আলজাজিরার বিশ্লেষণ/আট দশক পর কেন গোয়েন্দা সংস্থা গড়ে তুলছে জাপান

মার্থে ভ্যান ডার উলফ
আট দশক পর কেন গোয়েন্দা সংস্থা গড়ে তুলছে জাপান
ছবি: সংগৃহীত

বিদেশি গুপ্তচরবৃত্তি এবং বহিরাগত আগ্রাসন রুখতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথম একটি সমন্বিত কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা গড়ে তুলতে যাচ্ছে জাপান। দীর্ঘ কয়েক দশক আমেরিকার গোয়েন্দা সহায়তার ওপর নির্ভরশীল থাকার পর নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকীকরণে এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে টোকিও।

জাপানের পার্লামেন্টে পাশ হওয়া নতুন এ আইনের মাধ্যমে মূলত দুটি বিশেষ প্রতিষ্ঠান তৈরি করা হচ্ছে। এর একটি হলো ‘ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স কাউন্সিল’, যা গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের জন্য সরকারের মূল কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে এবং অন্যটি মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম পরিচালনা করবে।

এর মাধ্যমে জাপানের বর্তমান ‘ক্যাবিনেট ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড রিসার্চ অফিস’-কে একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা কাঠামোতে রূপান্তর করা হচ্ছে। যদিও এটি যুক্তরাষ্ট্রের ‘সিআইএ’-এর মতো বিশাল কোনো সংস্থা নয়, তবুও যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি এবং অস্ট্রেলিয়ার মতো পশ্চিমা মিত্রদেশগুলো এই নতুন সংস্থা গঠনে জাপানকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দিচ্ছে।

জাপানি বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্পূর্ণ নিজস্ব আদলে তৈরি এই নতুন গোয়েন্দা মডেলটি বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা কমাবে এবং নীতিনির্ধারকদের কাছে দ্রুত সঠিক তথ্য পৌঁছাতে সাহায্য করবে।

টোকিওর দাবি, বর্তমানে তারা চীন, রাশিয়া এবং উত্তর কোরিয়ার মতো প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো থেকে ক্রমাগত বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছে। স্নায়ুযুদ্ধের সময় থেকে জাপান তার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ওয়াশিংটনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ছিল। সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মিত্রদেশগুলোর প্রতিরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার ব্যাপারে কিছুটা অনাগ্রহ এবং তাদের নিজস্ব সামরিক ব্যয় বাড়ানোর তাগিদ দেওয়ার পর থেকেই জাপান নিজের শক্তিতে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে।

এছাড়া জাপানে এতদিন কোনো কার্যকর গুপ্তচরবৃত্তি-বিরোধী আইন না থাকায় এটি বিদেশি চরদের জন্য একপ্রকার নিরাপদ স্বর্গরাজ্য ছিল, যা নতুন এই ব্যবস্থার মাধ্যমে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জাপানের বর্তমান বিকেন্দ্রীভূত গোয়েন্দা ব্যবস্থায় কোনো একক সংস্থার কাছে তথ্য প্রদানে বাধ্য করার আইনগত ক্ষমতা নেই। ফলে গুরুত্বপূর্ণ অনেক তথ্য ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকত এবং বিদেশি চরেরা সহজে পার পেয়ে যেত।

প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে জাপানের সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীকে ঢেলে সাজানোর প্রক্রিয়া বেগবান হয়েছে। ইতোমধ্যে দেশের ইতিহাসে রেকর্ড ৫৮ বিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা বাজেট অনুমোদন করেছে তার মন্ত্রিসভা, যার একটি বড় অংশ খরচ হবে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের সুরক্ষায় ড্রোন এবং লেজার শিল্ড তৈরিতে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরাজয়ের পর জাপানি নাগরিকদের মনে রাষ্ট্রীয় নজরদারি নিয়ে এক ধরনের ভীতি ও অবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল। তবে বর্তমান সংস্কারের ফলে দেশটির সাধারণ মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হবে না বলে আশ্বস্ত করেছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।

জাপানের এই সামরিক ও গোয়েন্দা শক্তির বিস্তার নিয়ে দেশের অভ্যন্তরে কিছু যুদ্ধবিরোধী প্রতিবাদ হলেও, সাম্প্রতিক জনমত জরিপে দেখা গেছে অধিকাংশ নাগরিক, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম এই ঐতিহাসিক সংস্কারের পক্ষে রায় দিচ্ছে।


লেখক: আলজাজিরা ইংলিশের একজন সাংবাদিক। তিনি একাধারে দ্য নিউ হিউম্যানিটেরিয়ান, ভাইস, হাফপোস্ট ইউক পডকাস্ট পরিচালনা করেন। এছাড়া হর্ন অফ আফ্রিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিষয়ক প্রতিবেদন কভার করেন।