নগরবাসীর উন্মুক্ত শরীরচর্চা কেন্দ্র বাহাদুর শাহ পার্ক

রাজধানীর পুরান ঢাকায় ইতিহাসের এক অনন্য ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে বাহাদুর শাহ পার্ক। একসময় ‘আন্টাঘর ময়দান’ নামে পরিচিত এই স্থানটির নাম পরে ইংল্যান্ডের রানি ভিক্টোরিয়ার নামানুসারে রাখা হয় ‘ভিক্টোরিয়া পার্ক’। তবে স্থানীয়দের কাছে এটি আজও বাহাদুর শাহ পার্ক কিংবা ভিক্টোরিয়া পার্ক উভয় নামেই পরিচিত। নগরজীবনের ব্যস্ততা শেষে প্রতিদিন বহু মানুষ এখানে আসেন বিশ্রাম নিতে, সময় কাটাতে।
ঐতিহাসিক এই ময়দানটির পাশে রয়েছে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, মহানগর মহিলা কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংলগ্ন হওয়ায় অবসর সময়ে শিক্ষার্থীরাও ছুটে আসেন ময়দানটিতে স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে। আবার কেউ কেউ এই পার্কে আসেন শরীরচর্চা করার উদ্দেশ্যে।
২০২৩ সালে সিটি করপোরেশন পার্কের অভ্যন্তরে ক্যানটিন ও ফুড কার্ট বসানোর অনুমোদন দেয়। এই অনুমোদন ঘিরে তৈরি হয় সমালোচনা, প্রতিবাদের ঝড়। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর পার্কের সেই ক্যানটিন ও ফুডকার্ট উচ্ছেদ করা হয়।
পার্কের ভেতরে ‘সু-প্রভাত সংঘ’ ও ‘বাহাদুর শাহ নাইট জিম’ নামে দুটি সংগঠন রয়েছে। এখানে পার্কে হাঁটতে আসা মানুষ সকাল ও সন্ধ্যায় বিনামূল্যে জিম ও শরীরচর্চার সুযোগ পান। প্রতিদিন তরুণ থেকে শুরু করে বয়স্ক—শত শত মানুষ এখানে এসে নিয়মিত শরীরচর্চা করেন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন বয়সের মানুষ পার্কের ভেতরে শরীরচর্চা করছেন। আবার অনেককে দেখা যায় পার্কে হাঁটতে। রাতে ব্যায়াম করতে আসা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সৈকত বলেন, বাহাদুর শাহ পার্ক একটি ঐতিহ্যবাহী পার্ক। এখানে আমার নিয়মিত আসা হয়, শরীরচর্চা করি। শরীর নিয়ে সচেতন থাকি। ভিক্টোরিয়া পার্কে ব্যায়ামাগারের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই।
রাতে ব্যায়াম করতে আসা রবিন বলেন, আমরা তো আজ থেকে নয়, ২০০৩-৪ সাল থেকেই এখানে ব্যায়াম করি। মাঝখানে এখানে তিন-চার বছর ধরে ক্যানটিন ছিল। আগে এত কিছু ছিল না, ফুল গাছ ছিল। নতুন করে সংস্কারের সময় এক বছর ব্যায়াম করা যায়নি, তখন ইট-পাথর স্তূপ করা ছিল।
তিনি আরও বলেন, পরে হুট করে দেখি এখানে ক্যানটিন ও ফুডকার্ট বসেছে। এরপর যখন সরকার পরিবর্তন হলো, তখন এগুলো উঠিয়ে দেওয়া হলো। এরপর আবার শুরু হলো নতুন করে জিম করা। যারা জিমের উদ্যোগ নিয়েছে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা। কারণ এগুলো তো সচরাচর ঢাকায় থাকে না। সরকার যদি এটিকে আরও উন্নত করে, তাহলে সবাই কৃতজ্ঞতা জানাবে।
সকালে ব্যায়াম করতে আসা মামুন বলেন, আমি প্রতিদিন সকালে ৮টার পর এসে দুই ঘণ্টা ব্যায়াম করি। এটি আমার নেশা হয়ে গেছে। রাতে আসতে পারি না, কাজ থাকে।
সকালে ব্যায়াম করতে আসা সুমন বলেন, সকালে প্রতিদিন ব্যায়াম করি। শরীর, খাওয়া-দাওয়া, ঘুম সবকিছু ঠিকভাবেই হচ্ছে।
সু-প্রভাত সংঘের সভাপতি আনোয়ার বলেন, ৩৫ বছর আগে আমি বাসায় একাই ব্যায়াম করতাম। পরে ভাবলাম একা নয়, সবাই মিলে করি—এই চিন্তা থেকে এখানে সরঞ্জাম নিয়ে আসি। এখন আমাদের সদস্য দুই শতাধিক।
তিনি আরও বলেন, ৫ আগস্টের পর বিক্ষুব্ধ জনতা যখন এখানে থাকা ক্যানটিন ভেঙে ফেলে, তখন আমরা এখানে ‘সু-প্রভাত সংঘ’ নামে ব্যায়ামাগার তৈরি করি, যাতে সবাই বিনামূল্যে শরীরচর্চা করতে পারে। পার্কে আগে গাঁজার আস্তানা ছিল। তখন ভাবলাম, আমি আমার জিমের ইন্সট্রুমেন্টগুলো যদি এখানে নিয়ে সবার জন্য উন্মুক্ত জিমের ব্যবস্থা করতে পারি, তাহলে মাদক অনেক কমে যাবে।




