Advertisement

টিকা যেভাবে রক্ষা করেছে মানব সভ্যতা

টিকা যেভাবে রক্ষা করেছে মানব সভ্যতা
ছবি : সংগৃহীত

শিশুর জন্মের পর থেকে বিভিন্ন সময় নিয়ম করে তাকে টিকা দিতে হয়। অনেক ধরনের অসুখ থেকে শিশুকে নিরাপদে রাখার জন্য টিকার বিকল্প নেই। পৃথিবীর অনেক দেশেই সরকারের ব্যবস্থাপনায় শিশুদের টিকা নিশ্চিত করা হয়। টিকা দেওয়ায় কোনো অনিয়ম হলে তার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা বাংলাদেশের হামের সংক্রমণে সাম্প্রতিক সময়ে অনেক শিশুর করুণ মৃত্যুতে আমরা দেখতে পাচ্ছি। অতীতে এমন পরিস্থিতি ছিল আরও ভয়াবহ। কারণ, তখন টিকা আবিষ্কার হয়নি।

একসময় ছোট ভাইরাস পুরো শহর, এলাকা, জনপদকে মৃত্যুপুরীতে পরিণত করতে পারত। শিশুর জন্মের পর তার বাবা-মা নিশ্চিত হতে পারতেন না, সে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার সুযোগ পাবে কি না। গুটিবসন্ত, হাম, পোলিও, ডিপথেরিয়া কিংবা ধনুষ্টংকারের মতো রোগ ছিল মানুষের আতঙ্ক। চিকিৎসা ছিল সীমিত, আর প্রতিষেধক বলতে প্রায় কিছুই ছিল না।

তবে বর্তমান পৃথিবী অনেকটাই ভিন্ন। জন্মের পর থেকেই শিশুদের নিয়মিত টিকা দেওয়া হয়। অনেক প্রাণঘাতী রোগ সম্পূর্ণ নির্মূল অথবা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের জীবন রক্ষা করেছে একটি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার—টিকা।

যদিও এই সাফল্য রাতারাতি আসেনি। হাজার বছরের পর্যবেক্ষণ, সাহসী পরীক্ষা-নিরীক্ষা, বিজ্ঞানীদের নিরলস গবেষণা এবং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে টিকার ইতিহাস। সেই ইতিহাস শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞান নয়, মানবসভ্যতার টিকে থাকার এক অসাধারণ গল্প।

টিকার আগের পৃথিবী

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের আগে সংক্রামক রোগ ছিল মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু। এর মধ্যে ভয়ংকর ছিল গুটিবসন্ত। এই রোগে কোটি কোটি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। যারা বেঁচে যেতেন, তাদের অনেকের মুখে স্থায়ী দাগ থাকত। অনেকে দৃষ্টিশক্তিও হারাতেন।

শুধু গুটিবসন্তই নয়—হাম, ডিপথেরিয়া, টিটেনাস, পোলিও, নিউমোনিয়াও ছিল মৃত্যুর বড় কারণ। এসব রোগের বিরুদ্ধে মানুষের কার্যকর কোনো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল না।

ছবি : সংগৃহীত
ছবি : সংগৃহীত

তবে মানুষ আগেই একটি বিষয় লক্ষ্য করেছিল, কোনো ব্যক্তি একবার গুটিবসন্তে আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হয়ে উঠলে তিনি দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হতেন না। এই পর্যবেক্ষণই পরবর্তী সময়ে টিকার ধারণার ভিত্তি তৈরি করে।

