Advertisement

যে কারণে বিশ্বের সবচেয়ে বাসযোগ্য শহরের তালিকায় জায়গা পেল এসব নগর

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
যে কারণে বিশ্বের সবচেয়ে বাসযোগ্য শহরের তালিকায় জায়গা পেল এসব নগর
ছবি : বিবিসি

পৃথিবীর প্রতিটি শহরই নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে আলাদা। কোথাও কর্মসংস্থানের সুযোগ বেশি, কোথাও উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, আবার কোথাও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও নিরাপদ জীবনযাপন মানুষকে আকৃষ্ট করে। কিন্তু যদি প্রশ্ন করা হয়, বসবাসের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে ভালো শহর কোনটি, তাহলে উত্তর খুঁজতে হয় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূচকের দিকে।

প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন শহরের জীবনযাত্রার মান মূল্যায়ন করে একটি তালিকা প্রকাশ করা হয়। এতে শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়, বরং একজন সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ, স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ ও মানসম্মত জীবন কাটাতে পারেন, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হয়।

২০২৬ সালের তালিকায়ও এমন কয়েকটি শহর উঠে এসেছে, যেগুলো উন্নত নাগরিক সুবিধা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং উচ্চমানের জনসেবার জন্য বিশ্বের সেরা বাসযোগ্য শহরের স্বীকৃতি পেয়েছে।

বাসযোগ্য শহর বলতে কী বোঝায়?

একটি শহরে শুধু উঁচু ভবন বা আধুনিক সড়ক থাকলেই সেটি বাসযোগ্য হয়ে ওঠে না। বাসযোগ্য শহর হলো এমন একটি নগর, যেখানে মানুষ নিরাপদে বসবাস করতে পারে, সহজে চিকিৎসাসেবা পায়, মানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে, যাতায়াত সুবিধাজনক এবং পরিবেশ তুলনামূলক স্বাস্থ্যকর।

এ ছাড়া সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, বিনোদনের সুযোগ, সবুজ এলাকা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং সরকারি সেবার মানও একটি শহরের বাসযোগ্যতা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।


কোন বিষয়গুলো দেখে এই তালিকা তৈরি করা হয়?

বিশ্বের বিভিন্ন শহর মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সাধারণত পাঁচটি প্রধান বিষয় বিবেচনা করা হয়।

প্রথমত, শহরটি কতটা নিরাপদ এবং রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে কতটা স্থিতিশীল।

দ্বিতীয়ত, স্বাস্থ্যসেবার মান। হাসপাতাল, চিকিৎসক, জরুরি চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার মান এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

তৃতীয়ত, শিক্ষা ব্যবস্থা। ভালো স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সুযোগ শহরকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।

চতুর্থত, অবকাঠামো। উন্নত সড়ক, গণপরিবহন, বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট এবং অন্যান্য নাগরিক সুবিধা এখানে বিবেচনায় আসে।

সবশেষে দেখা হয় সংস্কৃতি, পরিবেশ, বিনোদন এবং জীবনযাপনের সামগ্রিক মান।

২০২৬ সালে শীর্ষে কোপেনহেগেন

ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেন আবারও বিশ্বের সবচেয়ে বাসযোগ্য শহরের স্বীকৃতি পেয়েছে।

এই শহরের অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হলো পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, নিরাপদ জীবন, উন্নত সাইকেল অবকাঠামো এবং পরিবেশবান্ধব নগর পরিকল্পনা। শহরের অনেক মানুষ দৈনন্দিন যাতায়াতের জন্য সাইকেল ব্যবহার করেন। ফলে যানজট ও দূষণ তুলনামূলক কম।

এ ছাড়া স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং গণপরিবহন ব্যবস্থাও বিশ্বের সেরাদের মধ্যে অন্যতম।

ভিয়েনা এখনও সেরাদের কাতারে

অনেক বছর ধরেই অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনা বিশ্বের সবচেয়ে বাসযোগ্য শহরের তালিকায় রয়েছে।

শহরটি পরিচিত এর সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, উন্নত গণপরিবহন, নিরাপদ পরিবেশ এবং চমৎকার নগর পরিকল্পনার জন্য। এখানকার পার্ক, জাদুঘর, সংগীতচর্চা এবং ঐতিহাসিক স্থাপনা জীবনযাত্রাকে আরও সমৃদ্ধ করে।

