Advertisement
‘কারাগারে অনুসন্ধান’ প্রকাশনা উৎসব

শুধু শাস্তি দিয়ে অপরাধ নির্মূল সম্ভব নয়, প্রয়োজন সমাজব্যবস্থার পরিবর্তন: সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

এশিয়া পোস্ট প্রতিবেদক
শুধু শাস্তি দিয়ে অপরাধ নির্মূল সম্ভব নয়, প্রয়োজন সমাজব্যবস্থার পরিবর্তন: সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে গবেষণা গ্রন্থ ‘কারাগারে অনুসন্ধান’-এর প্রকাশনা উৎসবে অতিথিরা। ছবি: এশিয়া পোস্ট

শুধু শাস্তির মাধ্যমে অপরাধ নির্মূল করা সম্ভব নয়; বরং মানুষকে যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা অপরাধের দিকে ঠেলে দেয়, সেই পরিস্থিতির পরিবর্তনই সবচেয়ে জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।

তিনি বলেন, একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত চেহারা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে তার কারাগারে। ঔপনিবেশিক আমল থেকে আজ পর্যন্ত সময় বদলালেও কারাগারের কাঠামো ও মানসিকতার মৌলিক পরিবর্তন হয়নি।

বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) বিকেলে রাজধানীর বাংলামোটরের বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বাতিঘরে গবেষণা গ্রন্থ ‘কারাগারে অনুসন্ধান’-এর প্রকাশনা উৎসবে পাঠানো এক ভিডিও বার্তায় সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ‘কারাগারে অনুসন্ধান গ্রন্থ সুহৃদ সমাবেশ, ঢাকা’। সভাপতিত্ব করেন জাপানের এহিম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. শেখ মোহাম্মদ ফজলে আকবর। অনুষ্ঠানের শুরুতে তাহসীনা মুস্তারী অবন্তী ‘মুক্তির মন্দির সোপানতলে কত প্রাণ হলো বলিদান’ গান পরিবেশন করেন এবং সমাপ্তিতে গেয়ে শোনান ‘আমার দেশের মাটি’।

গবেষক মো. খোসবর আলীর লেখা প্রায় ৬০০ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে পুণ্ড্র প্রকাশন। দীর্ঘ ১৪ বছরের গবেষণার ভিত্তিতে রচিত বইটিতে ১৭৬৫ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ভারতীয় উপমহাদেশের কারা ব্যবস্থার ইতিহাস, ঔপনিবেশিক দণ্ডনীতি, কারা প্রশাসন, বন্দিজীবন, বন্দী শ্রম, বিচারিক নিয়ন্ত্রণ, রাষ্ট্রীয় সহিংসতা এবং আন্দামানসহ বিভিন্ন দণ্ড-উপনিবেশের বিস্তৃত তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরা হয়েছে।

শারীরিক অসুস্থতার কারণে অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে না পারলেও ভিডিও বার্তায় সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বইটিকে বাংলাদেশের কারাগার ব্যবস্থা ও এর ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার বোঝার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রকাঠামোর অন্যতম শক্তিশালী স্তম্ভ হিসেবে কারাগার ব্যবস্থা এখনো বহুলাংশে টিকে রয়েছে। বইটি দেখিয়েছে, কীভাবে কারাগার একটি বিচ্ছিন্ন ও অস্বচ্ছ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে, যেখানে দুর্নীতি, নির্যাতন এবং অর্থের বিনিময়ে সুযোগ-সুবিধা কেনাবেচার মতো ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে চলছে।

তিনি বলেন, কারাগারের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো দুর্নীতি। সেখানে অর্থের বিনিময়ে বিশেষ সুবিধা পাওয়া যায়। একই সঙ্গে সাধারণ বন্দিদের প্রতি অমানবিক আচরণও অব্যাহত রয়েছে, যদিও রাজনৈতিক বন্দিদের তুলনায় সাধারণ বন্দিদের দুর্ভোগ প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়।

বইটির নারী বন্দিবিষয়ক অধ্যায়ের প্রসঙ্গ টেনে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, নারী বন্দিদের ওপর লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, বৈষম্য ও আধিপত্যের যে চিত্র বইটিতে উঠে এসেছে, তা উদ্বেগজনক। তিনি ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, মানুষ জন্মগতভাবে অপরাধী হয় না; পরিস্থিতিই তাকে অপরাধী করে তোলে। তাই শুধু শাস্তি দিয়ে অপরাধ নির্মূল সম্ভব নয়; বরং অপরাধ সৃষ্টিকারী সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের সমাধান করতে হবে।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, বইটি লৌহকপাটের আড়ালের এমন অনেক বাস্তবতা তুলে ধরেছে, যা সাধারণ মানুষের কাছে অজানা। জেলা প্রশাসক ও ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় বিভিন্ন কারাগার পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, কারাগারের প্রকৃত সংস্কার সময়ের দাবি। তিনি জানান, একসময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জার্মান উন্নয়ন সংস্থা জিআইজেডের সহায়তায় কারাগার সংস্কারের একটি উদ্যোগ নিয়েছিল এবং সেই প্রক্রিয়ায় তাঁরও কাজ করার সুযোগ হয়েছিল।

