়স মাত্র ২৭, খেলছেন তৃতীয় বিশ্বকাপ। তাই মেসির নতুন রেকর্ডের সবচেয়ে বড় হুমকি এখন তিনিই।

ফ্রান্স ম্যাচের শুরুতেই বুঝিয়ে দেয়, তারা ঝুঁকি নিতে আসেনি। দেশম একাদশে কয়েকটি পরিবর্তন আনলেও আক্রমণের মূল ধার ঠিকই ধরে রেখেছিলেন। এমবাপ্পে, দেম্বেলে ও মাইকেল ওলিসের গতি, জায়গা বদল এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত ইরাকের রক্ষণকে শুরু থেকেই ব্যস্ত রাখে।

এই ত্রয়ীই ম্যাচের পার্থক্য গড়ে দেয়। দেম্বেলে আক্রমণভাগে ভেতরের দিকে বেশি খেলেছেন, ওলিসে ডান দিক থেকে জায়গা তৈরি করেছেন, আর এমবাপ্পে ছিলেন মূল ধাক্কা। ইরাক শুরু থেকেই নিচে নেমে রক্ষণে ব্যস্ত ছিল। বল বের করার সময়ও তারা কয়েকবার বিপজ্জনক ভুল করেছে।

প্রথম ধাক্কার পর ইরাক আরও বিপদে পড়ে অধিনায়ক ও প্রধান গোলদাতা আইমান হুসেইনের চোটে। প্রথমার্ধেই তাকে মাঠ ছাড়তে হয়। দলের আক্রমণ তখন আরও ধারহীন হয়ে পড়ে। ফ্রান্সের রক্ষণ খুব বেশি পরীক্ষার মুখে পড়েনি।

প্রথমার্ধের শেষ দিকে ফিলাডেলফিয়ায় বৃষ্টি বাড়তে থাকে। বিরতির সময় আবহাওয়া আরও খারাপ হয়। বজ্রপাতের ঝুঁকির কারণে দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হতে দেরি হয় প্রায় দুই ঘণ্টা। দর্শকদের জন্য সময়টা ছিল অস্বস্তির, খেলোয়াড়দের জন্যও ছন্দ ধরে রাখা কঠিন।

তবে দীর্ঘ বিরতি ফ্রান্সের ক্ষতি করেনি। বরং মাঠে ফিরে তারা আরও কার্যকর হয়ে ওঠে। পিচ ভারী হয়ে গেলেও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ বদলায়নি। ইরাক রক্ষণে ভুল করতে থাকে, আর ফ্রান্স সেই ভুলের শাস্তি দেয়।

দ্বিতীয় গোলটি আসে ইরাকের বড় ভুল থেকে। রক্ষণের ভুল পাস থেকে দেম্বেলে বল পেয়ে এমবাপ্পের দিকে বাড়ান। এমবাপ্পে কাছ থেকে ডান পায়ে বল জালে পাঠিয়ে নিজের দ্বিতীয় গোল করেন। স্কোর ২-০ হতেই ম্যাচ কার্যত ফ্রান্সের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।

এরপর ৬৬ মিনিটে তৃতীয় গোল করেন দেম্বেলে। ফ্রান্সের আক্রমণভাগের গভীরতা ও ভারসাম্য আবারও দেখা যায় ওই গোলে। এমবাপ্পে, দেম্বেলে, ওলিসে—তিনজন বড় তারকা একসঙ্গে খেললেও ফ্রান্সের আক্রমণে বিশৃঙ্খলা দেখা যায়নি। বরং জায়গা বদল, গতি ও সুযোগ কাজে লাগানোর দক্ষতায় তারা ইরাককে ধীরে ধীরে ভেঙে দেয়।

তৃতীয় গোলের পর দেশম ম্যাচ গুছিয়ে নেওয়ার পথে হাঁটেন। দেম্বেলে ও ওলিসেকে তুলে নেন তিনি। বদলি হিসেবে মাঠে আসেন রায়ান শেরকি ও দেজিরে দুয়ে। ফ্রান্সের বেঞ্চ কতটা শক্তিশালী, সেটিও আবার মনে করিয়ে দেয় এই পরিবর্তনগুলো।

ফ্রান্সের জয় নিয়ে খুব বেশি নাটক ছিল না। ম্যাচে তারা প্রায় সব সময়ই এগিয়ে ছিল, বল নিয়ন্ত্রণ করেছে, সুযোগ তৈরি করেছে এবং প্রয়োজনীয় সময়ে গোল করেছে। দেশমের ফ্রান্স অনেক সময় চোখধাঁধানো ফুটবলের চেয়ে কার্যকারিতায় বিশ্বাস করে। ইরাকের বিপক্ষেও সেটিই দেখা গেল—অল্প ঝুঁকি, কম ভোগান্তি, কিন্তু পরিষ্কার জয়।

ইরাকের জন্য ম্যাচটি হতাশার। নরওয়ের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে ৪-১ গোলে হারের পর ফ্রান্সের বিপক্ষে বড় কিছু করতে পারেনি তারা। আক্রমণে সাহস দেখানোর চেষ্টা থাকলেও শেষ তৃতীয়াংশে যথেষ্ট ধার ছিল না। অধিনায়ক আইমান হুসেইনের চোট তাদের পরিকল্পনাকেও বড় ধাক্কা দেয়।

ফ্রান্সের জন্য সবচেয়ে বড় খবর দুটি। প্রথমত, তারা শেষ ৩২ নিশ্চিত করেছে। দ্বিতীয়ত, এমবাপ্পে রেকর্ডের দৌড়ে আরও এগিয়ে গেলেন। বিশ্বকাপে ১৬ গোল করে তিনি এখন ক্লোসের সমান। সামনে মেসির ১৮ গোল। এই বিশ্বকাপেই সেই রেকর্ডের লড়াই নতুন মাত্রা পেতে পারে।