যে ৫ কৌশলে স্পেনকে হারাতে পারে মেসির আর্জেন্টিনা

চার বছর আগে কাতারের লুসাইলে বিশ্বকাপ জিতেছিল আর্জেন্টিনা। এবার লিওনেল মেসিদের সামনে সেই শিরোপা ধরে রাখার সুযোগ। সফল হলে ইতালি ও ব্রাজিলের পর টানা দুটি বিশ্বকাপজয়ী তৃতীয় দেশ হবে তারা। সর্বশেষ ১৯৬২ সালে এই কীর্তি গড়েছিল ব্রাজিল।
তবে ফাইনালে বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের নয় ইউরোপের চ্যাম্পিয়ন এবং টুর্নামেন্টে মাত্র একটি গোল হজম করা স্পেনকেই এগিয়ে রাখছেন বিশ্লেষকেরা। সেমিফাইনালে কিলিয়ান এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে ও মাইকেল ওলিসেদের ফ্রান্সকে ২-০ গোলে হারানোর ধরনও তাদের শ্রেষ্ঠত্বের বড় প্রমাণ।
অন্যদিকে আর্জেন্টিনার এবারের যাত্রা ছিল নাটকীয়তায় ভরা। কেপ ভার্দে ও সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত লড়তে হয়েছে। মিসরের বিপক্ষে দুই গোলে পিছিয়ে পড়েও জিতেছে তারা। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৮৫ মিনিট পর্যন্ত পিছিয়ে থাকার পর দুটি গোল করে ফাইনালে উঠেছে লিওনেল স্কালোনির দল।
তাহলে রদ্রি, লামিনে ইয়ামালদের স্পেনকে হারাতে কী করতে হবে আর্জেন্টিনাকে? আল জাজিরার বিশ্লেষণ এবং দুই দলের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স বলছে, পাঁচটি জায়গায় সফল হওয়াই হতে পারে মেসিদের শিরোপা ধরে রাখার চাবিকাঠি।
রদ্রির ছন্দ ভাঙতে হবে
স্পেনের খেলার নিয়ন্ত্রণ থাকে রদ্রি ও ফাবিয়ান রুইসের হাতে। তাদের সামনে দানি ওলমো জায়গা বদলে খেলেন। এই তিনজন ছন্দ পেয়ে গেলে প্রতিপক্ষকে বলের পেছনে দৌড়ানো ছাড়া খুব বেশি কিছু করার থাকে না।

আর্জেন্টিনার প্রথম কাজ তাই রদ্রিকে স্বাভাবিকভাবে বল গ্রহণ করতে না দেওয়া। তবে পরিকল্পনাহীনভাবে উঁচুতে উঠে চাপ প্রয়োগ করলেও বিপদ আছে। ছোট ছোট পাসে প্রথম চাপ কাটিয়ে ওঠার স্পেনের সহজাত ক্ষমতা রয়েছে।
এনজো ফার্নান্দেজ, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার ও লিয়ান্দ্রো পারেদেসকে মাঝমাঠের জায়গা সংকুচিত রাখতে হবে। স্পেন বল ফুলব্যাকদের দিকে পাঠালে সেটিই হতে পারে আর্জেন্টিনার চাপ প্রয়োগের সংকেত। মাঝখানে রদ্রিকে স্বাধীনতা দিয়ে শুধু ইয়ামালকে আটকানোর চেষ্টা করলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ দ্রুতই স্পেনের হাতে চলে যাবে।
মেসিকে বিচ্ছিন্ন হতে দেওয়া যাবে না
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের বড় সময় মেসি আক্রমণভাগে একা পড়ে ছিলেন। কিন্তু জায়গা পাওয়ার পর তিনিই এনজো ফার্নান্দেজের সমতাসূচক এবং লাউতারো মার্তিনেজের জয়সূচক গোল তৈরি করেন।
এই বিশ্বকাপে আট গোলের পাশাপাশি মেসির সহায়তা চারটি। গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে আট গোল ও তিন সহায়তা করা এমবাপ্পের চেয়ে আপাতত এগিয়ে আছেন তিনি। তবে এমবাপ্পে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে খেলতে পারেন বলে এই লড়াই এখনো শেষ হয়নি।

