৭ নথি জাল করে সাড়ে ৮ কোটি টাকা কর ফাঁকি দিয়েছে মেঘনা ক্যাবলস

জালিয়াতির মাধ্যমে ৮ কোটি ৬০ লাখ টাকা কর ফাঁকি দিয়েছে মেঘনা স্টার ক্যাবলস অ্যান্ড ইলেকট্রিক এ্যাপলায়েন্স। ৭টি নথিতে স্বাক্ষর জাল করে এবং ভুয়া তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা কাগজপত্র দিয়ে কর ফাঁকির ঘটনা ঘটিয়েছে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী আল মোস্তফা গ্রুপের সহযোগী এ প্রতিষ্ঠানটি। কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনের (ঢাকা পূর্ব) তদন্তে এ জালিয়াতির প্রমাণ মিলেছে।
এশিয়া পোস্টের হাতে আসা কর নথি ও অভ্যন্তরীণ চিঠিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, মেঘনা ক্যাবলসের কাছ থেকে নিয়মিত পণ্য (ক্যাবল, কন্ডাক্টর, ওয়্যার ইত্যাদি) কেনে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড। এ কেনাকাটায় প্রতি চালানের বিপরীতে ১৫ শতাংশ হারে মূল্য সংযোজন কর (মূসক) আরোপ করা হয়। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে পল্লী বিদ্যুতের কাছে পণ্য বিক্রির পর ৭ ধাপে কর ফাঁকি দেয় প্রতিষ্ঠানটি। কর ফাঁকি দিতে নারায়ণগঞ্জের মোগড়াপাড়া সার্কেলের তৎকালীন রাজস্ব কর্মকর্তার স্বাক্ষর জাল এবং তথ্যও গোপন করে মেঘনা ক্যাবলস।
২০২৫ সালের এপ্রিলে মেঘনা ক্যাবলসের কর ফাঁকির অভিযোগ তদন্তে ৫ সদস্যের যাচাই কমিটি গঠন করে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশন। কমিটির তদন্তে অভিযোগের সত্যতা মেলে। যাচাই কমিটির সুপারিশে মেঘনা ক্যাবলসকে এ বিষয়ে কারণে দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হলে প্রতিষ্ঠানটি তাদের সব নথিপত্র সঠিক বলে দাবি করে। পরবর্তীতে ভ্যাট কমিশনের মোগড়াপাড়া সার্কেলের তৎকালীন রাজস্ব কর্মকর্তা এ এস এম মনিরুল ইসলামের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে লিখিত প্রতিবেদনে তিনিও কর ফাঁকির সত্যতা নিশ্চিত করেন।
কর ফাঁকি যেভাবে
নথি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ১৯ ও ২০ নভেম্বর পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের ইস্যু করা চিঠিতে পণ্যের বিক্রয়মূল্য ৮ কোটি ৪১ লাখ ৮৬ হাজার ৪১৭ টাকা ধরা হয়। এ চালানে ১৫ শতাংশ হিসেবে মূসকের পরিমাণ ১ কোটি ২৬ লাখ ২৭ হাজার ৯৬২ টাকা, যা ওই মাসের মধ্যেই দাখিলপত্রে (মূসক-৯.১) সমন্বয় করার কথা। কিন্তু মেঘনা ক্যাবলস নভেম্বর মাসে দাখিল করা কাগজপত্রে মোট বিক্রির পরিমাণ দেখায় ১ কোটি ৮৪ লাখ ৫৭ হাজার ১১৭ টাকা। এ টাকার ওপর ১৫ শতাংশ হারে মূসক দেখানো হয় ২৭ লাখ ৬৮ হাজার ৫৬৭ টাকা। একইভাবে ডিসেম্বর মাসের দাখিলপত্রে (মূসক-৯.১) বিক্রয়মূল্য দেখানো হয় ১ কোটি ১৭ লাখ ১৯ হাজার ১২১ টাকা। এ হিসাবে ১৫ শতাংশ হিসেবে মূসক দাঁড়ায় ১৭ লাখ ৫৭ হাজার ৮৬৮ টাকা। দুই মাসে ভুল তথ্য দিয়ে আগের ১ কোটি ২৬ লাখ ২৭ হাজার ৯৬২ টাকার কর সমন্বয় করেনি মেঘনা ক্যাবলস।
এর আগে ২০২৩ সালের ২, ৩ ও ৪ সেপ্টেম্বরের ১০টি চালানে পল্লী বিদ্যুতের ইস্যুকৃত বিক্রয়মূল্য ধরা হয় ৭ কোটি ৮৪ লাখ ৭৩ হাজার ২১৬ টাকা। এতে ১৫ শতাংশ হারে মূসক হয় ১ কোটি ১৭ লাখ ৭০ হাজার ৯৮২ টাকা। এ টাকা ওই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে সমন্বয় করার কথা। কিন্তু মেঘনা ক্যাবলসের সেপ্টেম্বরের দাখিলপত্রে বিক্রয়মূল্য দেখানো হয় ৩ কোটি ৫০ লাখ ৭৩ হাজার ৬৬৬ টাকা এবং মূসকের পরিমাণ দেখানো হয় ৫২ লাখ ৬১ হাজার ৫০ টাকা। এই ধাপেও প্রতিষ্ঠানটি সরকারকে কর ফাঁকি দিয়েছে।