জুরিখের সাফল্যের রহস্য

সুইজারল্যান্ডের জুরিখও বরাবরের মতো শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে।

উন্নত অর্থনীতি, উচ্চমানের স্বাস্থ্যসেবা, পরিষ্কার পরিবেশ এবং নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন শহরটিকে বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় নগরে পরিণত করেছে। একই সঙ্গে এটি ব্যবসা ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ একটি কেন্দ্র।

অস্ট্রেলিয়ার শহরগুলোর শক্ত অবস্থান

মেলবোর্ন, সিডনি এবং অ্যাডিলেড আবারও বিশ্বের সবচেয়ে বাসযোগ্য শহরের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে।

এই শহরগুলোতে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, উন্মুক্ত সবুজ এলাকা এবং তুলনামূলক ভারসাম্যপূর্ণ নগরজীবন মানুষের জীবনমানকে উন্নত করেছে। কাজ এবং ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার সুযোগও এখানে বেশি।

এশিয়ার প্রতিনিধিত্ব

এশিয়ার কয়েকটি শহরও এবার শীর্ষ তালিকায় রয়েছে। এর মধ্যে জাপানের ওসাকা ও টোকিও উল্লেখযোগ্য।

পরিচ্ছন্নতা, সময়নিষ্ঠ গণপরিবহন, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা এবং জননিরাপত্তার কারণে এই শহরগুলো আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত।

নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ডও আবার শীর্ষ শহরগুলোর মধ্যে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, কম দূষণ এবং উন্নত নাগরিক সুবিধা শহরটিকে বসবাসের জন্য আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

এসব শহর থেকে কী শেখার আছে?

বিশ্বের সবচেয়ে বাসযোগ্য শহরগুলোর দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়, মানুষের জীবনমান উন্নত করাই একটি সফল শহরের মূল লক্ষ্য।

নিরাপদ সড়ক, মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা, নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন, পর্যাপ্ত সবুজ এলাকা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং পরিকল্পিত নগরায়ণ একটি শহরকে বাসযোগ্য করে তোলে।

যেসব শহর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে নাগরিক সুবিধায় বিনিয়োগ করেছে, তারাই আজ এই তালিকায় এগিয়ে।

একটি শহরকে বাসযোগ্য করে মানুষ

যেকোনো শহরের উন্নয়ন শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়। নাগরিকদের সচেতনতা, নিয়ম মেনে চলা, পরিবেশ রক্ষা এবং জনসম্পদ ব্যবহারে দায়িত্বশীল আচরণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

পরিচ্ছন্ন রাস্তা, কম দূষণ, নিরাপদ পরিবেশ এবং সুন্দর জনজীবন গড়ে তুলতে প্রশাসন ও নাগরিকদের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

কেন এই তালিকা গুরুত্বপূর্ণ?

বিশ্বের সবচেয়ে বাসযোগ্য শহরের তালিকা শুধু একটি র‌্যাঙ্কিং নয়। এটি দেখিয়ে দেয়, কোন শহরগুলো মানুষের জন্য স্বাস্থ্যকর, নিরাপদ এবং আরামদায়ক জীবন নিশ্চিত করতে পেরেছে।

বিশ্বজুড়ে দ্রুত নগরায়ণের এই সময়ে শহরগুলোর সামনে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, যানজট এবং দূষণের মতো সমস্যার মধ্যেও যেসব শহর মানুষের জীবনমান ধরে রাখতে পারছে, তারাই ভবিষ্যতের নগর পরিকল্পনার উদাহরণ হয়ে উঠছে।

এই কারণেই বিশ্বের সবচেয়ে বাসযোগ্য শহরগুলোর তালিকা শুধু ভ্রমণপ্রেমী বা বিদেশে বসবাসের পরিকল্পনা করা মানুষের জন্য নয়, বরং নগর পরিকল্পনাবিদ, নীতিনির্ধারক এবং সাধারণ নাগরিক সবার কাছেই গুরুত্বপূর্ণ। উন্নত নগরজীবনের পথে এগোতে চাইলে এই শহরগুলোর অভিজ্ঞতা ও পরিকল্পনা থেকে অনেক কিছু শেখার সুযোগ রয়েছে।

সূত্র: বিবিসি