বাংলাদেশিদের জন্য পর্যটন ভিসা চালুর খবরে খুশি কলকাতার ব্যবসায়ীরা

দীর্ঘ ২২ মাস বন্ধ থাকার পর অবশেষে বাংলাদেশিদের জন্য পর্যটন ভিসা চালু করেছে ভারত। এ সিদ্ধান্তে কার্যত আনন্দ ছড়িয়ে পড়েছে বাংলাদেশ ও ভারত—দুই দেশের নাগরিকদের মাঝে। তবে দুই দেশের সাধারণ মানুষের চেয়েও এই খবরে সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছেন কলকাতার তথা পশ্চিমবঙ্গের ভারতীয় ব্যবসায়ীরা।
কলকাতার ‘মিনি বাংলাদেশ’ খ্যাত নিউমার্কেট এলাকায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে যেমন খুশির হাওয়া লক্ষ্য করা গেছে, ঠিক একইভাবে কলকাতা থেকে দূরে পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত এলাকার ব্যবসায়ীদের মধ্যেও দেখা গেছে উৎসবের আমেজ।
বাংলাদেশি পর্যটকদের অভাবে বিগত ২২ মাস ধরে ব্যবসায়িক খরায় ভুগছিলেন এখানকার ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, এই পরিস্থিতি কার্যত মহামারির সময়ের থেকেও ভয়াবহ এক লকডাউন পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল। পরে মেডিকেলসহ বেশকিছু ক্যাটাগরির ভিসা চালু হলেও, মূল ব্যবসার ৩০ শতাংশও নিয়মিত ছিল না। এমন অবস্থায় পেট্রাপোল, গেদে ও ফুলবাড়ির মতো সীমান্ত এলাকার ব্যবসায়ীরা দেনার দায়ে জর্জরিত হয়ে পড়েছিলেন।
কেউ কেউ কোনোমতে ব্যবসা টিকিয়ে রাখলেও অনেকে বাধ্য হয়ে ব্যবসা গুটিয়ে ফেলেন। তবে পর্যটন ভিসা পুনরায় চালুর খবরে সীমান্ত এলাকার এই ব্যবসায়ীদের মুখে আবারও হাসি ফুটেছে।
সীমান্তবর্তী এলাকার আবাসিক হোটেল, রেস্টুরেন্ট, মানি এক্সচেঞ্জ বা মুদ্রা বিনিময় কেন্দ্র এবং পরিবহন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ী ও কর্মচারীরা জানান, বাংলাদেশি পর্যটকদের অভাবে তারা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। প্রতিটি সীমান্তে শত শত ব্যবসায়ী এবং হাজার হাজার কর্মচারীর রুটি-রোজগার সম্পূর্ণ নির্ভর করে বাংলাদেশি পর্যটকদের যাতায়াতের ওপর। ভিসা চালু হওয়ার এই খবরে তারা এখন আর্থিক ক্ষতি কাটিয়ে আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর প্রহর গুনছেন।
এক সময় গেদে-দর্শনা সীমান্ত দিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে নিয়মিত ‘মৈত্রী ট্রেন’ চলাচল করত। কিন্তু দীর্ঘ প্রায় দুই বছর ধরে এই ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকায় সীমান্তে আগের মতো আর ব্যস্ততা নেই। বর্তমানে শুধু পাসপোর্টধারী সীমিত কিছু যাত্রী যাতায়াত করেন, যার পরিমাণ এতটাই কম যে এই সীমান্ত এলাকার সব ধরনের ব্যবসার অন্তত ৪০ শতাংশ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। আর বাকি যে ৬০ শতাংশ ব্যবসায়ী এখনও লড়াই করে টিকে আছেন, তাদের দাবি—স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ ব্যবসা তারা হারিয়ে ফেলেছেন।
গেদে সীমান্তের মুদ্রা বিনিময়কারী ব্যবসায়ী দীনবন্ধু হালদার বলেন, এই পর্যটন ভিসা অনেক আগে চালু হওয়া উচিত ছিল। এটি না হওয়াটা দুঃখজনক এবং এর পেছনে কাজ করেছে দুই দেশের রাজনীতি। বিশেষ করে বাংলাদেশে গণ-অভ্যুত্থানের পর সেখানকার রাজনৈতিক উৎপীড়ন এবং রাজনৈতিক নেতাদের ভারতবিদ্বেষী মন্তব্যের কারণে এটি বন্ধ ছিল। এতে ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি দুই দেশের সরকারও রাজস্ব হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ক্ষতির মুখে পড়া পেট্রাপোল সীমান্ত এলাকার শ্যামলী পরিবহনের ব্যবসায়ী প্রবোধ মজুমদার জানান, আগে তারা এই সীমান্ত থেকে প্রতিদিন তিনটি করে বাস চালাতেন। এখন যাত্রী সংকটে দিনে মাত্র একটি বাস চালাতে হচ্ছে, যা দিয়ে কলকাতা যাতায়াতের তেলের খরচও ওঠে না। শুধু ব্যবসা টিকিয়ে রাখার তাগিদে লোকসান দিয়ে বাস চালু রেখেছেন। ভিসা চালুর খবরে তারা এখন অত্যন্ত আনন্দিত। একই সীমান্তের সিএনজিচালক সুমন সরকার জানান, তাদের রুটি-রুজি সম্পূর্ণ বাংলাদেশিদের ওপর নির্ভরশীল। বিগত ২২ মাসে খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার তাগিদে অনেকে এই পেশা ছেড়ে অন্য কাজে চলে গেছেন। ভিসা চালু হলে তারা হয়তো আবার এই পেশায় ফিরে আসবেন এবং পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
পেট্রাপোল সীমান্তের ব্যবসায়িক সংগঠনের নেতা কার্তিক সাহা এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, এটি একটি বড় ইঙ্গিত যে দুই দেশের সম্পর্ক আবারও ভালো হতে চলেছে। ব্যবসায়ীরা যে আতঙ্ক আর আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছিলেন, এখন তার বদল ঘটবে।
তিনি আরও জানান, মন্দার কারণে এতদিন কেউ নতুন করে বিনিয়োগ করছিল না, এখন তারা নতুন করে ব্যবসায়িক পরিধি বাড়ানোর কথা ভাববেন। স্থানীয় অর্থনীতির চাকা ঘুরবে এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে লক্ষাধিক মানুষ উপকৃত হবে। বর্তমানে যেখানে দৈনিক যাত্রী যাতায়াত মাত্র ৫০০ থেকে ৫৫০ জন, ভিসা চালু হলে তা বেড়ে ৬ থেকে সাড়ে ৬ হাজারে পৌঁছাবে। মেডিকেল ভিসায় আসতে যারা আতঙ্ক বোধ করতেন, এখন তাদের সেই পরিস্থিতিরও বদল ঘটবে। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে যেসব পণ্যের আমদানি-রপ্তানি বন্ধ রয়েছে, সেগুলোও দ্রুত চালু হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন ভারতে আসা বৈধ পাসপোর্টধারী বাংলাদেশি নাগরিকরাও। তারা আনন্দ প্রকাশ করে বলেন, আমরা অনেক খুশি যে আবারও আগের মতো ভারতে আসতে পারব, ঘুরতে পারব। আশা করছি এই ভিসার মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক আরও অনেক সুন্দর ও দৃঢ় হবে।






