মেসিদের সামনে এবার অচেনা চ্যালেঞ্জ

আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ ইতিহাসে যা কখনো হয়নি, ২০২৬ সালে সেটির সামনে দাঁড়িয়ে লিওনেল মেসির দল। গ্রুপ পর্বে তিন ম্যাচের তিনটিই জিতে শেষ ৩২-এ উঠেছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। এখন প্রশ্ন, গ্রুপে শতভাগ জয়ের পথ ধরে কি শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপও জিততে পারবে আর্জেন্টিনা?
জর্ডানকে ৩-১ গোলে হারিয়ে গ্রুপ ‘জে’ শেষ করেছে আর্জেন্টিনা। এর আগে, আলজেরিয়াকে ৩-০ এবং অস্ট্রিয়াকে ২-০ গোলে হারিয়েছিল তারা। তিন ম্যাচে ৯ পয়েন্ট, ৮ গোল, গোল হজম মাত্র ১টি। পরিসংখ্যান বলছে, আর্জেন্টিনার গ্রুপ পর্ব ছিল প্রায় নিখুঁত।
কিন্তু ইতিহাস বলছে, আর্জেন্টিনা আগে কখনো গ্রুপে শতভাগ জয় নিয়ে বিশ্বকাপ জেতেনি। ১৯৭৮, ১৯৮৬ ও ২০২২, তিনটি শিরোপাজয়ী আসরেই গ্রুপ পর্বে অন্তত একবার পয়েন্ট হারিয়েছিল তারা।
১৯৭৮ সালে নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের পথে আর্জেন্টিনা প্রথম পর্বে ইতালির কাছে হেরেছিল। ১৯৮৬ সালে দিয়েগো ম্যারাডোনার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা দক্ষিণ কোরিয়া ও বুলগেরিয়াকে হারালেও ইতালির সঙ্গে ১-১ ড্র করেছিল। ২০২২ সালে কাতারে তো শুরুটাই হয়েছিল সৌদি আরবের কাছে ২-১ হারে। সেই ধাক্কা সামলে শেষ পর্যন্ত বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল মেসিরা।
তাই ২০২৬ সালে আর্জেন্টিনার সামনে নতুন এক সম্ভাবনা। যদি তারা এবার শিরোপা ধরে রাখতে পারে, তবে সেটি হবে আর্জেন্টিনার ইতিহাসে প্রথম বিশ্বকাপ জয়, যেখানে গ্রুপ পর্বের সব ম্যাচ জিতেছিল তারা।
বিশ্বকাপ ইতিহাসে অবশ্য এমন ঘটনা নতুন নয়। সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ ব্রাজিল। ১৯৭০ সালে পেলের ব্রাজিল গ্রুপ পর্বে চেকোস্লোভাকিয়া, ইংল্যান্ড ও রোমানিয়াকে হারিয়ে নকআউটে ওঠে। এরপর পেরু, উরুগুয়ে ও ইতালিকে হারিয়ে বিশ্বকাপ জেতে। সেই ব্রাজিল দলকে এখনও বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা দল বলা হয়।
২০০২ সালেও একই কাজ করে ব্রাজিল। গ্রুপে তুরস্ক, চীন ও কোস্টারিকাকে হারিয়ে শুরু। এরপর নকআউটে বেলজিয়াম, ইংল্যান্ড, আবার তুরস্ক এবং ফাইনালে জার্মানিকে হারায় রোনালদো, রিভালদো ও রোনালদিনহোদের দল। ২০০২ সালের ব্রাজিল শুধু গ্রুপ পর্বে নয়, পুরো টুর্নামেন্টের সাত ম্যাচই জিতেছিল। বিশ্বকাপের আধুনিক যুগে এটি সবচেয়ে নিখুঁত শিরোপাযাত্রাগুলোর একটি।
ফ্রান্সও ১৯৯৮ সালে গ্রুপে শতভাগ জয় নিয়ে বিশ্বকাপ জিতেছিল। ঘরের মাঠে দক্ষিণ আফ্রিকা, সৌদি আরব ও ডেনমার্ককে হারিয়ে গ্রুপসেরা হয় তারা। পরে ফাইনালে ব্রাজিলকে ৩-০ গোলে হারিয়ে প্রথমবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় জিনেদিন জিদানের ফ্রান্স।
অন্যদিকে জার্মানির গল্প আলাদা। চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা কখনোই শিরোপাজয়ী আসরে গ্রুপ পর্বের সব ম্যাচ জিতে আসেনি। ১৯৫৪ সালে বিশ্বকাপ জিতলেও গ্রুপ পর্বে হাঙ্গেরির কাছে ৮-৩ গোলে হেরেছিল পশ্চিম জার্মানি। ১৯৭৪ সালে ঘরের মাঠে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পথেও পূর্ব জার্মানির কাছে হার ছিল। ১৯৯০ সালে তারা গ্রুপে কলম্বিয়ার সঙ্গে ড্র করেছিল। ২০১৪ সালে ব্রাজিলে বিশ্বকাপ জেতার পথেও ঘানার সঙ্গে ২-২ ড্র ছিল জার্মানির।
ইতালির ক্ষেত্রেও গ্রুপে শতভাগ জয় শিরোপার নিয়মিত গল্প নয়। ১৯৮২ সালে তারা প্রথম গ্রুপ পর্বে তিন ম্যাচই ড্র করে পরে বিশ্বকাপ জিতেছিল। ২০০৬ সালে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পথেও গ্রুপে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ড্র ছিল। স্পেন ২০১০ সালে তো প্রথম ম্যাচেই সুইজারল্যান্ডের কাছে হেরে গিয়েও শেষ পর্যন্ত বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়।
এই ইতিহাস আর্জেন্টিনার জন্য দুই ধরনের বার্তা দেয়। একদিকে, গ্রুপে শতভাগ জয় বিশ্বকাপ জয়ের নিশ্চয়তা নয়। অন্যদিকে, এমন পথ ধরে শিরোপা জেতার নজিরও আছে, বিশেষ করে ব্রাজিল ও ফ্রান্সের ক্ষেত্রে।
আর্জেন্টিনার সামনে এখন শেষ ৩২-এ কেপ ভার্দে। অভিষেক বিশ্বকাপেই নকআউটে ওঠা দলটি স্পেন ও উরুগুয়ের মতো প্রতিপক্ষকে আটকে দিয়ে নিজেদের সামর্থ্য দেখিয়েছে। তাই গ্রুপের নিখুঁত রেকর্ড আর্জেন্টিনাকে আত্মবিশ্বাস দেবে, কিন্তু নিরাপত্তা দেবে না।
মেসির বয়স ৩৯, তবু তিনি গোল করছেন, রেকর্ড গড়ছেন, দলকে সামনে টানছেন। আর্জেন্টিনার স্কোয়াডও গভীরতা দেখিয়েছে। এখন তাদের সামনে শুধু শিরোপা ধরে রাখার লড়াই নয়, নিজেদের ইতিহাসও বদলানোর সুযোগ।
আগের তিন বিশ্বকাপ জয়ের কোনোটিতেই গ্রুপ পর্বে শতভাগ জয় ছিল না আর্জেন্টিনার। ২০২৬ সালে তাই আরেকটি নতুন ইতিহাসের হাতছানি মেসিদের সামনে।






