সুস্থ হয়েও ফেরা হলো না ঘরে, স্বজনদের অবহেলায় হাসপাতালেই কাটছে জীবন

চিকিৎসা শেষে মানসিক সুস্থতা ফিরে পেয়েছেন বহু আগেই। এখন জীবনের বাকি দিনগুলো কাটাতে চান নিজের পরিবার আর আপনজনদের সঙ্গে। কিন্তু বছরের পর বছর, এমনকি যুগের পর যুগ কেটে গেলেও খোঁজ মিলছে না তাদের পরিবারের। ভর্তির সময় স্বজনদের দেওয়া ভুয়া নাম-ঠিকানার প্রতারণা এবং জমিজমা বা অর্থনৈতিক বিরোধের জেরে সুস্থ হওয়ার পরও এই হতভাগ্য মানুষদের আর ফিরিয়ে নেয়নি কেউ।
পাবনা মানসিক হাসপাতালে বর্তমানে এমন অন্তত ৯ জন সুস্থ রোগী বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন, যাদের কেউ নিতে আসছে না। অন্যদিকে, একই অপেক্ষায় বছরের পর বছর পথ চেয়ে থেকে গত কয়েক বছরে হাসপাতালেই শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেছেন অন্তত ৩০ জন।
ভুয়া ঠিকানা ও স্বজনদের অমানবিক আচরণ
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, এসব রোগী যখন ভর্তি হয়েছিল সেসময় জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকায় রোগীর স্বজনদের দেওয়া তথ্যের ওপর ভরসা করেই ভর্তি করা হয়েছিল। এই সুযোগে কিছু পরিবার ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল বা ভুয়া ঠিকানা দিয়ে রোগীকে ফেলে রেখে উধাও হয়ে গেছে।
এমনও ঘটনা ঘটেছে, যেখানে রোগীরা সুস্থ হওয়ার পর তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, কিন্তু পরিবার তাদের গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছে। অনেক পরিবারে সুস্থ রোগী নিয়ে গিয়ে হাসপাতালের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের উল্টো নাজেহাল ও আপত্তির মুখে পড়তে হয়েছে। পাঁচ থেকে ছয়বার পর্যন্ত চেষ্টা করেও রোগীকে ফিরিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ।
সুস্থ হয়েও যারা ‘জীবন্ত লাশ’
হাসপাতালের ভর্তি রেজিস্ট্রার অনুযায়ী, আবু সাঈদ হোসেন নামের এক রোগীকে ১৯৯৬ সালে ভর্তি করেন তার আত্মীয়রা। তিনি অনেক আগেই সম্পূর্ণ সুস্থ হলেও তাকে কেউ নিতে আসেননি। একপর্যায়ে তার স্ত্রীও তাকে ছেড়ে চলে যান। তিন দশক ধরে হাসপাতালে বন্দি থাকতে থাকতে এখন আবারও মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছেন তিনি। এছাড়া শাহানারা আক্তার, অনামিকা বুবির মতো রোগীরাও সুস্থ অবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতাল হাসপাতালেই দিন কাটাচ্ছেন।
সৈয়দ মোহাম্মদ আলী নামের এক রোগীকে ২০১৫ সালে মানিকগঞ্জের ঠিকানা দিয়ে ভর্তি করা হয়েছিল। দুই-এক মাসের মধ্যেই তিনি সুস্থ হন। কিন্তু বর্তমানে ওই ঠিকানায় থাকা তার চাচাতো ভাইয়েরা তাকে গ্রহণ করতে নারাজ। এমনকি এই বাড়িতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পাঠানো হলেও তাদের সাথে খারাপ আচরণ করে রোগীকে নিজেদের আত্মীয় বলে অস্বীকার করা হয়। একইভাবে সাতক্ষীরার জাবেদুল করিমকে তার ভাই মিজানুর করিম ভর্তি করে যাওয়ার পর সুস্থ হলেও একাধিক চিঠির কোনো জবাব দেয়নি পরিবার।
আপনজনের দেখা না পেয়েই মারা গেছেন ৩০ জন
গত তিন বছরে পাবনা মানসিক হাসপাতালে কমপক্ষে ৩০ জন সুস্থ রোগী মারা গেছেন আপনজনের দেখা না পেয়েই। এর মধ্যে ২০২৩ সালে ১০ জন, ২০২৪ সালে ১০ জন এবং ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত মারা গেছেন ১০ জন। সবশেষ চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি মারা যান নাইমা চৌধুরী। ২০০৯ সালে মাত্র ২৫ বছর বয়সে তাকে ভর্তি করা হয়েছিল। সুস্থ হয়ে দীর্ঘ ১৮ বছর প্রতীক্ষার পর মৃত্যুর পাঁচদিন পর গত ১০ জানুয়ারি তার এক ভাই এসে মরদেহ নিয়ে যান। অন্যদিকে, ঢাকার পল্লবীর ঠিকানা দিয়ে ভর্তি হওয়া নাজমা নিলুফা ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে সুস্থ অবস্থায় মারা যান। মৃত্যুর পরও তার কোনো স্বজন না আসায় আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে পাবনাতেই তাকে দাফন করা হয়।
সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন নার্সরা
হাসপাতালের সেবা তত্ত্বাবধায়ক মোছা. রেখা আক্তার বলেন, বর্তমানে হাসপাতালে অনেকগুলো সুস্থ রোগী থাকলেও ভুয়া পরিচয়ের কারণে তারা স্বজনদের কাছে যেতে পারছেন না, যা অত্যন্ত অমানবিক। আমাদের নার্সরাই এদের চুল-নখ কাটা থেকে শুরু করে যাবতীয় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করে দেন। অনেক সময় নারী নার্সরা পুরুষ রোগীদের দীর্ঘমেয়াদি সেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খান, এমনকি আক্রমণের শিকারও হন।
তিনি আরও জানান, সুস্থ রোগীরা বছরের পর বছর শয্যা আটকে রাখায় নতুন জটিল রোগীদের ভর্তি নিতে অসুবিধা হচ্ছে।
পাবনা মানসিক হাসপাতালের সহকারী পরিচালক শাফকাত ওয়াহেদ বলেন, হাসপাতালে বর্তমানে দীর্ঘমেয়াদি ৯ জন রোগী রয়েছেন যারা বাড়ি যেতে ইচ্ছুক। এছাড়া সব মিলিয়ে আরও প্রায় ৩০ জনের মতো সুস্থ রোগী বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় আছেন। মূলত জমিজমা সংক্রান্ত বা অর্থনৈতিক প্রতারণা করতেই অনেকে ভুল ঠিকানা দিয়ে ভর্তি করে গেছেন। আইনি নোটিশ বা পুলিশ পাঠালেও অনেক পরিবার দুর্ব্যবহার করে।
তিনি আরও বলেন, জরাজীর্ণ ভবন আর জনবল সংকটের মধ্যেও এই বিপুল সংখ্যক সুস্থ মানুষের আবাসন ও দেখভাল করা হাসপাতালের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।





