বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর চত্বরে ছিল না ‘ভাস্কর্য’, গায়েব ৩২ লাখ টাকার ফাইল!

ঝিনাইদহ শহরের প্রবেশদ্বার কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকায় নির্মিত বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান চত্বরটি ভেঙে ফেলা হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে ঝিনাইদহ পৌরসভা চত্বরটি সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু করেছে। তবে চত্বরটি অপসারণের উদ্যোগের মাঝেই সামনে এসেছে এক যুগ আগের একটি বিতর্কিত ও আলোচিত প্রকল্পের নানান অনিয়মের প্রশ্ন। প্রায় ৩২ লাখ টাকা ব্যয়ে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান চত্বর ও ভাস্কর্য নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেখানে কখনোই কোনো ভাস্কর্য বা অবয়ব নির্মিত হয়নি। স্থানীয়দের তথ্যমতে, কেবল একটি বড় পাথর স্থাপন করেই প্রকল্পটির উদ্বোধন করা হয়েছিল। বর্তমানে ওই মেগা প্রকল্পের মূল ফাইলও পৌরসভার প্রকৌশল বিভাগে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
জানা যায়, ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহ-যশোর মহাসড়কের সংযোগস্থলে কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের সামনে সড়কের ঠিক মাঝখানে চত্বরটি নির্মাণ করা হয়েছিল। ভাস্কর্য ভাঙা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
চালকদের অভিযোগ, ভাস্কর্যটি এমন জায়গায় স্থাপন করা হয়েছে যে, সড়কের এক প্রান্ত থেকে ওপর প্রান্তে কোনো গাড়ি আসছে কি না দেখা যায় না। এতে অনেক সময়ই আমাদের ঝুঁকির মধ্যে পড়তে হয়। অন্যদিকে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের পরিবারের দাবি, ভাস্কর্য ভেঙে ফেলা বীরশ্রেষ্ঠকে অসম্মান করার শামিল।
চুয়াডাঙ্গার বাসচালক আবির মাহমুদ বলেন, ‘এই পাথরের জন্য মোড়ে গাড়ি ঘোরাতে অনেক সমস্যা হতো। বহুবার এখানে ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে, মানুষ আহত হয়েছে। এটি সরিয়ে দিলে যাতায়াত অনেক সহজ ও নিরাপদ হবে।’
পথচারী আজিজুল হক বলেন, প্রত্যেকটি শহরের প্রবেশমুখেই জেলার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও ঐতিহ্য নিয়ে ব্র্যান্ডিং ভাস্কর্য বা প্রতিকৃতি রয়েছে। ঝিনাইদহ শহরের প্রবেশমুখে এই স্থানটিতে একটি ভাস্কর্য ছিল। শুনেছি এটি ঝিনাইদহের গর্ব বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের। এখন দেখছি ভেঙে ফেলা হচ্ছে। তবে কেন ভাঙা হচ্ছে আমরা জানি না।

বীর মুক্তিযোদ্ধা সিদ্দিকুর রহমান বলেন, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান ঝিনাইদহ তথা সারা দেশের গর্ব। তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে নিজের জীবন দিয়ে বীরত্বপূর্ণ ইতিহাস লিখে গেছেন। তার নামে একটি চত্বর থাকলে নতুন প্রজন্ম তার সম্পর্কে জানবে। সেটা যদি জেলার প্রবেশমুখে হয়, তাহলে যেকেউ জেলায় প্রবেশের পথেই তার সম্পর্কে জানতে পারবে।
ঝিনাইদহ জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের আহ্বায়ক আব্দুল মজিদ বলেন, ‘সেখানে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের কোনো ভাস্কর্য নির্মাণ হচ্ছে বা হয়েছিল, এমনটি আমার জানা নেই। তাই এ বিষয়ে আমার কোনো মন্তব্য নেই।’
অন্যদিকে সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার কামালুজ্জামান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘সেখানে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের কোনো ভাস্কর্য ছিল না, নির্মাণও করা হয়নি। যদি হতো, তবে আমরা অবশ্যই জানতাম। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় মহলে নানা প্রশ্ন উঠছে।’
পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাশেদ আলী খান জানান, ২০১৪ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসক সরোজ কুমার নাথ এবং তৎকালীন পৌর মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইদুল করিম মিন্টুর সময়ে প্রকল্পটির উদ্বোধন করা হয়। প্রকল্পের মোট বরাদ্দ ছিল ৩২ লাখ টাকা। প্রাথমিক পর্যায়ে ১১ লাখ টাকা উত্তোলন করে কাজ শুরু হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে কী হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি অবগত নন।
ঝিনাইদহের সাবেক জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মাসউদ এশিয়া পোস্টকে জানান, জনদুর্ভোগ লাঘব ও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে গণমাধ্যমকর্মীদের অনুরোধে এবং আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চত্বরটি অপসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এখন হয়তো সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক নোমান হোসেন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘জেলা বীরমুক্তিযোদ্ধারা যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেটিই সঠিক। সেখানে প্রকৃত অর্থে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের কোনো স্বীকৃত ভাস্কর্য ছিল—এমনটি কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারেননি। গত দুদিন ধরে বিষয়টি বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমার নজরে এসেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ওই স্থাপনা অপসারণের সিদ্ধান্তটি নতুন নয়। অনেক আগেই জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। মূলত সড়কের মাঝখানে নির্মিত পাথরের স্তম্ভটি যানবাহন চলাচলের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল এবং এর কারণে অতীতে একাধিক সড়ক দুর্ঘটনাও ঘটেছে। দীর্ঘদিনের সেই সিদ্ধান্তই এখন বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। জননিরাপত্তার স্বার্থে এটি একটি ইতিবাচক ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত বলেই আমি মনে করি।’
এদিকে দীর্ঘদিন পর জনদুর্ভোগের কারণ হওয়া এই চত্বরটি অপসারণে সাধারণ মানুষের মাঝে স্বস্তি ফিরলেও, বীরশ্রেষ্ঠের নামে নেওয়া ৩২ লাখ টাকার সরকারি প্রকল্পে কেন ভাস্কর্য নির্মিত হলো না, বরাদ্দের টাকা কোথায় গেল এবং কীভাবে মূল ফাইল গায়েব হলো—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়টির সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত তথ্য উদ্ঘাটন এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন।
.png)






