২০ পেরিয়ে সাফল্যের পথে কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়

ময়মনসিংহের ত্রিশালে বিদ্রোহী কবির স্মৃতিবিজড়িত মাটিতে দাঁড়িয়ে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় পার করল পথচলার দুই দশক অর্থাৎ ২০ বছর। ২০০৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করা এই প্রতিষ্ঠানটি কেবল নজরুলের নাম, স্মৃতি ও সৃষ্টিকে ধারণ করেই থেমে থাকেনি; শিক্ষা, গবেষণা, সংস্কৃতি চর্চা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নেও ধীরে ধীরে বিস্তৃত করেছে নিজের পরিসর।
২০০৫ সালের ১ মার্চ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। পরের বছর ২০০৬ সালের ২৫ মে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্বোধন করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে প্রবেশ করলেই সেই নজরুলময় আবহ যেন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ক্যাম্পাসের প্রাণকেন্দ্রে স্বগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে চির উন্নত মম শির—বিদ্রোহী কবির অদম্য চেতনার প্রতীক। শুধু ভাস্কর্যেই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের দৈনন্দিন জীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জড়িয়ে আছেন কবি। গাহি সাম্যের গান মঞ্চ, আবাসিক হলগুলোর নাম অগ্নিবীণা বা দোলনচাঁপা, শিক্ষার্থীদের বাসের নাম কুহেলিকা, মৃত্যুক্ষুধা বাঁধনহারা ও ঝিলিমিলি, দূরের বন্ধু ও প্রলয়শিখি— এসব নামেই পরিচিত বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস, মেডিকেল সেন্টারের নাম ব্যথার দান এবং উপাচার্যের বাসভবনের নাম দেওয়া হয়েছে দুখু মিয়া বাংলো। পুরো দেশের প্রেক্ষাপটে এটি এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

বর্তমানে ছয়টি অনুষদের ২৫টি বিভাগে চলছে শিক্ষা কার্যক্রম। তবে পাঠদানের বাইরে গবেষণাতেও নিজেদের নাম পরিচিত করছে প্রতিষ্ঠানটি। ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘ইনস্টিটিউট অব নজরুল স্টাডিজ’-এর মাধ্যমে নজরুলের দর্শন নিয়ে গবেষণা চলছে এবং সব শিক্ষার্থীর জন্য নজরুল স্টাডিজ কোর্স বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। গবেষণার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে নেচার ইনডেক্স-২০২৬-এ প্রথমবারের মতো জায়গা করে নিয়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয়।
শিক্ষার্থী সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুগতিতেই এগোচ্ছে ক্যাম্পাসের ভৌত অবকাঠামো। নতুন ১০ তলা আবাসিক হল, টিএসসি, ইনস্টিটিউট ভবন ও প্রবেশদ্বার নির্মাণের কাজ চলছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও পেশাগত জীবনের জন্য প্রস্তুত করতে ক্যাফেটেরিয়া ও ক্লাসরুমের বাইরে রোটারেক্ট, ক্যারিয়ার ক্লাব ও সাংবাদিক সমিতিসহ নানা সংগঠন মুখরিত রাখছে ক্যাম্পাস।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন বলেন, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি মানসম্মত, উন্নত এবং শিক্ষা ও শিক্ষার্থীবান্ধব বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তোলাই বর্তমান প্রশাসনের লক্ষ্য। এ জন্য শিক্ষা, গবেষণা, সুশাসন ও অংশগ্রহণমূলক প্রশাসনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, শূন্য থেকে শুরু করতে চাই, কিন্তু পরিপূর্ণ হয়ে ফিরে যেতে চাই। ব্যক্তি হিসেবে আমি কেবল একটি মাধ্যম, বাস্তবায়নের দায়িত্ব সবার।
বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থে দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে এক হয়ে কাজ করতে আহ্বান জানান তিনি।

প্রতিষ্ঠার দুই দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে তাই শুধু অর্জনের হিসাব নয়, রয়েছে আরও বড় হওয়ার প্রত্যাশাও। যে কবির নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়, তার সাম্য, মানবতা, অসাম্প্রদায়িকতা ও বিদ্রোহের চেতনা ধারণ করে শিক্ষা ও গবেষণায় আরও এগিয়ে যাওয়াই এখন প্রতিষ্ঠানটির বড়ো চ্যালেঞ্জ। ত্রিশালের মাটিতে দুই দশকের যাত্রা পেরিয়ে সেই পথেই এগোচ্ছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।
.png)






