২১ জুলাই ২০২৪: কোটা নিয়ে আপিল বিভাগের রায়, কারফিউয়ের মধ্যে আন্দোলন তুঙ্গে

জুলাই আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিন ২১ জুলাই। এদিন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি সংস্কার করে মেধার ভিত্তিতে ৯৩ শতাংশ নিয়োগের রায় দেন। তবে কারফিউ ও ইন্টারনেট বন্ধ থাকার মধ্যেও রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সংঘর্ষ অব্যাহত থাকে। একই দিন তুলে নিয়ে যাওয়ার পর পূর্বাচল এলাকায় আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামকে পাওয়া যায়।
একদিকে ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন দেশ, অন্যদিকে কারফিউ। কয়েকদিনের সহিংসতায় তখন পুরো দেশ ছিল আতঙ্কগ্রস্ত। বিভিন্ন এলাকায় ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন, বারুদের গন্ধ আর স্বজনহারাদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সরকার কোটা বাতিলসংক্রান্ত রিটের শুনানি এগিয়ে আনে। ৭ আগস্টের পরিবর্তে ২১ জুলাই শুনানির দিন নির্ধারণ করা হয়।
পুরো দেশের নজর ছিল সর্বোচ্চ আদালতের দিকে। কড়া নিরাপত্তার মধ্যে শুনানি শুরু হয়। দীর্ঘ শুনানি শেষে সরকারি চাকরিতে কোটা পুনর্বহাল সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায় সামগ্রিকভাবে বাতিল করেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। আদালত জানান, মোট ৭ শতাংশ কোটা থাকবে এবং ৯৩ শতাংশ নিয়োগ হবে মেধার ভিত্তিতে।
রায়ে আরও বলা হয়, সরকার প্রয়োজন ও সার্বিক বিবেচনায় নির্ধারিত কোটা বাতিল, সংশোধন বা সংস্কার করতে পারবে।
একদিকে আদালতের রায়, অন্যদিকে রাজপথে চলছিল সংঘাত। বিএনপি, জামায়াতসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে গ্রেফতার ও মামলার কার্যক্রম চলতে থাকে। একই সময়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপরও অভিযান অব্যাহত ছিল।
এদিন ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন স্থানে মোট ১৯ জন নিহত হন। কোটা নিয়ে আদালতের রায়ের পর আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রীরা বলেন, শিক্ষার্থীদের দাবি শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান হয়েছে। এবার সরকার সন্ত্রাসী ও জঙ্গিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, কোটা বিরোধী আন্দোলনকে জামায়াত, বিএনপি, ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের একটি কুচক্রী মহল ধ্বংসাত্মক পথে পরিচালিত করছে।
আর সরকার নিজেকে রক্ষায় নাশকতার দায় বিএনপির উপর চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, নিজেদের দায় আড়াল করতে সরকার গণমাধ্যম ব্যবহার করে বিরোধী দলগুলোর ওপর দোষ চাপানোর চেষ্টা করছে।
এদিকে ইন্টারনেট বন্ধ থাকলেও ক্ষুদে বার্তার মাধ্যমে সাংবাদিকদের কাছে বিবৃতি পাঠান আন্দোলনের ৫৬ জন সমন্বয়ক। সেখানে তিন শতাধিক ছাত্র-জনতাকে হত্যার অভিযোগ তুলে তারা বলেন, শুধু আদালতের রায়ের মাধ্যমে সরকার হত্যার দায় এড়াতে পারে না।
সমন্বয়কদের সামনে রেখে আন্দোলন আরও গতিশীল করার পরিকল্পনা নেয় ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির বলেন, বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারকে জানানো হতো কর্মসূচি কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। পরে দলের সঙ্গে আলোচনা করা হতো। বিশেষ করে বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে বিষয়গুলো জানানো হলে তিনি দলের সহযোগী সংগঠন ও মূল দলের সঙ্গে সমন্বয় করে কর্মসূচি বাস্তবায়নের নির্দেশনা দিতেন। এভাবেই সাংগঠনিক কাঠামোর মাধ্যমে আন্দোলনকে আরও ত্বরান্বিত করা হতো।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সাবেক সমন্বয়ক ও এনসিপি নেতা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, ১৬ জুলাই থেকে হত্যাকাণ্ড শুরু হওয়ার পর আন্দোলনকে শুধু কোটা সংস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা আর সম্ভব ছিল না। সে সময় থেকেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট কয়েকজন মন্ত্রীর পদত্যাগ, সরকারের প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়াসহ আরও কয়েকটি দাবি সামনে আনা হয়। একই সঙ্গে কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
এদিন ভোরে ঢাকার পূর্বাচল এলাকায় আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামকে পাওয়া যায়। পরে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, তাকে চোখ বেঁধে একটি অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং জ্ঞান হারানোর আগ পর্যন্ত তার ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। তিনি বলেন, আমার ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন শুরু করা হয়। একপর্যায়ে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি।
এর আগে বিকেলে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে দেশের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিদেশি কূটনীতিকরা।
একদিকে আদালতের রায়ে ৯৩ শতাংশ মেধাভিত্তিক নিয়োগের ঘোষণা, অন্যদিকে রাজপথে ছাত্র-জনতার রক্তঝরা আন্দোলন। ফলে আন্দোলনকারীদের কাছে আদালতের রায়ের চেয়ে রাজপথের লড়াইটাই বেশি গুরুত্ব পায়। সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় বহু মানুষের প্রাণের বিনিময়ে সামনে আসে গণতান্ত্রিক অধিকার ও বাকস্বাধীনতার দাবির নতুন অধ্যায়।
.png)






