পশ্চিমবঙ্গে স্কুল ভ্যানে ট্রেনের ধাক্কা, মৃত্যু ৫

পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলায় খোলা রেলগেট পার হওয়ার সময় একটি স্কুল ভ্যানকে লোকাল ট্রেন ধাক্কা দিয়েছে। ভয়াবহ এই দুর্ঘটনায় চার স্কুল শিক্ষর্থীসহ মোট ৫ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে একজন স্থানীয় বাসিন্দা। এই ঘটনায় আরও কয়েকজন আহত হয়েছে। তাদের মধ্যে পাঁচ শিশুর অবস্থা আশঙ্কাজনক।
শুক্রবার (১৭ জুলাই) সকাল ৭টার দিকে কাটোয়া-আজিমগঞ্জ শাখার কর্ণসুবর্ণ ও গোবিন্দপুর স্টেশনের মাঝামাঝি একটি লেভেল ক্রসিংয়ে এই দুর্ঘটনা ঘটে। নিমতিতা-কাটোয়া লোকাল ট্রেনটি ওই স্কুল ভ্যানকে সজোরে ধাক্কা দিলে এই হতাহতের ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দুর্ঘটনার ঠিক আগে আপ লাইনে হাওড়াগামী নবদ্বীপ এক্সপ্রেস চলে যায়। এরপরই গোবিন্দপুর রেলগেটটি খুলে দেওয়া হয়। গেট খোলা দেখে স্কুলপড়ুয়াদের বহনকারী ভ্যানটি রেললাইন পার হতে শুরু করে। ঠিক সেই সময় দ্রুতগতিতে বিপরীত দিক থেকে আসা নিমতিতা-কাটোয়া লোকাল ট্রেনটি ভ্যানটিকে সজোরে ধাক্কা দেয়। সংঘর্ষে স্কুল ভ্যানটি দুমড়ে-মুচড়ে যায়। ঘটনাস্থলে তিন শিশুর মৃত্যু হয়। পরবর্তীতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫ জনে দাঁড়ায়। নিহতদের মধ্যে চারজন স্কুলপড়ুয়া ও একজন স্থানীয় বাসিন্দা। ভ্যানটিতে মোট ১০ জন শিক্ষার্থী ছিল।
খবর পেয়ে রেল পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন ও উদ্ধারকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। স্থানীয় বাসিন্দারাও উদ্ধারকাজে অংশ নেন। আহতদের দ্রুত নিকটবর্তী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। গুরুতর আহত কয়েকজনকে মুর্শিদাবাদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। স্কুল ভ্যানের চালকও গুরুতর আহত হয়েছেন।
দুর্ঘটনার পর স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। তাদের অভিযোগ, দায়িত্বে অবহেলার কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, গেটম্যান সময়মতো রেলগেট বন্ধ করেননি। তার বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ, তিনি প্রায়ই নেশাগ্রস্ত অবস্থায় দায়িত্ব পালন করতেন। দিনের বেশির ভাগ সময় তাকে কেবিনে নেশার ঘোরে বসে থাকতে দেখা যেত। এমনও অভিযোগ উঠেছে, অতীতেও গেট পরিচালনায় অবহেলার ঘটনা ঘটেছে এবং বহু দিন গেট বন্ধ করার পর তিনি আবার খুলতে ভুলে যেতেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, এদিন সকালে প্রথমে একটি আপ ট্রেন ওই লাইন দিয়ে যাওয়ার পর রেলগেট খুলে দেওয়া হয়েছিল। সেই সুযোগে পুলকারসহ কয়েকটি যানবাহন রেললাইন পার হতে শুরু করে। ঠিক সেই সময় বিপরীত দিক থেকে নিমতিতা-কাটোয়া প্যাসেঞ্জার ট্রেনটি চলে আসে। অভিযোগ, সেই মুহূর্তে গেটম্যানকে ঘটনাস্থলে দেখা যায়নি। শেষ মুহূর্তে গেট নামানোর চেষ্টা করা হলেও ততক্ষণে পুলকার এবং এক সাইকেল আরোহী রেললাইনের ওপর আটকে পড়েন। এরপরই এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে।
দুর্ঘটনার পর পূর্ব রেল কর্তৃপক্ষ প্রাথমিক তদন্তে স্বীকার করেছে, ট্রেনটি যখন লেভেল ক্রসিং অতিক্রম করছিল তখন রেলগেট খোলা ছিল। রেলের প্রকাশিত আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। তবে একই সঙ্গে রেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সিগন্যাল ব্যবস্থায় কোনো ত্রুটি ছিল না। নির্ধারিত সংকেত মেনে ট্রেন চলছিল। ফলে তদন্তের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে এখন দায়িত্বপ্রাপ্ত গেটম্যানের ভূমিকা। ইতোমধ্যে কর্তব্যে গাফিলতির অভিযোগে সংশ্লিষ্ট গেটম্যানকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। একই সঙ্গে তাকে এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সুপারভাইজারকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে রেল কর্তৃপক্ষ।
রেল কর্তৃপক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এটি একটি মানুষ চালিত বা ম্যানুয়াল লেভেল ক্রসিং। তাই দুর্ঘটনার সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মী নিজের জায়গায় উপস্থিত ছিলেন কি না, থাকলে কীভাবে গেট পরিচালনা করেছিলেন এবং কেন গেট খোলা ছিল—সেই সমস্ত বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে রেলের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। হাওড়া থেকে অতিরিক্ত বিভাগীয় রেল ব্যবস্থাপকের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি বিশেষ তদন্তকারী দল ইতোমধ্যেই ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে।
তদন্তকারী দল প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানিয়েছে, প্রযুক্তিগত তথ্য এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের ভূমিকা খতিয়ে দেখে চূড়ান্ত রিপোর্ট জমা দেবে। সেই রিপোর্টের ভিত্তিতে পরবর্তী প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এদিকে, এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে প্রশাসন। দুর্ঘটনায় নিহতদের প্রত্যেকের পরিবারকে ১০ লাখ রুপি করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা করেছে রেল কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারও নিহতদের পরিবারপ্রতি ৫ লাখ রুপি করে আর্থিক সাহায্য দেওয়ার ঘোষণা করেছে।
.png)





