দুই বছরেও ববিতে জুলাই আন্দোলনে সাংবাদিক হামলায় জড়িত ছাত্রলীগের বিচার হয়নি

এশিয়া পোস্ট নিউজ, ববি
দুই বছরেও ববিতে জুলাই আন্দোলনে সাংবাদিক হামলায় জড়িত ছাত্রলীগের বিচার হয়নি
সাংবাদিক হামলায় প্রধান অভিযুক্ত শিশির আহমেদ সুমন। ছবি: সংগৃহীত

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের হামলার শিকার হন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস ক্লাবের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক আবু উবাইদা। তবে ঘটনার দুই বছর পেরিয়ে গেলেও হামলার বিচার সম্পন্ন করতে পারেনি বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এরই মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক ড. বদরুজ্জামান ভূঁইয়া, অধ্যাপক ড. শুচিতা শরমিন, অধ্যাপক ড. মো. তৌফিক আলমসহ তিনজন উপাচার্য পরিবর্তন হয়েছে।

২০২৪ সালের ৪ জুলাই বিকেল ৫টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি গেটসংলগ্ন এলাকায় তথ্য সংগ্রহের সময় নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের শান্ত-তমাল-আরাফাত গ্রুপের অনুসারী অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী শিশির আহমেদ সুমন, ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী শিমুলসহ কয়েকজন তাকে মারধর করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ সময় তিনি সাংবাদিক পরিচয় দিলেও অভিযুক্তরা তাকে এলোপাতাড়ি মারধর করেন। তার মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে ধারণ করা ভিডিও ফুটেজ মুছে ফেলা হয় এবং মুখ খুললে প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঘটনার পর ৬ জুলাই তৎকালীন প্রক্টর অধ্যাপক আব্দুল কাইউম ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও নানা জটিলতার পর অভিযোগটি গ্রহণ করা হয়। পরে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. মাহফুজ আলমকে আহ্বায়ক, প্রক্টর অফিসের মনোজ বৈরাগীকে সদস্যসচিব এবং গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ইমরান হোসাইনকে সদস্য করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

তবে তদন্ত চলাকালে কমিটির আহ্বায়ক ড. মাহফুজ আলম উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের বাইরে গেলে তদন্ত কার্যক্রম ধীর হয়ে পড়ে। পরে অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. হারুন-অর-রশিদকে আহ্বায়ক করে তদন্ত কার্যক্রম পুনরায় শুরু হয়। দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পর প্রায় পাঁচ মাস আগে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হলেও এখনও কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

এ বিষয়ে তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক মো. হারুন-অর-রশিদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে কমিটির সদস্য ও গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ইমরান হোসাইন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘প্রায় পাঁচ মাস আগে আমরা তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। আমাদের দায়িত্ব শেষ। এখন পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের।’

এদিকে হামলার প্রধান অভিযুক্ত শিশির আহমেদ সুমনের বিরুদ্ধে একই দিনে রসায়ন বিভাগের ২০২০–২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আরিফুর রহমান নামে আরেক আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীর ওপর হামলার অভিযোগও রয়েছে। সেই অভিযোগও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে জমা দেওয়া হলেও এখনো তারও কোনো বিচার হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

সাংবাদিক নেতা বরিশাল জেলা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ও দৈনিক নয়া দিগন্তের ব্যুরো প্রধান আযাদ আলাউদ্দীন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আবু উবাইদাসহ সারা দেশে জুলাই আন্দোলনে যারা আহত ও নিহত হয়েছেন, তাদের ওপর হামলার সঙ্গে জড়িতদের এখনো বিচারের আওতায় না আনাটা অত্যন্ত দুঃখজনক। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আমার অনুরোধ থাকবে, নিহতদের পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তা এবং আহতদের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা হোক।’

তিনি আরও বলেন, ‘বরিশাল জেলা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি হিসেবে আহত আবু উবাইদা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আমাকে দিয়েছিল। পরে সেগুলো বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টে জমা দেওয়ার মাধ্যমে তার জন্য এককালীন আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়েছিল। সরকার তাকে স্বীকৃতি দিলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন উদাসীন আচরণ মেনে নেওয়া যায় না।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মেহেদী হাসান সোহাগ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘বিষয়টি শৃঙ্খলা কমিটির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তারা এ নিয়ে কাজ করছেন।’ বিচার কার্যক্রম কবে শেষ হতে পারে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটি আমার একার সিদ্ধান্তের বিষয় নয়। কমিটি তাদের কার্যক্রম শেষ করলে ফলাফল জানা যাবে।’

এ বিষয়ে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. মামুন অর রশিদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আমি বিষয়টি সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত নই। তবে এমন ঘটনা অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। তদন্তে কেউ দোষী প্রমাণিত হলে তাকে কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না।’