ফলনে ১৯ বছরের রেকর্ড ভাঙলেও হতাশ চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম চাষিরা

অনুকূল আবহাওয়া আর আধুনিক চাষ পদ্ধতির কারণে আমের রাজধানী খ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জে এবার উৎপাদনের গত ১৯ বছরের সব রেকর্ড ভাঙতে যাচ্ছে। চলতি মৌসুমে জেলাটিতে শুধু আমের মূল বাণিজ্যই ৩ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার জোরালো সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। তবে মাঠের এই বাম্পার ফলন আর বাজারের জমজমাট চিত্রের আড়ালে লুকিয়ে আছে আম চাষিদের হতাশা। একদিকে ফজলি ও লক্ষণভোগের মতো জাতের আমের কাঙ্ক্ষিত দাম না মেলা, অন্যদিকে সিন্ডিকেটের ‘ঢলন’ প্রথার শোষণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে আকস্মিক রপ্তানি বিপর্যয়ের কারণে জেলার হাজারো আম চাষি ও বাগান মালিকদের মনে চরম ক্ষোভ, আক্ষেপ ও হতাশা বিরাজ করছে।
১৯ বছরের রেকর্ড ভাঙছে ফলন
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছর জেলায় আমের আবাদি জমি গত বছরের ৩৭ হাজার ৫০৪ হেক্টর থেকে সামান্য কমে ৩৭ হাজার ৪৮৭ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে। তবে জমি কমলেও আধুনিক ও উচ্চ ঘনত্বের (হাই-ডেনসিটি) চাষ পদ্ধতি বেছে নেওয়ায় বাগানে গাছের সংখ্যা গত বছরের ৮১ লাখ ৫২ হাজার থেকে প্রায় ১১ লাখ বেড়ে এবার ৯২ লাখ ৪৪ হাজার ৭৬৫টিতে দাঁড়িয়েছে।
কম জায়গায় বেশি গাছ লাগানোর প্রবণতা এবং অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এবার প্রতি হেক্টরে আমের গড় ফলন ১২ দশমিক ২৪ টন ছাড়িয়ে যাবে, যা বিগত দুই দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। কৃষি বিভাগের হিসাব মতে, প্রতি হেক্টরে আম উৎপাদন ২০২৫ সালে ছিল ১০ দশমিক ৩ টন এবং ২০২৪ সালে ছিল ৯ দশমিক ০৩ টন। মাঠের এই বাম্পার ফলন বিবেচনা করে কৃষি বিভাগ আশা করছে, চলতি বছর আম উৎপাদনের চূড়ান্ত লক্ষ্যমাত্রা আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে সাড়ে ৪ লাখ টন ছাড়িয়ে যাবে।
৩ হাজার কোটি টাকার বাজার, কিন্তু দামে বিশাল ফারাক
অর্থকরী ফসল আমকে ঘিরে এখন চাঙ্গা হয়ে উঠেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের অর্থনীতি। দেশের সবচেয়ে বড় আমের হাট শিবগঞ্জের কানসাট ছাড়াও চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার পুরাতন বাজার, রহনপুর বাজার ও ভোলাহাট আম ফাউন্ডেশনে এখন ক্রেতা-বিক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়। কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, গত বছর জেলায় প্রায় ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকার আম বেচাকেনা হয়েছিল। এবার উৎপাদন বাড়ায় সামগ্রিক বেচাকেনা ৩ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। আর শ্রমিক, ঝুড়ি ও পরিবহণসহ আনুষঙ্গিক খাত মেলালে সামগ্রিক আম অর্থনীতির পরিধি দাঁড়াবে প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার কোটি টাকায়।
তবে বাজারে উপচে পড়া ভিড় থাকলেও দামের ক্ষেত্রে রয়েছে বিশাল ফারাক। বর্তমানে বাজারে গুটি আম রকমভেদে ১২০০ থেকে ২০০০ টাকা, ফজলি ৯০০ থেকে ১৫০০ টাকা এবং লক্ষণভোগ ৯০০ থেকে ১২০০ টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে, খিরশাপাত (ক্ষীরসাপাত) ৬৫০০ থেকে ৭০০০ টাকা, আম্রপালি ২০০০ থেকে ২৫০০ টাকা এবং ল্যাংড়া ৪৫০০ থেকে ৫০০০ টাকা মণ দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে।
ধানইনগর ইউনিয়নের আম চাষি নুরুল ইসলাম ও পারচৌকা এলাকার রুবেল জানান, বাজারে এখন আমের সরবরাহ অনেক বেশি, কিন্তু সেই তুলনায় দাম পাওয়া যাচ্ছে না। কেবল খিরশাপাত ও ল্যাংড়া আম শেষের দিকে হওয়ায় এই দুটির দাম কিছুটা বাড়তি। তবে কীটনাশক, শ্রমিক ও পরিবহণ খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় ফজলি আর লক্ষণভোগ ১ হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি করে উৎপাদন খরচই উঠছে না, উল্টো বড় ধরনের লোকসান গুনতে হচ্ছে।