প্রধান আলোচক দৈনিক দেশ রূপান্তরের সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি বলেন, রাষ্ট্রের যে গবেষণামূলক কাজটি করার কথা ছিল, সেটি একজন গবেষক ও কারা কর্মকর্তা হিসেবে মো. খোসবর আলী সম্পন্ন করেছেন। তিনি বলেন, আগামী দিনে কারাগার নিয়ে গবেষণা, সাংবাদিকতা কিংবা নীতিনির্ধারণ—সব ক্ষেত্রেই এই বই একটি আকর গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হবে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেশে সংস্কার প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি আলোচিত। সরকার যদি সত্যিকার অর্থে কারা সংস্কার করতে চায়, তবে ‘কারাগারে অনুসন্ধান’ একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক গ্রন্থ হতে পারে।

অনুষ্ঠানে আলোচকরা নেদারল্যান্ডসের উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, পুনর্বাসনমুখী বিচারব্যবস্থা এবং অপরাধের হার কমে যাওয়ায় গত দুই দশকে দেশটিতে ২০টিরও বেশি কারাগার বন্ধ বা অন্য কাজে রূপান্তর করা হয়েছে। কিছু কারাগার ভবন আশ্রয়কেন্দ্র, হোটেল কিংবা অফিস হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। অথচ বাংলাদেশে এখনো অধিকাংশ কারাগারে ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি বন্দি রাখা হয় এবং দুর্নীতি ও নিপীড়নের সংস্কৃতি বিদ্যমান।

বইটির লেখক মো. খোসবর আলী বলেন, সাবঅল্টার্ন স্টাডিজে ঔপনিবেশিক আমলের কারাগারবিষয়ক একটি প্রবন্ধ তাঁকে এই গবেষণায় অনুপ্রাণিত করেছিল। এরপর তিনি দেশি-বিদেশি বই, গবেষণাপত্র, সরকারি নথি, জার্নাল এবং বিভিন্ন দলিল সংগ্রহ করে টানা প্রায় ১৪ বছর গবেষণা চালিয়ে যান।

তিনি বলেন, এই গ্রন্থে প্রাক্-ঔপনিবেশিক ভারত থেকে শুরু করে ঔপনিবেশিক কারাব্যবস্থার বিকাশ, দণ্ডনীতি, কারা প্রশাসন, বন্দিজীবন, বন্দী শ্রম, বিচারিক নিয়ন্ত্রণ, রাষ্ট্রীয় সহিংসতা এবং আন্দামানসহ বিভিন্ন দণ্ড-উপনিবেশের ইতিহাস গবেষণার আলোকে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। তাঁর লক্ষ্য ছিল কারাগারকে শুধু শাস্তি প্রদানের প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্র, সমাজ ও ইতিহাসকে বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ জানালা হিসেবে পাঠকের সামনে উপস্থাপন করা। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে বাংলাদেশের কারাগারও প্রকৃত অর্থে সংশোধনাগারে রূপান্তরিত হবে।

সভাপতির বক্তব্যে ড. শেখ মোহাম্মদ ফজলে আকবর বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে জাপানের কারাগারে ভয়ংকর নির্যাতন চললেও যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে দেশটি সেই নীতি থেকে সরে এসে কারাগারকে সত্যিকারের সংশোধনাগারে রূপান্তরের উদ্যোগ নেয়। বাংলাদেশের কারা ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও সেই ধরনের মানবিক সংস্কার প্রয়োজন।

লেখক ও উন্নয়নকর্মী নিশাত সুলতানা পূরবী বইটির নারী বন্দিবিষয়ক অধ্যায় বিশ্লেষণ করে ঔপনিবেশিক আমলে নারীদের প্রতি বৈষম্য ও অবিচারের বিষয়টি তুলে ধরেন। সাংবাদিক আবুল কালাম মুহাম্মদ আজাদ বইটির প্রকাশনার প্রেক্ষাপট ও গবেষণা-যাত্রা সম্পর্কে বক্তব্য দেন।

সিরাজুল ইসলাম আবেদের সঞ্চালনায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, ‘কারাগারে অনুসন্ধান’ শুধু একটি গবেষণা গ্রন্থ নয়; এটি ঔপনিবেশিক ভারতের কারা ব্যবস্থার ইতিহাস নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিল। কারাগার সংস্কার, গবেষণা, সাংবাদিকতা এবং সাহিত্যচর্চা—সব ক্ষেত্রেই বইটি দীর্ঘদিন মূল্যবান তথ্যসূত্র হিসেবে বিবেচিত হবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেন।