আরব আমিরাতে অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তান দোষ করলে শাস্তি পাবেন বাবা-মা

অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তান কোনো ভুল বা অপরাধ করলে পার পেয়ে যাবে, আর তার জন্য বাবা-মাকে কোনো জবাবদিহি করতে হবে না—সাধারণত অনেক অভিভাবকই এমনটি মনে করেন। কিন্তু সংযুক্ত আরব আমিরাতের কঠোর আইনি ব্যবস্থার বাস্তব চিত্রটি বেশ ভিন্ন এবং জটিল।
দেশটিতে সন্তানদের করা অপরাধের জন্য সরাসরি বাবা-মাকে শাস্তি দেওয়ার সাধারণ কোনো নিয়ম না থাকলেও, এমন কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে যেখানে সন্তানদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য বাবা ও মায়েরা দেওয়ানি (আর্থিক ক্ষতিপূরণ) এবং ফৌজদারি (কারাদণ্ড বা জরিমানা)—উভয় ধরনের কঠিন দায়ের মুখোমুখি হতে পারেন।
আরব আমিরাতের বিএসএ ল-এর সিনিয়র অ্যাসোসিয়েট আসমা সিদ্দিকি বিষয়টি ব্যাখ্যা করে জানান, ফৌজদারি দায়বদ্ধতা মূলত তখনই প্রযোজ্য হয় যখন কোনো অভিভাবকের নিজস্ব আচরণ অপরাধের শামিল হয়। যেমন—সন্তানকে অবহেলা করা, তাকে বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া, অপরাধে উসকানি দেওয়া, কিংবা প্রয়োজনীয় সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হওয়া।
অন্যদিকে, দেওয়ানি দায়বদ্ধতার বিষয়টি মূলত সন্তানের কারণে হওয়া ক্ষতির আর্থিক ক্ষতিপূরণের সঙ্গে জড়িত। আরব আমিরাতের দেওয়ানি লেনদেন আইন অনুসারে, কোনো অপ্রাপ্তবয়স্ককে তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে থাকা অভিভাবক বা জিম্মাদার ওই শিশুর দ্বারা হওয়া ক্ষতির জন্য আইনিভাবে দায়ী হতে পারেন।
তবে এই দায়বদ্ধতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয় না। অভিভাবকরা নিজেদের পক্ষে যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করতে পারেন, তারা সন্তানের প্রয়োজনীয় যত্ন নিয়েছিলেন অথবা তাদের সঠিক নজরদারি থাকা সত্ত্বেও এই ক্ষতি এড়ানো সম্ভব ছিল না।
এই পার্থক্যের একটি সাম্প্রতিক উদাহরণ তুলে ধরে আমাল আল রাশেদি ল ইয়ার্স অ্যান্ড লিগ্যাল কনসালট্যান্টস-এর আইনি পরামর্শক ড. হাসান এলহাইস জানান, আল আইনের একটি দেওয়ানি আদালত এক অপ্রাপ্তবয়স্কের অভিভাবককে ৩ হাজার দিরহাম ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ ওই অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তান স্ন্যাপচ্যাটে এক যুবককে হুমকি দিয়েছিল।
আইনি বিশেষজ্ঞরা সংবাদমাধ্যম খলিজ টাইমসকে জানান, মামলাটি দেওয়ানি ক্ষতিপূরণের স্তরে মীমাংসা হলেও এটি অপ্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের জবাবদিহিতার বিষয়টিকে পুনর্ব্যক্ত করে।
ফৌজিদারি দায়বদ্ধতার দিক
সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফেডারেল আইন অনুযায়ী, কোনো অপরাধ সংঘটনের সময় শিশুর বয়স ১২ বছর না হলে সে ফৌজদারিভাবে দায়ী হবে না। তবে প্রয়োজনে সরকারি কৌঁসুলি উপযুক্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থার নির্দেশ দিতে পারেন। যার মধ্যে বিচার বিভাগীয় প্রবেশন, ইলেকট্রনিক নজরদারি, সমাজসেবামূলক কাজ বা কোনো কিশোর সংশোধনাগারে পাঠানো অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
কিন্তু আসমা জানান, একটি শিশু ফৌজদারিভাবে দায়ী না হওয়ার মানে এই নয় যে ভুক্তভোগীরা ক্ষতিপূরণের অধিকার হারাবেন। তিনি বলেন, ভুক্তভোগী ব্যক্তি ওই শিশুকে তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে থাকা বাবা-মা, অভিভাবক বা জিম্মাদারের কাছ থেকে দেওয়ানি ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারেন।
এর পরিণতি নির্ভর করে আইনি ভিত্তির ওপর। দেওয়ানি দায়বদ্ধতার ফলে সাধারণত ভুক্তভোগীকে ক্ষতিপূরণ দিতে হয়। শিশু-সুরক্ষা আইন লঙ্ঘন—যেমন অবহেলা, নজরদারিতে ব্যর্থতা বা শিশুকে বিপদে ফেলা—ইত্যাদি অপরাধের জন্য কারাদণ্ড অথবা সর্বনিম্ন ৫ হাজার দিরহাম জরিমানা হতে পারে।
গুরুতর ক্ষেত্রে আরও কঠোর শাস্তি হতে পারে। একটি ফেডারেল আইনে বলা হয়েছে, কোনো কিশোরকে অপরাধ করতে উসকানি দিলে কারাদণ্ড এবং সর্বনিম্ন ৫০ হাজার দিরহাম জরিমানা হতে পারে। এছাড়া কোনো বিদেশি নাগরিক বা প্রবাসী এমন অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের দণ্ডবিধি অনুযায়ী তাকে দেশ থেকেও বহিষ্কার (ডিপোর্টেশন) করা হতে পারে।
গত মাসে শারজাহতে এক শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় জড়িত সন্দেহে দুই মেয়ের বাবা-মাকে তাদের সন্তানদের ওই কাজের জন্য গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং পরে তারা জামিনে মুক্তি পান। এই ঘটনার তদন্ত এখনও চলছে।
অভিভাবকদের জন্য আইনি আত্মরক্ষা ও পরামর্শ
উভয় বিশেষজ্ঞ একমত, অভিভাবকদের আত্মপক্ষ সমর্থনের কিছু মূল উপায় রয়েছে। ড. হাসান ব্যাখ্যা করেন, দেওয়ানি লেনদেন আইনের ২৬৫ ধারা অনুযায়ী, অভিভাবকরা এটি প্রমাণ করে দেওয়ানি দায় থেকে বাঁচতে পারেন। তারা প্রয়োজনীয় সতর্কতার সঙ্গে তাদের নজরদারির দায়িত্ব পালন করেছেন অথবা সঠিক নজরদারি থাকা সত্ত্বেও এই অপরাধ দমন করা যেত না।
ফৌজিদারির ক্ষেত্রে আত্মরক্ষা আরও সহজ। অন্য কারও করা অপরাধের জন্য বাবা-মাকে দোষী সাব্যস্ত করা যাবে না। আরব আমিরাতের আইন অন্য ব্যক্তির করা অপরাধের জন্য অন্য কাউকে সাজা দেওয়া অনুমোদন দেয় না।
নজরদারির আইনি দায়িত্ব পালনে ড. হাসান এবং আসমা অভিভাবকদের কিছু পরামর্শ দিয়েছেন:
- সন্তানের বয়স অনুযায়ী কার্যকর এবং ধারাবাহিক নজরদারি বজায় রাখা।
- শিশুদের ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ভিডিও গেম ব্যবহারের ওপর নজর রাখা এবং তাদের আইনি ও নৈতিক ঝুঁকিগুলো সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া।
- স্কুলে এবং স্কুলের বাইরে—উভয় পরিস্থিতিতে তাদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করা।
- অন্যের ক্ষতি করতে পারে এমন কোনো সরঞ্জাম যেন শিশুরা না পায়, তা নিশ্চিত করা।
- সন্তানের আচরণে আগ্রাসী মনোভাবের প্রথম লক্ষণ দেখামাত্র দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া।
- বাবা-মায়েরা যে সন্তানদের নজরদারি ও যত্নের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেছেন, তার প্রমাণস্বরূপ সাধারণ রেকর্ড রাখা।