থমকে গেছে বৈশ্বিক রপ্তানির দুয়ার
ইতালি, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, ডেনমার্ক ও সুইডেনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রতিবছর চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম রপ্তানি হলেও চলতি মৌসুমে চিত্র খুবই হতাশাজনক। সরকারের ‘রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্প’র আওতায় জেলার কয়েকশ চাষি উত্তম কৃষি চর্চার (GAP) মাধ্যমে বিষমুক্ত আম উৎপাদন করলেও এবার মাত্র ১৯ দশমিক ৫৬ মেট্রিক টন আম রপ্তানি হয়েছে। অথচ জেলা থেকে ২০২৫ সালে ১৫৩ মেট্রিক টন, ২০২৪ সালে ১৩৩ মেট্রিক টন এবং ২০২৩ সালে রেকর্ড ৩৭৬ মেট্রিক টন আম রপ্তানি হয়েছিল।
ম্যাংগো প্রডিউসার কো-অপারেটিভ সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল খান শামীম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রপ্তানিকারকরা সরাসরি চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাগানগুলো থেকে আম সংগ্রহ না করে ঢাকার বাদামতলী বা শ্যামলী এলাকা থেকে সাধারণ আম কিনে বিদেশে পাঠাচ্ছেন। এতে প্রকৃত আম রপ্তানি কম হচ্ছে এবং স্থানীয় চাষিরা বড় লোকসানের মুখে পড়ে বাধ্য হয়ে দেশের বাজারে কম দামে আম বিক্রি করছেন।
‘ঢলন’ প্রথার শোষণে কৃষকের পকেট ফাঁকা
আমের অর্থনীতি বড় হলেও ‘ঢলন’ নামের এক পুরোনো শোষণের কারণে মাঠপর্যায়ের কৃষকেরা সর্বস্বান্ত হচ্ছেন। পরিবহণকালীন ক্ষতি সমন্বয়ের নামে অতীতে মণে ১ থেকে ২ কেজি বেশি নেওয়ার নিয়ম থাকলেও, বর্তমানে আড়তদার ও ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটে ৪০ কেজির মণের পরিবর্তে কৃষকদের কাছ থেকে ৫২ থেকে ৫৫ কেজি পর্যন্ত আম নেওয়া হচ্ছে। অথচ চাষিদের মূল্য দেওয়া হচ্ছে মাত্র ৪০ কেজির হিসাবেই।
সদর উপজেলার আমচাষি আব্দুর রফিক জানান, ২ হাজার টাকা মণের আমে এই বাড়তি ওজনের কারণে চাষিরা তাদের পণ্যের প্রায় ২৬ শতাংশ মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। গত বছরের ১১ জুন বিভাগীয় প্রশাসনের বৈঠকে এই অন্যায় ‘ঢলন’ প্রথা বাতিল করে ডিজিটাল স্কেলে কেজিভিত্তিক আম কেনাবেচার সিদ্ধান্ত হলেও তা এখনও কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ।
যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা
চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মুনজের আলম মানিক বলেন, বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ আম চাঁপাইনবাবগঞ্জেই উৎপাদিত হয়। পৃথিবীতে আম একটি বড় শিল্প পণ্য হলেও আমরা এখনও এটাকে প্রক্রিয়াজাতকরণ করতে পারছি না। যদি এখানে আধুনিক প্রক্রিয়াকরণ শিল্প গড়ে তোলা যায়, তবে আমের বর্তমান বাজার মূল্য এক ধাক্কায় অন্তত ৩ গুণ বেড়ে যাবে এবং বিশাল কর্মসংস্থান তৈরি হবে।
সার্বিক বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. ইয়াছিন আলী বলেন, জেলায় চলতি বছর আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা সাড়ে ৪ লাখ মেট্রিক টন ছাড়িয়ে যেতে পারে এবং সামগ্রিক বেচাকেনাও গত বছরের রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে। মৌসুমের আবহাওয়া এখন পর্যন্ত অনুকূলে রয়েছে।
তিনি বলেন, বাণিজ্যের এই চাঙ্গাভাব এখন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্ববাজারেও ছড়িয়ে পড়ছে। গত বছর চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আম রপ্তানি হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে চলতি মৌসুমেও বিদেশে আম পাঠানো শুরু হয়েছে, যা দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা মো. মোমিনুল হক বলেন, আম বিপণন ব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে চাষিদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ডিজিটাল স্কেল বাধ্যতামূলক করাসহ কৃষক ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের কাজ চলমান রয়েছে।






