সরকারকে ফাঁকি দিয়ে সিনেসিস আইটির সরকারি সেবা  

সরকারকে ফাঁকি দিয়ে সিনেসিস আইটির সরকারি সেবা  
ছবি : এশিয়া পোস্ট গ্রাফিকস

নিয়ম ভঙ্গ করে অনুমোদনহীন অতিরিক্ত চ্যানেল ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ সেবা পরিচালনার দায়িত্বে থাকা তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান সিনেসিস আইটি লিমিটেডের বিরুদ্ধে। সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) চোখ ফাঁকি দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এ অনিয়ম চালিয়ে আসছে কল সেন্টার সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানটি। স্বাস্থ্য, ভূমি, পানি, বিদ্যুৎ ও পাসপোর্টসহ গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক সেবার একাধিক সরকারি কল সেন্টার পরিচালনায় এজেন্ট সংখ্যার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি কল চ্যানেল ব্যবহার করা হচ্ছে, যা সরাসরি কল সেন্টার নির্দেশিকার লঙ্ঘন। সরকারি সেবায় সিনেসিস আইটির সরকারকে ফাঁকি দেওয়ার এমন এমন গুরুতর অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে বিটিআরসির অভ্যন্তরীণ তদন্তে। 

Advertisement

গুরুতর প্রশাসনিক অসংগতি দেখছে বিটিআরসি

বিটিআরসির ৩০২তম কমিশন সভায় সম্প্রতি সিনেসিস আইটির বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ তোলা হয়। কল সেন্টার পরিচালনা নির্দেশিকা অনুযায়ী, এজেন্ট সংখ্যা ও চ্যানেল ব্যবহারের মধ্যে সিস্টেমভিত্তিক সামঞ্জস্য এবং কমিশনের পূর্বানুমোদন বাধ্যতামূলক। কিন্তু বিটিআরসির তদন্তে উঠে এসেছে, এসব বাধ্যবাধকতার ধার ধারছে না সিনেসিস আইটি। অনুমোদনের বাইরে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটি কল সক্ষমতা বাড়িয়ে সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করেছে, যা গুরুতর প্রশাসনিক অসংগতি।

বিটিআরসির কমিশন সভা সূত্র জানায়, কল সেন্টার সনদপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান সিনেসিস আইটি তাদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ৩০টি ইন্টারনেট প্রোটোকল টেলিফোন সার্ভিস প্রোভাইডার (আইপিটিএসপি) চ্যানেল সংযোগ ব্যবহারের জন্য কমিশনের কাছে আবেদন করে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির ক্লায়েন্টভিত্তিক এজেন্ট ও চ্যানেল সংখ্যা পর্যালোচনায় দেখা যায়, নিয়ম লঙ্ঘন করে তারা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্লায়েন্টকে অনুমোদনহীন চ্যানেলের মাধ্যমে কল সেন্টার সার্ভিস দিচ্ছে। এজেন্ট সংখ্যার সঙ্গেও নেই চ্যানেল সংখ্যার সামঞ্জস্য। 

যেভাবে অনিয়ম করেছে সিনেসিস 

কল সেন্টার কার্যক্রমে মাত্র ৩০টি আইপিটিএসপি চ্যানেল ব্যবহারের তথ্য বিটিআরসি দিয়েছে সিনেসিসকে। কিন্তু কমিশনের প্রযুক্তিগত যাচাইয়ে দেখা যায়, বাস্তবে ব্যবহৃত চ্যানেলের সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি। যার বড় অংশেরই কোনো অনুমোদন নেই। নথি অনুযায়ী, এটুআই-এর কল সেন্টারে ২৬ এজেন্টের বিপরীতে  ১ হাজার ৩৪৪টি চ্যানেল, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ১২৫ এজেন্টের জন্য ৩০০ চ্যানেল, ঢাকা ওয়াসার ১২ এজেন্টের বিপরীতে ৩০ চ্যানেল, নেসকোর ৮টির বিপরীতে ৩০, বিআইডব্লিওটিএর ৬টি এজেন্টের বিপরীতে ৩০টি চ্যানেল ব্যবহার করছে সিনেসিস। 
এ ছাড়া সিনেসিসের ভূমি ও পাসপোর্ট সেবার কলসেন্টারেও এজেন্ট ও চ্যানেল ব্যবহারের মধ্যে বড় অসামঞ্জস্য পাওয়া গেছে। এজেন্ট সংখ্যা সীমিত হলেও চ্যানেল ব্যবহারে ছিল অস্বাভাবিক বিস্তার, যা নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি ছাড়াই পরিচালিত হয়েছে। বিটিআরসি বলছে, সিনেসিসের পক্ষ থেকে ‘গিভ ডিরেক্টলি’ ক্লায়েন্টের জন্য ৩০টি চ্যানেলের জন্য আবেদন করা হয়। কিন্তু অন্য ক্লায়েন্টের জন্য যেসব চ্যানেলের মাধ্যমে কল সেন্টার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে সেগুলোর জন্য  কমিশনের অনুমোদন নেয়নি সিনেসিস। এ ছাড়া কল সেন্টার নির্দেশিকা অনুযায়ী, কলসেন্টারের সংখ্যাটি সিস্টেম সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া আবশ্যক।

