Advertisement

সিস্টেম লসের ফাঁদে দিনে ১৪ কোটি টাকার গ্যাস চুরি

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
সিস্টেম লসের ফাঁদে দিনে ১৪ কোটি টাকার গ্যাস চুরি
গ্যাসের সংকট চরমে। ছবি: সংগৃহীত

তীব্র গ্যাসসংকটে উৎপাদন ব্যহত হচ্ছে শিল্প-কলকারখানায়। বিদ্যুৎ উৎপাদনে পাওয়া যাচ্ছে না কাঙ্ক্ষিত গ্যাস। এদিকে আবাসিক গ্রাহকদের বাসাবাড়িতেও পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকায় ব্যাহত হচ্ছে রান্না-বান্না। গ্রাহক পর্যায়ে চরম অস্বস্তি দেখা দিয়েছে। অথচ এমন কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে প্রতিদিনই সিস্টেম লসের নামে প্রায় ২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস হিসেবের বাইরে চলে যাচ্ছে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ১৪ কোটি টাকা। বাৎসরিক হিসেবে এই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫ হাজার ১১০ কোটি টাকা। অনুমোদিত কারিগরি ক্ষতির বাইরে এই পুরো অংশই মূলত গ্যাস চুরি, অবৈধ সংযোগ ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতার ফল বলছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।

অন্যদিকে প্রতিবছর এই বিপুল অপচয়ের বোঝা সামলাতে হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে সরকারকে। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত আট বছরে গ্যাস খাতে সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ ৫১ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকা দাঁড়িয়েছে। শুধু চলতি অর্থবছরেই এলএনজি আমদানিতে ভর্তুকির পরিমাণ বেড়ে পৌঁছেছে প্রায় ১৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকায়। আবাসিকে প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে গ্যাসের সংযোগ।

বৈধ সংযোগ না পেয়ে অবৈধভাবে গ্যাস ব্যবহার করছেন এক শ্রেণির গ্রাহক। শুধু আবাসিক নয়, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও শিল্পকারখানার অনেক সংযোগও চুরি করা গ্যাসে চলছে। বছরজুড়ে বিপুলসংখ্যক অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হলেও এই প্রবণতা কমছে না। অন্যান্য বিতরণ কম্পানির তুলনায় তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির বিতরণ এলাকায় গ্যাস চুরির হার সবচেয়ে বেশি। প্রতি মাসেই হাজার হাজার অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে তিতাসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

তবে অভিযান শেষে অল্প সময়ের মধ্যেই আবার সংযোগ পুনঃস্থাপন করে অসাধু চক্র। এ চক্র দমন করা কঠিন হয়ে পড়েছে পর্যাপ্ত জনবল ও নিয়মিত তদারকির অভাবে। ফলে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।

অভিযোগ রয়েছে, রাজধানীর শিল্পাঞ্চল এবং গাজীপুর, আশুলিয়া, সাভার, কেরানীগঞ্জ, মানিকগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় বিপুলসংখ্যক অবৈধ সংযোগ রয়েছে। এসব সংযোগের পেছনে বিতরণ কম্পানির কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অতীতে পরিচালিত অভিযানগুলো অনেক ক্ষেত্রেই ছিল নামমাত্র; সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পর সেগুলো আবার পুনঃস্থাপন করা হয়েছে। ফলে কার্যকর নজরদারি ও কঠোর ব্যবস্থা না থাকায় গ্যাস চুরির এই চক্রকে ঠেকানো যায়নি।

জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গ্যাস বিতরণ কম্পানিগুলোর সিস্টেম লস নিয়ে গত সপ্তাহেও বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে একটি বৈঠক হয়েছে। সেখানে সিস্টেম লসের বিভিন্ন প্রতিবেদন তুলে ধরে পেট্রোবাংলাসহ বিতরণ কম্পানিগুলো। সিস্টেম লস কমাতে সরকার ১৮০ দিনের বিশেষ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করলেও লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হয়নি। সরকারের লক্ষ্য ছিল সিস্টেম লস ৬ শতাংশে নামিয়ে আনা। কিন্তু এখনো তা ৯ শতাংশেই রয়েছে। আবাসিকের পাশাপাশি চুন কারখানা এবং ওয়াশিং ফ্যাক্টরিতে অবৈধ গ্যাস ব্যবহারের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, সাময়িক অভিযান নয়, অবৈধ গ্রাহকদের স্থায়ীভাবে বিচ্ছিন্ন করা না গেলে সিস্টেম লস কমানো সম্ভব নয়।

বর্তমানে দেশে সরবরাহ করা হয় দৈনিক গড়ে দুই হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মোট সিস্টেম লস প্রায় ৯ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ২৫ কোটি ঘনফুটের বেশি গ্যাসের কোনো হিসাব থাকে না। সরকার নির্ধারিত গড় বিক্রয়মূল্য অনুযায়ী এর আর্থিক মূল্য প্রায় ১৮ কোটি টাকা। বছরে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা। তবে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) গ্যাস বিতরণে সর্বোচ্চ ২ শতাংশ পর্যন্ত সিস্টেম লস অনুমোদন করে। সেটি বাদ দিলেও ৭ শতাংশের বেশি বা প্রায় ২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস প্রতিদিন চুরি বা অবৈধভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ১৪ কোটি টাকা এবং বছরে প্রায় পাঁচ হাজার ১১০ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, প্রতিদিন চুরি বা অবৈধভাবে ব্যবহৃত গ্যাস দিয়ে প্রায় ৩০ লাখ পরিবারের রান্নার চুলায় এক বছর তিন বেলা রান্না করা সম্ভব।

এ বিষয়ে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন ডিভিশন) প্রকৌশলী কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান বলেন, ‘অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অবৈধ লাইন কাটা হচ্ছে এবং তিতাসের নিজস্ব টিমও কাজ করছে। কিন্তু অভিযান চালানোর পরও রাতের অন্ধকারে আবার নতুন করে সংযোগ দেওয়া হচ্ছে। এ কারণে শুধু তিতাসের পক্ষে এই সমস্যা মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।’

কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করছে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ও এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে আরও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সিস্টেম লসের একটি বড় অংশই গ্যাস চুরির কারণে হচ্ছে। তাই গ্যাসের অপচয় ও ক্ষতি কমাতে অবৈধ সংযোগের বিরুদ্ধে কঠোর এবং সমন্বিত ব্যবস্থা গ্রহণ ছাড়া কার্যকর সমাধান সম্ভব নয়।’

বিইআরসির চেয়ারম্যান মো. জালাল আহমেদ বলেন, ‘গ্যাসের সিস্টেম লস ও চুরির কারণে সরকারের ভর্তুকির চাপ লাগামহীনভাবে বাড়ছে। সিস্টেম লস কমাতে গ্যাস বিতরণ নেটওয়ার্ককে ছোট ছোট এলাকায় ভাগ করে পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করা উচিত। এতে কোনো এলাকায় সিস্টেম লস বেশি হচ্ছে তা সহজেই চিহ্নিত করা যাবে এবং সেখানে নজরদারি বাড়ানো সম্ভব হবে।’

মো. জালাল আহমেদ আরও বলেন, ‘গ্যাসের অবৈধ সংযোগ এখনো বড় সমস্যা। বিপুলসংখ্যক অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব হয়নি, ফলে তিতাস গ্যাসের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায় হচ্ছে না। এ কারণে সিস্টেম লসের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণও অনেক বড়। বিইআরসি যখন গ্যাসের মূল্য নির্ধারণ করে, তখন তিতাসসহ সব বিতরণ কম্পানিকে সিস্টেম লস কমানোর বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়। কমিশন ভবিষ্যতেও এ বিষয়ে দেওয়া নির্দেশনা বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেবে।’

সূত্র: কালের কণ্ঠ