ভেলাম ভান সেন্দেলের প্রবন্ধ/বাংলাদেশ অধ্যয়নের ঘাটতি, পক্ষপাত ও ভবিষ্যৎ

বাংলাদেশ অধ্যয়ন বলে কি সত্যিই কোনো একাডেমিক ক্ষেত্র আছে? এ প্রশ্নের উত্তরে আমরা বরং নিজেদের সমাজবিজ্ঞান ও মানববিদ্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখি। স্পষ্টতই, এসব ক্ষেত্রে প্রচুর গবেষণা হচ্ছে। আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন গবেষণার হার অনেক বেশি। যাকে আমরা বাংলাদেশি সমাজ বলি, সেই বিশাল জনসমুদ্র সম্পর্কে আমাদের বোঝাপড়াও দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু জ্ঞান উৎপাদনের ক্ষেত্র হিসেবে বাংলাদেশ অধ্যয়ন এখনো বেশ অগোছালো। এর প্রাতিষ্ঠানিক রূপও বেশ দুর্বল।
তাই কেউ বাংলাদেশ অধ্যয়ন নিয়ে কিছু বলতে চাইলে শুরুতেই নিজের সীমাবদ্ধতার মুখে পড়েন। আমাদের প্রত্যেকেই কেবল এর খণ্ডচিত্রই তুলে ধরতে পারি। আমার ক্ষেত্রেও কথাটি সত্যি। এই ছোট লেখায় আমি আমার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিষয়টি তুলে ধরব। এটি আমার একান্তই নিজস্ব ও বেশ সীমাবদ্ধ একটি অবস্থান। বলতে পারেন, এটি আমার ‘ব্যক্তিগত হেলিকপ্টার’ থেকে দেখা দৃশ্য।
ইতিবাচক দিক
শিরোনাম দেখেই হয়তো বুঝতে পেরেছেন, আমি মূলত উদ্বেগের জায়গাগুলোতেই বেশি জোর দেব। তবে শুরুতেই কিছু ইতিবাচক দিকের কথা বলতে চাই। প্রথমত, স্বাধীন দেশ হিসেবে গত ৪০ বছরের বেশি সময়ে এখানে বিস্ময়কর এক একাডেমিক পুনর্জাগরণ ঘটেছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, এখানে গবেষণাধর্মী কাজ (আমি নিজেকে এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখছি) শুরু হয়েছিল একেবারে শূন্য থেকে। এর পেছনে ছিল সম্ভাব্য গবেষকদের হারিয়ে যাওয়ার নজিরবিহীন এক চতুর্মুখী ধাক্কা।
১৯৪৭ সালে অনেক হিন্দু বুদ্ধিজীবী এই ভূখণ্ড ছেড়ে চলে যান। একইভাবে অনেক মুসলিম বুদ্ধিজীবী ভারতেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এরপর ১৯৭১ সালে হত্যাকারীরা বেছে বেছে স্থানীয় বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে। পাশাপাশি অনেক অবাঙালি বুদ্ধিজীবী পাকিস্তানে চলে যান। ফলে দেশে দ্বিতীয়বারের মতো মেধার শূন্যতা তৈরি হয়। এসব কারণে স্বাধীন বাংলাদেশ যাত্রা শুরু করেছিল একেবারেই ক্ষুদ্র এক গবেষক গোষ্ঠী নিয়ে।
সত্তরের দশক থেকে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত সময়টা এই গবেষকদের জন্য মোটেও সহজ ছিল না। তখন পুরো দেশের মতোই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও অত্যন্ত কঠিন সময় পার করেছে। তবে এরপর তরুণ গবেষকদের একটি নতুন বলয় বেশ জোরেশোরেই গড়ে উঠেছে। ফলে সমালোচনামূলক একাডেমিক বিতর্কের পরিসরও বিস্তৃত হয়েছে। দেশে এখন বাংলাদেশ অধ্যয়নের পাঠদানে ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। দেশি ও বিদেশি প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গবেষকেরা এতে অংশ নিচ্ছেন।