প্রাচীন পৃথিবীতে রোগ প্রতিরোধের প্রথম প্রচেষ্টা

বিজ্ঞানের ভাষায় টিক আবিষ্কার হয়নি। কিন্তু মানুষ রোগ প্রতিরোধের উপায় খুঁজতে শুরু করেছিল অনেক আগেই। ইতিহাসবিদদের মতে, চীনে কয়েকশ বছর আগে গুটিবসন্ত আক্রান্ত ব্যক্তির শুকিয়ে যাওয়া ক্ষত থেকে সংগৃহীত গুঁড়া সুস্থ মানুষের নাকে প্রবেশ করানো হতো। ধারণা ছিল, এতে রোগের হালকা সংক্রমণ হবে এবং ভবিষ্যতে মারাত্মক গুটিবসন্ত থেকে সুরক্ষা মিলবে। ভারতেও একই ধরনের একটি পদ্ধতির উল্লেখ পাওয়া যায়। সেখানে আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষত থেকে সংগৃহীত নমুনা শরীরে ছোট ক্ষতের মাধ্যমে প্রবেশ করানো হতো।

পরবর্তীতে অটোমান সাম্রাজ্যেও এই পদ্ধতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। যদিও এতে ঝুঁকি ছিল, তবুও স্বাভাবিক গুটিবসন্তে আক্রান্ত হওয়ার তুলনায় মৃত্যুহার কম ছিল। এই পদ্ধতির নাম ছিল ভ্যারিওলেশন। এটি আধুনিক টিকা ছিল না, কিন্তু রোগ প্রতিরোধে মানুষের প্রথম বড় পদক্ষেপ।

অটোমান সাম্রাজ্য থেকে ইউরোপে নতুন ধারণা

আঠারো শতকের শুরুতে ব্রিটিশ অভিজাত নারী লেডি মেরি ওর্টলি মন্টেগু অটোমান সাম্রাজ্যে অবস্থানের সময় ভ্যারিওলেশন পদ্ধতি নিজের চোখে দেখেন। তিনি নিজেও আগে গুটিবসন্তে আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং রোগের দাগ সারাজীবন বহন করেছিলেন। তাই এই পদ্ধতির সম্ভাবনা তিনি দ্রুত বুঝতে পারেন। ইংল্যান্ডে ফিরে তিনি নিজের সন্তানদের ভ্যারিওলেশন করান। প্রথমদিকে চিকিৎসক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে এ নিয়ে অনেক সন্দেহ ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে পরীক্ষার মাধ্যমে দেখা যায়, এটি অনেক ক্ষেত্রে প্রাণ বাঁচাতে সক্ষম। এই ঘটনাই ইউরোপে রোগ প্রতিরোধ নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণার নতুন অধ্যায় শুরু করে।

এডওয়ার্ড জেনার এবং আধুনিক টিকার জন্ম

টিকার ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নাম ব্রিটিশ চিকিৎসক এডওয়ার্ড জেনার। গ্রামে কাজ করার সময় তিনি একটি প্রচলিত বিশ্বাসের কথা শুনেছিলেন। যারা গরুর বসন্তে আক্রান্ত হন, তারা নাকি গুটিবসন্তে আক্রান্ত হন না। জেনার এই ধারণাকে বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন।

১৭৯৬ সালে তিনি বসন্তে আক্রান্ত গরুকে দুধ দোহনকারী এক নারীর হাতের ক্ষত থেকে নমুনা সংগ্রহ করেন। পরে তিনি আট বছর বয়সি জেমস ফিপস নামের এক শিশুর শরীরে নমুনা প্রয়োগ করেন। পরে ওই শিশুকে গুটিবসন্তের সংস্পর্শে আনা হলেও সে অসুস্থ হয়নি। এই পরীক্ষাই চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে নতুন যুগের সূচনা করে। জেনার তার আবিষ্কারের নাম দেন ভ্যাকসিনেশন। লাতিন ভাষায় ভাক্কা শব্দের অর্থ গরু। সেখান থেকেই এসেছে Vaccine শব্দটি।

প্রথমদিকে জেনারের গবেষণা নিয়ে বিতর্ক ছিল। অনেকেই তার ধারণা বিশ্বাস করেননি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার আবিষ্কারই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে।

