নগরের সেবা খাতে অবৈধ স্বার্থ ও রাজনৈতিক প্রভাব বন্ধের দাবি আইপিডির

ঢাকার কাফরুলে ময়লা বাণিজ্য, ফুটপাত দখল ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডকে গভীর উদ্বেগের বিষয় বলে মনে করছে নগর গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)। সংস্থাটি বলেছে, কাফরুলের ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়; বরং নগরের সেবা ও ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন খাতে গড়ে ওঠা অবৈধ অর্থনৈতিক স্বার্থ ও রাজনৈতিক প্রভাবের বিপজ্জনক যোগসূত্রেরই বহিঃপ্রকাশ।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আইপিডির পক্ষে এসব কথা জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে স্বাক্ষর করেন সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক অপসংস্কৃতির অবসান হবে বলে জনগণের যে প্রত্যাশা ছিল, তা যথাযথভাবে পূরণ হয়নি। ক্ষমতা বা সরকারের পরিবর্তন হলেও স্বার্থান্বেষী চক্র ভাঙার কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। রাজনৈতিক দলীয় পদ-পদবি ও পরিচয়কে জনসেবার বদলে এখনও অবৈধ অর্থ উপার্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
আইপিডি উল্লেখ করে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ফুটপাত, বাজার, গণপরিবহন, পার্ক, খাল ও জলাশয় দখলকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী ‘নগর মাফিয়াতন্ত্র’ ও সমান্তরাল অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে উঠেছে। এর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রাজনৈতিক বলয়ের ভেতরেই সংঘাত, সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে।
সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নাগরিকেরা নিয়মিত হোল্ডিং ট্যাক্স দেওয়ার পরও আলাদা করে ময়লা অপসারণের জন্য অতিরিক্ত টাকা দিতে হচ্ছে। স্বচ্ছ ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সিটি করপোরেশন সরাসরি বর্জ্য সংগ্রহ করলে রাজস্ব বৃদ্ধি পেত এবং মধ্যস্বত্বভোগী চাঁদাবাজদের অবসান ঘটত।
আইপিডির মতে, স্থানীয় সরকারে দীর্ঘদিন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকা এবং দলীয়ভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত প্রশাসকদের মাধ্যমে সিটি করপোরেশন পরিচালিত হওয়ায় জবাবদিহিতা দুর্বল হয়েছে। এর ফলে স্থানীয় পর্যায়ে অবৈধ গোষ্ঠীগুলো আরও বেশি সক্রিয় হয়ে উঠছে।
কাফরুলের মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান যথেষ্ট নয় বলে মনে করে আইপিডি। এই সংঘাতের অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি ভেঙে দেওয়ার তাগিদ দিয়ে সংস্থাটি সরকারের প্রতি সাত দফা সুপারিশ পেশ করেছে—
- আইনের প্রয়োগ: রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজি ও অবৈধ বাণিজ্যে জড়িতদের বিরুদ্ধে দল-মতনির্বিশেষে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া।
- রাজনৈতিক সংস্কার: রাজনৈতিক পদ ব্যবহার করে দখল ও চাঁদাবাজিতে যুক্তদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট দলগুলোর কঠোর অবস্থান গ্রহণ।
- বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পুনর্গঠন: ময়লা সংগ্রহপ্রক্রিয়া পুরোপুরি সিটি করপোরেশনের অধীনে এনে অনিয়ন্ত্রিত অতিরিক্ত ফি আদায় বন্ধ করা।
- দখলমুক্ত অভিযান: ফুটপাত, সরকারি জমি, পার্ক, খাল ও জলাশয় দখলমুক্ত করতে নিয়মিত নিরপেক্ষ অভিযান চালানো।
- স্বচ্ছতা ও ডিজিটাল নজরদারি: নগরসেবাভিত্তিক সব ইজারা, চুক্তি ও আর্থিক লেনদেনে পূর্ণ স্বচ্ছতা এবং ডিজিটাল মনিটরিং চালু করা।
- জনপ্রতিনিধি নির্বাচন: সিটি করপোরেশনে দ্রুত নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে জবাবদিহিমূলক স্থানীয় সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।
- জাতীয় কর্মপরিকল্পনা: নগর ব্যবস্থাপনার অবৈধ অর্থনীতি ও অপরাধীদের চিহ্নিত করে তা নির্মূলে সমন্বিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা ও রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি করা।
আইপিডি সতর্ক করে বলেছে, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ, কার্যকর স্থানীয় সরকার এবং রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ছাড়া শহরকে নিরাপদ ও বাসযোগ্য করা সম্ভব নয়। অন্যথায় সম্পদ ও সেবা খাত দখলকে কেন্দ্র করে রক্তক্ষয় ও প্রাণহানির পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে।
.png)