এর বাইরে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বিশাল প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যেও এমন অনেক শিক্ষার্থী তৈরি হচ্ছেন, যাদের বাংলাদেশ অধ্যয়নে আগ্রহ রয়েছে। প্রবাসীদের কাছ থেকে নতুন উদ্যোগ ও গবেষণায় বিনিয়োগের আশাও জাগছে। অন্যান্য প্রবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যেও আমরা এমনটা দেখতে পাই। তারা মূলত নিজেদের শেকড়ের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখতে চান। [১]
বিষয়বস্তুর দিক থেকেও ৪০ বছর আগের তুলনায় বাংলাদেশ অধ্যয়ন এখন অনেক বেশি সমৃদ্ধ। সে সময় গবেষণার মূল বিষয় ছিল উন্নয়ন (বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই যার সংজ্ঞা ছিল সংকীর্ণ ও যান্ত্রিক), ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ঔপনিবেশিক ইতিহাস এবং বাংলা ভাষা ও সাহিত্য। এরপর আরও অনেক নতুন বিষয় যুক্ত হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে দারুণ সব নতুন সংযোগের একটি নিবিড় বলয় তৈরি হয়েছে। এই সংযোগ কেবল উপক্ষেত্রগুলোর মধ্যেই ঘটেনি। সমাজবিজ্ঞান ও মানববিদ্যার আন্তর্জাতিক অগ্রগতির সঙ্গে বাংলাদেশ অধ্যয়নেরও একটি নিবিড় সংযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে বাংলাদেশ বিষয়ে জ্ঞান উৎপাদনের ভবিষ্যৎ বেশ উজ্জ্বলই মনে হচ্ছে।
দুর্বলতা
কিন্তু এসব অগ্রগতির ফলে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ কি আরও দৃশ্যমান একটি সমাজ হয়ে উঠেছে? আমি বলব, খুব একটা নয়। বিশ্বের অন্যতম জনবহুল একটি দেশ হিসেবে যতটা দৃশ্যমান হওয়ার কথা ছিল, ততটা তো নয়ই। বাংলাদেশ অধ্যয়ন এখনো একটি গঠন প্রক্রিয়ার মধ্যেই রয়েছে। এটি এখনো এমন কোনো পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি, যেখান থেকে শক্তিশালী একাডেমিক বিতর্ক তৈরি হতে পারে। এমন বিতর্ক, যা সমাজবিজ্ঞান ও মানববিদ্যার বৃহত্তর আলোচনায় শক্ত অবদান রাখবে। এখানে আমি পাঁচটি দুর্বলতার কথা তুলে ধরছি।
১. বাংলাদেশ অধ্যয়ন হীনম্মন্যতায় ভুগছে। এখনো এর মধ্যে একধরনের আত্মরক্ষামূলক প্রবণতা দেখা যায়। দক্ষিণ এশিয়া অধ্যয়নের ক্ষেত্রে একে অনেকটা নতুন ও দুর্বল প্রতিযোগী মনে করা হয়। এই অনুভূতি থেকেই জাতীয় ও সাংস্কৃতিক গৌরবকে বড় করে দেখানোর প্রবণতা কাজ করে। মহামানব বা মহীয়সীদের স্মৃতি আঁকড়ে ধরার তাগিদ দেখা যায়। একই সঙ্গে বাইরের সমালোচকদের প্রতি একধরনের অতিসংবেদনশীলতা কাজ করে। বাইরের গবেষকদের মতামত ও বিশ্লেষণকে প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
২. আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ অধ্যয়নের উল্লেখযোগ্য কোনো উপস্থিতি নেই। এই অঞ্চলের বাইরে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা গবেষণা কেন্দ্রে ‘সেন্টার ফর বাংলাদেশ স্টাডিজ’ বা বাংলাদেশ অধ্যয়ন কেন্দ্র নেই। সত্তরের দশক ও আশির দশকে কিছু কেন্দ্র গড়ে উঠলেও পরে সেগুলো বিলীন হয়ে গেছে। [২] অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশ অধ্যয়ন নিয়ে নিয়মিত কোনো বিশ্ব সম্মেলনও হয় না।
ফলে বাংলাদেশ বিষয়ে বৈশ্বিক জ্ঞান উৎপাদনে বড় কোনো পরিসর তৈরি হয়নি। কারণ, বাংলাদেশ নিয়ে কাজ করা বেশির ভাগ গবেষক হয় দেশের ভেতরে কাজ করেন, নয়তো দেশের বাইরে বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করেন। যে দেশ নিজেদের সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত ঐতিহ্য নিয়ে এত গর্ব করে, তাদের পরপর কয়েকটি সরকার একটি কার্যকর সাংস্কৃতিক পররাষ্ট্রনীতি তৈরি করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। বিষয়টি সত্যিই বিস্ময়কর।
৩. বাংলাদেশ নিয়ে কাজ করা গবেষকদের সামাজিক প্রেক্ষাপট খুবই সীমাবদ্ধ। তাদের বেশির ভাগই বাংলাদেশি নাগরিক, প্রবাসী দক্ষিণ এশীয় এবং উন্নয়ন বা নীতিনির্ধারণী গবেষক। বিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং উন্নয়নের ‘মক্কা’ হিসেবে এর পরিচিতি যে প্রাথমিক আগ্রহ তৈরি করেছিল, তা এখন স্তিমিত হয়ে এসেছে। দৈবক্রমে কেউ কেউ এই ক্ষেত্রে যুক্ত হলেও বিশ্বজুড়ে তরুণ গবেষকদের মধ্যে বাংলাদেশ নিয়ে বড় কোনো আগ্রহ অবশিষ্ট নেই। বিদেশে বাংলাদেশ অধ্যয়নের পাঠদানও কমে গেছে। এগুলো বেশ অগোছালো ও অপ্রতুল। আর বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এমন মানুষেরা এর পাঠদান করছেন, যাদের এ বিষয়ে বাস্তব জ্ঞান নেই বললেই চলে। পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দক্ষিণ এশিয়া-বিষয়ক যে কোনো কোর্সের সিলেবাস দেখলেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে।
৪. দেশের ভেতরে মানসম্মত একাডেমিক জ্ঞান উৎপাদনের পথে বেশ কিছু বিষয় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। গবেষণা তহবিল, ক্যারিয়ারে অগ্রগতি কিংবা জাতীয় জার্নালে প্রকাশের ক্ষেত্রে মানসম্মত ‘পিয়ার-রিভিউ’ বা সমকক্ষদের দিয়ে মূল্যায়নের চর্চাটি বেশ নতুন। এটি এখনো সেভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আরেকটি কারণ হলো, সমাজবিজ্ঞান ও মানববিদ্যার গবেষণায় তহবিলের পরিমাণ এখনো অনেক কম। পাশাপাশি এটি রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার বেড়াজালেও আবদ্ধ।
৫. শেষ দুর্বলতাটি হলো, বিশেষজ্ঞ সহকর্মীদের জন্য লেখা একাডেমিক প্রবন্ধ এবং সাধারণ পাঠকের জন্য লেখার মধ্যে সুস্পষ্ট কোনো পার্থক্য সব সময় দেখা যায় না। গবেষকেরা এই দুই শ্রেণির জন্যই লেখেন—এটি নিঃসন্দেহে বড় একটি শক্তি।
তবে দুটি কারণে এই পার্থক্য বজায় রাখা জরুরি। প্রথমত, একাডেমিক লেখার কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম, পেশাদারি নিয়ন্ত্রণ, ধারণাগত সুনির্দিষ্টতা এবং নৈতিক বাধ্যবাধকতা থাকে। ফলে এগুলো জনপরিসরে সরাসরি ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়ে। সমাজকে একটি নির্দিষ্ট মানদণ্ডে বিশ্লেষণ করাই এর কাজ।
