রয়টার্সের প্রতিবেদন/হরমুজে টোল নেওয়া কি আইনগতভাবে বৈধ

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
হরমুজে টোল নেওয়া কি আইনগতভাবে বৈধ
হরমুজ প্রণালি। ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে টোল আদায় করা আইনগতভাবে কতটুকু বৈধ, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন অনুযায়ী এই প্রণালিতে কোনো ধরনের যাতায়াত ফি আদায় করা সম্পূর্ণ অবৈধ।

জাতিসংঘের সমুদ্র আইন বিষয়ক সম্মেলন ‘আনক্লজ’-এর আইন অনুযায়ী প্রণালির সীমান্তবর্তী রাষ্ট্রগুলো কেবল যাতায়াতের অনুমতির জন্য কোনো অর্থ দাবি করতে পারে না। এই চুক্তির ৩৮ নম্বর ধারা অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালিসহ বিশ্বজুড়ে ১০০টিরও বেশি প্রণালির মধ্য দিয়ে সব দেশের জাহাজ অবাধ ও বিনামূল্যে যাতায়াতের আইনি অধিকার রয়েছে। ১৯৯৪ সাল থেকে কার্যকর হওয়া আনক্লজ বর্তমানে আন্তর্জাতিক প্রথাগত আইন হিসেবে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত ও গণ্য করা হয়।

তবে আন্তর্জাতিক আইনের এই বাধ্যবাধকতার বাইরেও কিছু ভিন্ন যুক্তি রয়েছে। চুক্তিতে স্বাক্ষর না করা কিছু দেশ দাবি করতে পারে, তারা শুরু থেকে এবং ক্রমাগতভাবে এর বিরোধিতা করে আসছে। তাই এই চুক্তি মেনে চলার বাধ্যবাধকতা তাদের নেই।

ইরান দীর্ঘদিন ধরে এই আন্তর্জাতিক আইনের বিরুদ্ধে এ ধরনের আপত্তি জানিয়ে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র শুরু থেকে টোল আদায়ের বিষয়ে ইরানের এই একক কর্তৃত্বের তীব্র বিরোধিতা করে আসছে। কিন্তু নাটকীয়ভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবারের (১৩ জুলাই) সামাজিক যোগযোগমাধ্যমের পোস্টের আগে পরামর্শ দিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে জাহাজ চলাচলের ওপর নতুন টোল আরোপ করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রকে এখন পর্যন্ত সরাসরি তেমন কোনো টোল আদায় করতে দেখা যায়নি। তবে ট্রাম্পের এই বিতর্কিত ঘোষণার পর ওয়াশিংটন এ পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত কার্যকর করবে কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।

ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টে ঘোষণা জানান, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালিতে ইরানের ওপর আবারও নতুন করে নৌ অবরোধ পুনর্বহাল করতে যাচ্ছে। এই অবরোধের নাম দেওয়া হয়েছে ‘ইরানি অবরোধ’, কারণ এটি কেবল ইরানের জাহাজ বা গ্রাহকদের ছাড়া বাকিদের প্রবেশ ও প্রস্থান বন্ধ করে রেখেছে।

ট্রাম্প বলেন, এখন থেকে যুক্তরাষ্ট্র ‘হরমুজ প্রণালির মালিক’ হিসেবে পরিচিত হবে। এই অঞ্চলে নিরাপত্তা ও সুরক্ষা প্রদানের খরচ হিসেবে প্রণালির দিয়ে পরিবাহিত সব কার্গো বা পণ্যের ওপর ২০ শতাংশ হারে যুক্তরাষ্ট্রকে টোল দিতে হবে। এই প্রক্রিয়া অবিলম্বে শুরু করার নির্দেশও দিয়েছেন তিনি।

এর আগে গত এপ্রিলে ওয়াশিংটন ইরানের বন্দরগুলোতে জাহাজ চলাচল বন্ধ করতে অবরোধ শুরু করলেও, গত জুনে একটি অন্তর্বর্তীকালীন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির পর তারা এটি বন্ধ করেছিল।

ট্রাম্পের এই অভিভাবকত্ব ও টোল আদায়ের দাবির পর তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে ট্রাম্পের দাবির বিরোধিতা করে লিখেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একদম ঠিক বলেছেন। এই নৌপথের নিরাপত্তা রক্ষাকারীকে অবশ্যই ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। তবে আমেরিকা নয়, একমাত্র ইরান হরমুজ প্রণালির প্রকৃত মালিক ছিল এবং চিরকাল তাই থাকবে।

বিশ্ববাজারে চার সপ্তাহে সর্বোচ্চ জ্বালানি তেলের দাম

তিনি আরও বলেন, নিরাপত্তার জন্য ট্রাম্পের দাবি করা ২০ শতাংশ টোল অত্যন্ত বেশি, তবে ইরান এই দায়িত্ব পালনে সম্পূর্ণ ন্যায্য হবে।

এদিকে ট্রাম্প ও ইরানের এই নতুন বাকযুদ্ধ ও উত্তেজনার জেরে বিশ্ব অর্থনীতি ও শেয়ার বাজারে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে এক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এশিয়ার প্রাথমিক শেয়ার বাজারে লেনদেনে তীব্র অস্থিরতা দেখা গেছে। জাপানের বাইরে এশিয়া-প্যাসিফিক শেয়ারের এমএসসিআই সূচক ০ দশকি ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যার নেতৃত্ব দিয়েছে কোরিয়ান শেয়ারের ২ দশমিক ২ শতাংশ বৃদ্ধি। এছাড়া জাপানের নিক্কেই সূচক ০ দশমিক ২ শতাংশ বাড়লেও মার্কিন এসঅ্যান্ডপি ৫০০ ফিউচার সূচক ০ দশমিক ১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

মেলবোর্নের পেপারস্টোন গ্রুপ লিমিটেডের গবেষণা প্রধান ক্রিস ওয়েস্টন এই বিষয়ে বলেন, যদিও গত এক সপ্তাহ ধরে এই ঝুঁকিটি ব্যবস্থার মধ্যে তৈরি হচ্ছিল। তবে বাজারে ইরান সংকটের সর্বশেষ পরিস্থিতিতে অত্যন্ত তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে।