এইচআরএসএসের প্রতিবেদন/জুনে রাজনৈতিক সহিংসতা ও মবে নিহত ৪০, আহত ৩৪৬

দেশে দলীয় কোন্দল, আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ, হামলা ও চাঁদাবাজি ও মবে নিহত হয়েছেন বহু মানুষ। চলতি বছরের জুনেও রাজনৈতিক সহিংসতা ও মবে ৪০ জন নিহত হন। যার মধ্যে দলীয় কোন্দল ও অন্তঃকোন্দলে নিহত হয়েছেন ৯ জন এবং বিভিন্ন দলের নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষ আহত হয়েছেন ৩৪৬ জন।
একই সময়ে ৩৫২ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং ৩৯টি ঘটনায় ৪৭ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) প্রকাশিত জুন-২০২৬ মাসের মানবাধিকার পরিস্থিতি বিষয়ক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
এইচআরএসএস দেশের ১৬টি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ, সংগৃহীত তথ্য এবং ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এ প্রতিবেদন তৈরি করে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত জুনে ৫৮টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৯ জন নিহত এবং ৩৪৬ জন আহত হয়েছেন, যা মে মাসের তুলনায় বেশি। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, বিএনপি, এনসিপি, জামায়াতসহ নানা দলের মধ্যে বিরোধে নিহত হওয়া অধিকাংশ ঘটনা দলীয় কোন্দল, আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ, হামলা ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে ঘটেছে। এ ছাড়া রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের ওপর দুষ্কৃতকারীদের হামলার অন্তত ১২টি ঘটনায় ৯ জন নিহত এবং ২২ জন আহত হয়েছেন।
জুন মাসে বিভিন্ন দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ২২টির বেশি মামলা হয়েছে উল্লেখ করে বলা হয়, এসব মামলায় ৬২৭ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও প্রায় ১ হাজার ২৬২ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। একই সময়ে রাজনৈতিক ও অন্যান্য মিলে ২৫৭টি ঘটনায় ৪ হাজার ৭৭৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে আওয়ামী লীগের অন্তত ১ হাজার ৫৫৯ জন, বিএনপির ৩৫ জন, জামায়াতে ইসলামীর ২ জন রয়েছে।
এইচআরএসএস বলছে, জুনে মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ৬৩টি ঘটনায় ৩১ জন নিহত এবং ৬৯ জন আহত হয়েছেন। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলা ও মব সহিংসতার ২৯টি ঘটনায় ৬৬ জন সদস্য আহত হয়েছেন।
সাংবাদিকদের পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এইচআরএসএস। সংস্থাটি প্রতিবেদনে জানিয়েছে, জুনে ৩৯টি ঘটনায় ৪৭ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ২৮ জন আহত, ৫ জন লাঞ্ছিত, ৯ জন হুমকির মুখে পড়েছেন এবং ৫ জনকে আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া ৭টি মামলায় ১২ জন সাংবাদিককে আসামি করা হয়েছে।
সভা সমাবেশ ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে জুনে অন্তত ১১টি ঘটনায় ১১ জনকে আটক এবং ৭টি মামলা করার তথ্য তুলে ধরা হয় প্রতিবেদনে।
অন্যদিকে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫ এর বিভিন্ন ধারার অধীনে পৃথক ৪টি মামলায় ৯ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া এসব ঘটনায় ৪ জনকে আটক করা হয়েছে।
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, হেফাজতে মৃত্যু এবং কারাগারে মৃত্যুর বিষয়েও উদ্বেগ জানানো হয়েছে। জুন মাসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ, হেফাজত ও নির্যাতনে ৩ জন নিহত হয়েছেন। গ্রেপ্তার এড়াতে পালানোর সময় ৪ জনের মৃত্যু এবং কারাগারে ৭ জনের মৃত্যুর তথ্য প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় জুন মাসে ১২টি হামলায় ৭ জন আহত হয়েছেন। একই সঙ্গে ১২টি মন্দির, ১১টি প্রতিমা ও ৭টি বসতবাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।
নারী ও শিশু নির্যাতনের চিত্রও উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। জুন মাসে ৩৫২ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১০৬ জন ধর্ষণের শিকার, ১৯ জন গণধর্ষণের শিকার এবং ধর্ষণের পর ২ কন্যাশিশুকে হত্যা করা হয়েছে। ২৯১ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে, যার মধ্যে ৫৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।
জুনে শ্রমিক নির্যাতনের ৫৫টি ঘটনায় ১১ জন নিহত এবং ১৮৪ জন আহত হয়েছেন। কর্মক্ষেত্রের দুর্ঘটনায় আরও ৩৯ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।
প্রতিবেদনে সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ৫টি ঘটনায় ২ জন নিহত, ২ জন আহত, ৪ জন গুলিবিদ্ধ এবং বিএসএফ একজনকে আটক করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে স্থলমাইন বিস্ফোরণে ৩ জন নিহত এবং ১২ জনকে আরাকান আর্মি আটক করেছে।
এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, রাজনৈতিক সহিংসতা, মব সহিংসতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, সাংবাদিক নির্যাতন, নারী ও শিশু নির্যাতন, সীমান্তে সহিংসতা এবং শ্রমিক নির্যাতনের ধারাবাহিকতা দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
সরকারের প্রতি মানবাধিকার রক্ষায় আরও জবাবদিহিমূলক ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানোর পাশাপাশি সব নাগরিক, গণমাধ্যমকর্মী, নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনের প্রতি এইচআরএসএসের পক্ষ থেকে অধিক সোচ্চার ও সক্রিয় ভূমিকা পালনের অনুরোধ জানান তিনি।