ধরন হিসেবে এটি নীতিগত পরামর্শ, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, প্রবন্ধ বা সাংবাদিকতার চেয়ে আলাদা। দ্বিতীয়ত, প্রচলিত সামাজিক ট্যাবু ও মিথ নিয়ে কথা বলার ভীতি থেকে একাডেমিক লেখাকে মুক্ত থাকতে হবে। এসব ট্যাবু বা মিথকে ভালোভাবে বিশ্লেষণ করতে এবং এর বিপরীতে শক্ত যুক্তি দাঁড় করাতে হলে বিশেষজ্ঞ মহলে এর চর্চা হওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশ অধ্যয়নের ক্ষেত্রে জ্ঞান উৎপাদনের এই ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রগুলোর মধ্যকার পার্থক্য অনেক সময়ই অস্পষ্ট থেকে যায়।
পক্ষপাত
বর্তমান দুর্বলতাগুলোর পাশাপাশি বাংলাদেশ অধ্যয়নের পক্ষপাতগুলো নিয়ে ভাবাও জরুরি। দৃষ্টিভঙ্গির ওপর ভিত্তি করে এই পক্ষপাত বা ঝোঁককে ইতিবাচক বা নেতিবাচক হিসেবে দেখা যেতে পারে। বাংলাদেশ অধ্যয়নে বেশ কয়েকটি পক্ষপাত চোখে পড়ে। আর এগুলো থাকার পেছনে কিছু যৌক্তিক কারণও রয়েছে। আমি সংক্ষেপে কয়েকটির কথা উল্লেখ করছি:
১. বেশির ভাগ গবেষকই মনে করেন, বাংলাদেশ অধ্যয়ন মানেই এখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জনগোষ্ঠী নিয়ে কাজ করা। গবেষকেরা সাধারণত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বিষয়টি এড়িয়ে যান। অথবা তারা এসব গোষ্ঠীকে কেবল নৃবিজ্ঞান বা নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেন। অবস্থা বদলাচ্ছে, তবে খুব ধীরগতিতে। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রেও আমাদের একই ধরনের পক্ষপাত দূর করতে হবে। এখনো তাদের ওপর দেশভাগ–সংশ্লিষ্ট সন্দেহের ভারী বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়।
২. বাংলাদেশ অধ্যয়ন পদ্ধতিগত জাতীয়তাবাদ, কিংবা আরেকটু কঠিন ভাষায় বললে ‘ভূখণ্ডকেন্দ্রিক জ্ঞানতত্ত্বে’র দোষে দুষ্ট। গবেষকেরা তাদের বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ভূখণ্ডকেই পূর্বনির্ধারিত ও স্বাভাবিক একটি মানদণ্ড হিসেবে ধরে নেন। এর মধ্য দিয়ে তারা এমন এক ভ্রান্ত ধারণাকে উসকে দেন যে বাংলাদেশ একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক একক। একটু আগেই যে আত্মরক্ষামূলক প্রবণতার কথা বলেছিলাম, এটি আংশিকভাবে তারই ফল। এ কারণে বাংলাদেশ অধ্যয়ন বেশ জোরেশোরেই জাতীয়তাবাদী হয়ে ওঠে। ফলে এর মধ্যে একধরনের সেকেলে ভাব চলে আসে।
৩. তৃতীয় পক্ষপাতটি হলো, রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের প্রতি তীব্র আকর্ষণ। বাংলাদেশের প্রাত্যহিক জীবনের ব্যস্ততা থেকেই এই প্রবণতার জন্ম। রাজনীতির খুঁটিনাটি বিষয়, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ ও ঘটনাগুলোকে বেশ উৎসাহের সঙ্গেই বিশ্লেষণ করা হয়। অথচ এর পেছনের কাঠামোগত ধরনগুলোর (অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, পরিবেশগত বা এমনকি রাজনৈতিক) দিকে আমাদের আরও বেশি মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন ছিল।