২০২৩-২৪ সালে একই পদ্ধতিতে আরও পাঁচবার মেঘনা ক্যাবলস কর ফাঁকি দিয়েছে বলে প্রমাণ পেয়েছে যাচাই কমিটি। মোগড়াপাড়া সার্কেলের ০৩/২০২৪/১১৩, ২০২৪/১৯৭, ২০২৪/১৬৩, ২০২৩/১৪২ ও ২০২৩/১১৯নং নথিতে যথাক্রমে ১ কোটি ৬ লাখ ৪৮ হাজার ৫৬৭, ১ কোটি ৭৩ লাখ ৬৫ হাজার ৫৭৮, ১ কোটি ২১ লাখ ২৩ হাজার ১৪০, ৯৫ লাখ ১৫ হাজার ২০১ এবং ১ কোটি ১৯ লাখ ৯৯ হাজার ২৭৮ টাকা কর ফাঁকি দিয়েছে মেঘনা। সব মিলিয়ে এই পাঁচবারে ফাঁকির পরিমাণ ৬ কোটি ১৬ লাখ ৪৬ হাজার ৭৬৫ টাকা।
মামলার পর দায় স্বীকার করেছে মেঘনা
কর ফাঁকির অভিযোগে কারণ দর্শানোর নোটিশে উপযুক্ত জবাব না পেয়ে মেঘনা স্টার ক্যাবলসের নামে দুটি মামলা দায়ের করা হয়। সম্প্রতি এ মামলার রায় ঘোষণা হয়েছে। মামলার প্রতিবেদন, জারিকৃত কারণ দর্শানোর নোটিশ, নোটিশের জবাব এবং শুনানির বক্তব্য পর্যালোচনা করে মেঘনা ক্যাবলসের কর ফাঁকির বিষয়টি প্রমাণ হয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
রায়ে বলা হয়েছে, মেঘনা ক্যাবলস মনোনীত প্রতিনিধি শুনানিতে রাজস্ব ফাঁকির বিষয়টি স্বীকার করে ইতোমধ্যে ২ কোটি টাকা পরিশোধ করেছেন এবং অবশিষ্ট রাজস্ব ১২ কিস্তিতে পরিশোধের আবেদন দাখিল করায় মূসক ফাঁকির বিষয়টি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত ও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
মামলার রায়ে প্রতিষ্ঠানটিকে মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন-২০১২ এবং মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক বিধিমালা-২০১৬ এর একাধিক বিধি লঙ্ঘনের দায়ে ফাঁকিকৃত করের সমপরিমাণ টাকা জরিমানাও করা হয়।
এ বিষয়ে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনের (ঢাকা পূর্ব) একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এশিয়া পোস্টকে বলেন, অনেক দিন ধরে মেঘনা ক্যাবলসের ফাইলটি প্রক্রিয়াধীন ছিল। তাদের প্রথমে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। পরে মামলা হয়েছে। মামলার রায়ও হয়েছে। তাদের ফাইলটি সংশ্লিষ্ট সার্কেলে পাঠানো হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে মেঘনা স্টার ক্যাবলস ও আল মোস্তফা গ্রুপের সঙ্গে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। গত রোববার (৮ মার্চ) দুপুরে গুলশানের উদয় টাওয়ারে প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়ে গিয়েও কার সঙ্গে কথা বলা যায়নি।
মেঘনা ক্যাবলসের ওয়েবসাইটে উল্লেখিত দেওয়া নম্বরে কয়েক দিন টানা কল দেওয়ার পর মঙ্গলবার (১০ মার্চ) সেটি রিসিভ করে সেলিম নামে একজন নিজেকে প্রতিষ্ঠানটির জিএম হিসেবে পরিচয় দেন। তিনি অভিযোগের বিষয়ে এশিয়া পোস্টকে বলেন, কাস্টমসের অফিসারদের সবার সঙ্গে তো সম্পর্ক ভালো থাকে না, তাই এ রকম অভিযোগ থাকেই। কর ফাঁকির কোনো বিষয় নেই। আমাদেরকে শোকজ নোটিশ দেওয়া হয়েছিল আমরা জবাব দিয়েছি। মামলার রায়ের বিষয়ে এখনও কিছু পাইনি।