স্পেনের বিপক্ষে মেসিকে শুধু বল পায়ে দেওয়াই যথেষ্ট হবে না। তার সামনে ও দুই পাশে নিয়মিত দৌড় প্রয়োজন। হুলিয়ান আলভারেজ, জিউলিয়ানো সিমিওনে কিংবা লাউতারো যিনিই খেলুন, স্পেনের রক্ষণকে পেছনে সরিয়ে রাখার দায়িত্ব নিতে হবে।
মেসি নিচে নেমে বল নিতে গেলে একজন ফরোয়ার্ডকে তার কাছাকাছি থাকতে হবে। তা না হলে স্পেন সহজেই কয়েকজন খেলোয়াড় দিয়ে তাকে ঘিরে ফেলতে পারবে, যেমনটি তারা করেছে ওলিসের ক্ষেত্রে। মেসির জন্য জায়গা তৈরি করতে পারলেই আর্জেন্টিনার আক্রমণ ভয়ংকর হয়ে উঠবে।
স্পেনের ফুলব্যাকদের পেছনের জায়গা কাজে লাগাতে হবে
পেদ্রো পোরো ও মার্ক কুকুরেইয়া আক্রমণে উঠে স্পেনের মাঠের প্রস্থ বাড়ান। ইয়ামাল ভেতরে ঢুকলে পোরো ডান প্রান্ত ধরে এগিয়ে যান। বিপরীত পাশে একই কাজ করেন কুকুরেইয়া।
এই আক্রমণাত্মক প্রবণতাই আর্জেন্টিনাকে পাল্টা আক্রমণের সুযোগ দিতে পারে। বল কেড়ে নেওয়ার পর দ্রুত মেসি কিংবা ম্যাক অ্যালিস্টারের কাছে পৌঁছাতে পারলে ফুলব্যাকদের ফেলে যাওয়া জায়গায় আক্রমণ করা সম্ভব।
বিশেষ করে পোরোর পাশটি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ফ্রান্সের বিপক্ষে গোল করা এই ডিফেন্ডার হ্যামস্ট্রিংয়ে হালকা সমস্যায় ভুগছেন। ইয়ামালও শরীরে আঘাতের কারণে দলের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ অনুশীলন করেননি। যদিও স্পেন দুজনকেই ফাইনালে পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী।
ইয়ামালকে একজনের দায়িত্বে ছেড়ে দেওয়া যাবে না
ইয়ামালের এবারের বিশ্বকাপ তার সেরা টুর্নামেন্ট না হলেও একটি মুহূর্তেই ম্যাচের গতিপথ বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। বাঁ পায়ে ভেতরের দিকে ঢুকে শট নেওয়া কিংবা ওলমো ও পোরোর সঙ্গে দ্রুত পাস বিনিময় তার সবচেয়ে বড় অস্ত্র।

আর্জেন্টিনার বাঁ প্রান্তের ডিফেন্ডারকে তাই একা ইয়ামালের মুখোমুখি করা ঝুঁকিপূর্ণ হবে। প্রয়োজন হলে একজন মিডফিল্ডারকে পাশে এনে তাঁকে বাইরের দিকে ঠেলে দিতে হবে। তবে সবাই ইয়ামালের দিকে ঝুঁকে পড়লে মাঝখানে ওলমো ও মিকেল ওয়ারসাবালের জন্য জায়গা তৈরি হবে।
ক্রিস্তিয়ান রোমেরো ও লিসান্দ্রো মার্তিনেজকে এই জায়গায় আগ্রাসনের পাশাপাশি ধৈর্য দেখাতে হবে। বল জয়ের জন্য অপ্রয়োজনে সামনে বেরিয়ে গেলে স্পেনের দ্রুত পাসে রক্ষণভাগ ভেঙে পড়তে পারে। বিপজ্জনক এলাকায় ফাউল এড়ানোও জরুরি।
প্রথম গোলের অপেক্ষায় বসে থাকা যাবে না
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তের প্রত্যাবর্তন আর্জেন্টিনার মানসিক শক্তির প্রমাণ। কিন্তু স্পেন এগিয়ে গেলে ইংল্যান্ডের মতো নিজেদের বক্সে সবাইকে নামিয়ে আনবে না। রদ্রি ও রুইস বল নিজেদের কাছে রেখে ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করবেন।
সে কারণে আবারও শেষ দশ মিনিটের নাটকের ওপর নির্ভর করা আর্জেন্টিনার জন্য বিপজ্জনক। প্রথমার্ধ থেকেই স্পেনকে চাপে রাখতে হবে। সুযোগ পেলে সেট পিস থেকেও সর্বোচ্চ সুবিধা নেওয়া প্রয়োজন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার দুটি গোলই এসেছে বক্সে পাঠানো বল থেকে।
প্রথম গোলটি আর্জেন্টিনা করতে পারলে স্পেনকে স্বাভাবিক পরিকল্পনা বদলে সামনে এগোতে হবে। তখন মেসি ও আর্জেন্টিনার দ্রুতগতির ফরোয়ার্ডদের জন্য জায়গা বাড়বে। বিপরীতে স্পেন এগিয়ে গেলে ফাইনালটি ধীরে ধীরে রদ্রিদের পছন্দের ম্যাচে পরিণত হতে পারে।
ফাইনালটিকে মেসি ও ইয়ামালের দ্বৈরথ হিসেবে দেখা হচ্ছে। একজন বার্সেলোনার অতীতের সবচেয়ে বড় নাম, অন্যজন বর্তমান ও ভবিষ্যতের মুখ। কিন্তু শিরোপার নিষ্পত্তি শুধু দুই তারকার জাদুতে না-ও হতে পারে। মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ, রক্ষণে শৃঙ্খলা এবং সুযোগ কাজে লাগানোর দক্ষতাই শেষ পর্যন্ত ঠিক করবে, স্পেন নতুন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হবে নাকি ৬৪ বছর পর শিরোপা ধরে রাখার কীর্তি গড়বে আর্জেন্টিনা।
.png)