৪. চতুর্থত, বাংলাদেশ অধ্যয়ন এখনো উন্নয়নমূলক দৃষ্টিভঙ্গির চশমাতেই আবদ্ধ। বিষয়টি অবশ্য বোধগম্য। কারণ, উন্নয়ননীতির বিভিন্ন ট্রেন্ডের (যেমন—জেন্ডার, ক্ষুদ্রঋণ, টেকসই উন্নয়ন) সঙ্গে প্রচুর তহবিলের জোগান আসে। এই তহবিল অনেক গবেষককেই এসব খাতের দিকে ঠেলে দিয়েছে। ফলে বিকল্প গবেষণার ক্ষেত্র তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অথচ বাংলাদেশ অধ্যয়নকে একটি সমন্বিত, গতিশীল ও টেকসই ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তুলতে হলে এমন বিকল্প গবেষণার বিষয়গুলো অত্যন্ত জরুরি।
৫. সবশেষে বলতে হয় ঢাকাকেন্দ্রিকতার পক্ষপাতের কথা। ঢাকা একটি বিশাল শহর। এটি একুশ শতকের বিশ্বের অন্যতম জনবহুল মেগাসিটি হতে চলেছে। কিন্তু ঢাকাই তো আর বাংলাদেশ নয়। ২০৫০ সালেও যখন ঢাকার জনসংখ্যা ৪ কোটি ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, তখনো দেশের প্রতি পাঁচজন বাংলাদেশির মাত্র একজন এই শহরে বাস করবেন।
বাংলাদেশ নিয়ে অনেক গবেষণাতে ঢাকার ঘটনাগুলো মূল বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। আরও খারাপ দিক হলো, অনেক ক্ষেত্রে অলিখিতভাবেই ধরে নেওয়া হয় যে ঢাকা মানেই পুরো দেশ। ঢাকার বাইরের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়াগুলোকে আজকের তুলনায় আরও অনেক গভীরভাবে বোঝা আমাদের জন্য জরুরি।
দৃষ্টির অগোচরে
স্পষ্টতই, যেকোনো ক্ষেত্রেই কিছু অন্ধগলি থাকে। বাংলাদেশ অধ্যয়নও এর ব্যতিক্রম নয়। তহবিলের কাঠামোটি সমাজবিজ্ঞানের একটি বিশেষ ধরনকে (নীতিনির্ধারণী উন্নয়ন গবেষণা) বেশ সুবিধা দিয়েছে। অন্যদিকে জাতীয় আবেগ সুবিধা দিয়েছে অন্য কিছু খাতকে (বিশেষ করে রাজনৈতিক ইতিহাস এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণা)।
এর বাইরে আরও অনেক ক্ষেত্র আড়ালেই রয়ে গেছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, প্রত্নতত্ত্ব, পপুলার কালচার বা জনপ্রিয় সংস্কৃতি, উপভাষা বিজ্ঞান, মানবীয় ভূগোল এবং গতিশীলতা বা মোবিলিটি স্টাডিজের মতো ক্ষেত্রগুলোতে আরও জোর দেওয়া প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। আমার বিশ্বাস, যে কেউ চাইলে এমন আরও অনেক বিষয়ের কথা ভাবতে পারবেন।
উদাহরণ হিসেবে মানুষের গতিশীলতা বা মোবিলিটি স্টাডিজ নিয়ে গবেষণার কথাই ধরা যাক।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রবাসী গোষ্ঠী হওয়া সত্ত্বেও কোটি কোটি প্রবাসী বাংলাদেশিকে নিয়ে কেন এত কম গবেষণা হয়েছে, তা নিয়ে আমরা বিস্মিত হতেই পারি। কিংবা দেশের ভেতরের অভিবাসন (কেবল ঢাকামুখী নয়) কেন এখনো মূলত বিশ্লেষণের বাইরেই রয়ে গেছে? এ ছাড়া দেশের রাষ্ট্রযন্ত্রের অভিজাত শ্রেণি, ধনিক গোষ্ঠী, বাংলাদেশে বসবাসরত বিদেশি বা প্রবাসী সম্প্রদায় কিংবা দাতা সংস্থাগুলোকে নিয়ে কেন কোনো শক্তিশালী নৃতাত্ত্বিক গবেষণা আমাদের নেই?
বাংলাদেশের জন্য সম্পূর্ণ নিজস্ব এমন ক্ষুদ্র ভাষাভাষী সম্প্রদায়গুলো সম্পর্কে আমরা প্রায় কিছুই জানি না কেন? উদাহরণ হিসেবে ম্রো ভাষা (যাদের এখন নিজস্ব নতুন লিপি তৈরি হয়েছে) বা চাটগাঁইয়া ভাষার কথা বলা যায়। তা ছাড়া, কৃষির ওপর বৈশ্বিক প্রভাব এবং কৃষিজীবী–পরবর্তী সম্পর্কের ধারণা পেতে আমাদের কি গ্রাম নিয়ে নতুন করে গবেষণা শুরু করার সময় আসেনি?