অনিচ্ছাকৃত ভুল বলে দায় এড়ানোর চেষ্টা 

এসব অনিয়মের ব্যাখ্যা জানতে সিনেসিসকে নোটিশও দিয়েছে বিটিআরসি। জবাবে সিনেসিস আইটি জানায়, সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলো নিজ নিজ শর্টকোড ও চ্যানেল ব্যবহারের জন্য বিটিআরসি থেকে অনুমোদনপ্রাপ্ত। সেই অনুমোদনের ভিত্তিতেই তারা চুক্তিভিত্তিকভাবে কল সেন্টার পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ সেবা দিয়ে আসছে। তবে প্রতিষ্ঠানটি স্বীকার করে আইপিটিএসপি চ্যানেল ব্যবহারের বিষয়টি আলাদাভাবে বিটিআরসিকে তারা অবহিত করেনি, যেটাকে অনিচ্ছাকৃত প্রশাসনিক ভুল বলে দাবি করে এ জন্য তারা দুঃখ প্রকাশ ও নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং ভবিষ্যতে এমন ভুল না হওয়ার আশ্বাস দেয়।

তবে সিনেসিস আইটির ব্যাখ্যা সন্তুষ্ট হতে পারেনি বিটিআরসি। জবাব পর্যালোচনা করে কমিশন বলছে, প্রতিষ্ঠানটির প্রদত্ত জবাব যথাযথ নয়। কমিশনের মতে, পূর্বানুমোদন ছাড়া চ্যানেল ব্যবহার করা একটি গুরুতর প্রশাসনিক অসংগতি ও বিধিবহির্ভূত কার্যক্রম, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০০১-এর ধারা ৬৪ ও ৬৫ অনুযায়ী কমিশন প্রশাসনিক জরিমানা আরোপের ক্ষমতা রাখে। অপরাধের ধরন ও সম্ভাব্য ক্ষতি বিবেচনায় কমিশন সিদ্ধান্ত নেয়, সিনেসিস আইটির বিরুদ্ধে জরিমানা আরোপ করা হবে।

জরিমানার পরও বিটিআরসির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

কমিশন বলছে, অনুমোদন না নিয়েই ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগে বিরুদ্ধের প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। কল সেন্টার নির্দেশিকার গুরুত্বপূর্ণ ধারা লঙ্ঘনের দায়ে প্রতিষ্ঠানটির ওপর ৫০ হাজার টাকা জরিমানা আরোপ করা হয়েছে। বিটিআরসির ইঞ্জিনিয়ারিং ও অপারেশন বিভাগ, লিগ্যাল অ্যান্ড লাইসেন্সিং বিভাগ এবং অর্থ, হিসাব ও রাজস্ব বিভাগ এই প্রশাসনিক জরিমানার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে বলে এতে জানানো হয়েছে।

নাগরিকদের জরুরি সেবা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত কল সেন্টারের নিয়ম ভাঙা ও অনুমোদনহীন কার্যক্রম শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম নয়, বরং সেবা নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতার জন্যও বড় ঝুঁকি। অনুমোদন ছাড়াই কল চ্যানেল বাড়ানো, এজেন্ট সংখ্যার সঙ্গে অসামঞ্জস্য রেখে সরকারি কল সেন্টার পরিচালনা এবং নির্দেশিকা লঙ্ঘন—এসব অনিয়মের অভিযোগে সিনেসিসের বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত বিটিআরসি ব্যবস্থা নিলেও প্রশ্ন উঠেছে, অনুমোদন ছাড়া অতিরিক্ত কল চ্যানেল ব্যবহারের বিষয়টি এতদিন কীভাবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজর এড়াল। নিয়ন্ত্রক সংস্থার চোখ ফাঁকি দিয়ে অনিয়মের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সেবা পরিচালনার দায়িত্বে থাকা একটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই জরিমানার অঙ্ক যথেষ্ট কি না?

ঘটনা স্বীকার করছে না সিনেসিস

নিয়ম ভঙ্গ এবং শোকজের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযোগ অস্বীকার করে সিনেসিস আইটির এমডি ও কো-ফাউন্ডার সোহরাব চৌধুরী এশিয়া পোস্টকে বলেন, এ রকম হওয়ার কথা না। আপনারা কোথা থেকে পেয়েছেন এসব রিপোর্ট? আমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকার কথা না। যদি কিছু পেয়ে থাকেন তাহলে আমাদের কাছে পাঠান। 

সিনেসিস আইটির এমডি অস্বীকার করলেও অনিয়মের কারণে তাদের বিরুদ্ধে বিটিআরসির ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্তের নথি এশিয়া পোস্টের কাছে রয়েছে। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিটিআরসির লিগ্যাল অ্যান্ড লাইসেন্সিং বিভাগের পরিচালক তারেক হাসান সিদ্দিকী বলেন, শোকজ নোটিশ যে বিভাগ থেকে দিয়েছে, তারা ভালো বলতে পারবে।