লুই পাস্তুরের হাত ধরে নতুন বিপ্লব

উনিশ শতকে ফরাসি বিজ্ঞানী লুই পাস্তুর টিকার ধারণাকে আরও বিস্তৃত করেন। তিনি প্রমাণ করেন যে অণুজীবই বহু সংক্রামক রোগের কারণ। এরপর তিনি গবেষণার মাধ্যমে দুর্বল করা জীবাণু ব্যবহার করে নতুন ধরনের টিকা তৈরির পথ দেখান। মুরগির কলেরা, অ্যানথ্রাক্স এবং জলাতঙ্কের বিরুদ্ধে তার গবেষণা চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন দিগন্ত খুলে দেয়।

ছবি : সংগৃহীত
ছবি : সংগৃহীত

বিশেষ করে জলাতঙ্কের টিকা মানুষের জীবন বাঁচানোর ক্ষেত্রে যুগান্তকারী সাফল্য এনে দেয়। কারণ, একবার রোগের লক্ষণ দেখা দিলে জলাতঙ্ক প্রায় শতভাগ ক্ষেত্রেই প্রাণঘাতী।

একের পর এক নতুন টিকার আবিষ্কার

বিশ শতকে এসে টিকা গবেষণায় অভূতপূর্ব অগ্রগতি ঘটে। ক্রমে ডিপথেরিয়া, টিটেনাস, পার্টুসিস বা হুপিং কাশি, যক্ষ্মা, হাম, মাম্পস, রুবেলা, পোলিও, হেপাটাইটিস বি, নিউমোকক্কাল রোগ, রোটাভাইরাস এবং আরও অনেক সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে টিকা তৈরি হয়। শিশু মৃত্যুর হার কমাতে এসব টিকার ভূমিকা ছিল অসাধারণ। আজ পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই শিশুদের জন্য নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি রয়েছে। জন্মের পর থেকেই নির্দিষ্ট সময়সূচি অনুযায়ী টিকা দেওয়া হয়।

গুটিবসন্ত নির্মূল, মানবজাতির সবচেয়ে বড় জয়

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে গুটিবসন্ত নির্মূলের জন্য বৈশ্বিক কর্মসূচি শুরু করে। বিশ্বজুড়ে ব্যাপক টিকাদান, রোগ শনাক্তকরণ এবং আক্রান্ত ব্যক্তিদের দ্রুত বিচ্ছিন্ন করার মাধ্যমে ধীরে ধীরে রোগটির বিস্তার বন্ধ করা সম্ভব হয়। ১৯৭৭ সালে বিশ্বের শেষ প্রাকৃতিক গুটিবসন্ত রোগী শনাক্ত হন।

এরপর ১৯৮০ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে, পৃথিবী থেকে গুটিবসন্ত নির্মূল হয়েছে। এটি এখন পর্যন্ত মানুষের মাধ্যমে সম্পূর্ণ নির্মূল হওয়া একমাত্র সংক্রামক রোগ।

পোলিওর বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াই


ছবি : সংগৃহীত
ছবি : সংগৃহীত


একসময় পোলিও ছিল শিশুদের জন্য ভয়াবহ আতঙ্ক। এই রোগে আক্রান্ত হয়ে বহু শিশু স্থায়ীভাবে পঙ্গু হয়ে যেত। বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে কার্যকর পোলিও টিকা আবিষ্কারের পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। বিশ্বব্যাপী টিকাদান কর্মসূচির কারণে অধিকাংশ দেশ এখন পোলিওমুক্ত। যদিও বিশ্বের কিছু অঞ্চলে এখনও এই রোগ পুরোপুরি নির্মূল হয়নি, তবু আগের তুলনায় এর প্রকোপ নাটকীয়ভাবে কমে গেছে।

টিকা কীভাবে কাজ করে

মানবদেহের প্রতিরোধব্যবস্থা জীবাণুকে শনাক্ত করে তার বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা গড়ে তোলে। টিকা শরীরে রোগের সম্পূর্ণ শক্তিশালী জীবাণু প্রবেশ করায় না। বরং জীবাণুর দুর্বল বা নিষ্ক্রিয় অংশ, অথবা তার নির্দিষ্ট প্রোটিন শরীরে প্রবেশ করানো হয়। এর ফলে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা জীবাণুকে চিনে নেয় এবং তার বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি ও স্মৃতিকোষ তৈরি করে। পরে প্রকৃত জীবাণু শরীরে প্রবেশ করলে প্রতিরোধ ব্যবস্থা দ্রুত সক্রিয় হয়ে রোগের ঝুঁকি অনেক কমিয়ে দেয়।

কোভিড-১৯ এবং টিকার নতুন যুগ

২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারি পুরো বিশ্বকে নাড়িয়ে দেয়।

মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে বিজ্ঞানীরা নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে একাধিক কার্যকর টিকা তৈরি করেন। বিশেষ করে এমআরএনএ প্রযুক্তিভিত্তিক টিকা চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়। এর আগে এই প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা চললেও কোভিড-১৯ মহামারির সময় এটি প্রথমবারের মতো ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। এর ফলে ভবিষ্যতে ক্যানসার, ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিকিৎসা এবং অন্যান্য সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে নতুন ধরনের টিকা তৈরির সম্ভাবনাও বেড়েছে।

ছবি : সংগৃহীত
ছবি : সংগৃহীত

টিকা নিয়ে ভুল ধারণা কেন ছড়ায়

টিকা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। জেনারের সময়েও অনেকে টিকা নিতে ভয় পেতেন। বর্তমান যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুল তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার কারণে অনেক সময় মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, কোনো টিকাই শতভাগ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ামুক্ত নয়। তবে গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অত্যন্ত বিরল। অন্যদিকে টিকা না নেওয়ার ফলে যে রোগগুলো হতে পারে, সেগুলোর ঝুঁকি অনেক বেশি। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের ওপর পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, অনুমোদিত টিকাগুলো সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর এবং জনস্বাস্থ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ভবিষ্যতের টিকা কেমন হতে পারে

বিজ্ঞানীরা এখন শুধু সংক্রামক রোগ নয়, ক্যানসার, ম্যালেরিয়া, এইচআইভি এবং আলঝেইমারের মতো রোগের জন্যও নতুন ধরনের টিকা নিয়ে কাজ করছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জিনপ্রযুক্তি এবং এমআরএনএ প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে আরও দ্রুত ও কার্যকর টিকা তৈরির চেষ্টা চলছে। এমন এক ভবিষ্যতের কল্পনা করা হচ্ছে, যেখানে কোনো নতুন সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার কয়েক মাসের মধ্যেই তার কার্যকর টিকা তৈরি করা সম্ভব হবে।

মানবসভ্যতার সবচেয়ে বড় অর্জনের একটি

মানবজাতির ইতিহাসে এমন খুব কম আবিষ্কার আছে, যা কোটি কোটি মানুষের জীবন সরাসরি বাঁচিয়েছে। টিকা সেই বিরল অর্জনগুলোর একটি। একসময় যে গুটিবসন্ত মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিত, আজ সেটি ইতিহাসের অংশ। যে পোলিও হাজার হাজার শিশুকে পঙ্গু করত, তা এখন পৃথিবীর অধিকাংশ অঞ্চলে প্রায় বিলুপ্ত। হাম, ডিপথেরিয়া, টিটেনাস এবং আরও বহু রোগের ভয়ও আগের তুলনায় অনেক কমেছে।

দুই শতাব্দীরও বেশি সময় আগে এডওয়ার্ড জেনারের ছোট্ট একটি পরীক্ষা থেকে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা আজও থেমে নেই। নতুন রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বিজ্ঞানীরা প্রতিনিয়ত নতুন টিকা তৈরি করছেন। তাই টিকার ইতিহাস শুধু অতীতের গল্প নয়, ভবিষ্যতেরও গল্প।