দক্ষিণ এশিয়া অধ্যয়নে বাংলাদেশের অবস্থান?
দক্ষিণ এশিয়া অধ্যয়নে বাংলাদেশকে কীভাবে স্থান দেওয়া যায়, সে বিষয়ে কিছু কথা বলে শেষ করতে চাই। আমার প্রশ্ন হলো, কেন আমাদের এটি করতে হবে? আমি বলতে চাইছি, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য সমাজের সঙ্গে বাংলাদেশবিষয়ক বিতর্কের সম্পর্ক স্থাপনে দোষের কিছু নেই।
তবে অন্যান্য প্রেক্ষাপটের চেয়ে একেই কি বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কোনো প্রয়োজন আছে? দক্ষিণ এশিয়া অধ্যয়নে বাংলাদেশের যাত্রাপথটি বেশ অস্বাভাবিক। তাই এটি হয়তো প্রান্তিক একটি বিষয় হয়েই থাকবে। অন্যান্য দক্ষিণ এশীয় গবেষকদের কাছ থেকে এটি হয়তো খুব একটা আগ্রহও কাড়তে পারবে না। আমি বলব, সেখানে নিজেদের আরও কেন্দ্রীয় চরিত্রে তুলে ধরার চেষ্টায় আমাদের খুব বেশি শক্তি ক্ষয় করার প্রয়োজন নেই।
বরং বাংলাদেশ অধ্যয়নকে সাজানো ও এগিয়ে নেওয়ার আরও অনেক দারুণ উপায় থাকতে পারে। প্রথমত, সব প্রতিবেশী অঞ্চলের গবেষণার সঙ্গেই আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক সংযোগ স্থাপন করতে হবে। বাংলাদেশ অধ্যয়নে সবচেয়ে বড় অন্ধবিন্দুটি হলো বার্মাকে (মিয়ানমার) ক্রমাগত অবহেলা করা।
গভীর ও প্রাচীন সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে এই দেশটিকে চরমভাবে ভিনদেশি বা ‘অপর’ হিসেবে দেখা হয়। যদিও সম্প্রতি নতুন করে সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা চলছে এবং বর্তমানে পারস্পরিক শত্রুতার বিষয়টিও রয়েছে। বার্মা এখন বহির্বিশ্বের জন্য যেভাবে উন্মুক্ত হচ্ছে, সেই পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ অধ্যয়ন একেবারেই প্রস্তুত নয়।
উত্তর-পূর্ব ভারতের (ধরে নিলাম, নামে এটিও দক্ষিণ এশিয়া) সঙ্গে আমাদের একাডেমিক সম্পর্কও এখনো বেশ দুর্বল। এটি আমাদের সমানভাবেই অপরিচিত ও উপেক্ষিত এক প্রতিবেশী। তাই বৃহত্তর আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ অধ্যয়নের স্থান নির্ধারণের ক্ষেত্রে আমাদের কেবল পশ্চিমবঙ্গ বা তার আশপাশের দিকে তাকিয়ে থাকলেই চলবে না, বরং সব দিকে নজর দিতে হবে।
তবে কেবল আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটও এখন আর যথেষ্ট নয়। কারণ, বাংলাদেশ এখন আর কেবল নিজের সীমান্ত বা এর চারপাশের ভৌগোলিক পরিবেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। আমরা প্রায়ই এটিকে সাম্প্রতিক একটি ঘটনা বলে মনে করি। কিন্তু বাস্তবে মোটেও তা নয়। বাংলার ধানচাষিরা গিয়ে বসতি গড়েছেন মধ্য বার্মায়। আমাদের ব্যবসায়ীরা গেছেন সুমাত্রা, দক্ষিণ আফ্রিকা ও কিউবায়। পেশাজীবীরা গেছেন নাইজেরিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও জাপানে। শ্রমিকেরা গেছেন ওমান, মালয়েশিয়া ও ইতালিতে। ভারত ও পাকিস্তানে থাকা কোটি কোটি বাংলাদেশির কথা না হয় বাদই দিলাম।
বিবেক বল্ড তার সাম্প্রতিক বই ‘বেঙ্গলি হারলেম অ্যান্ড দ্য লস্ট হিস্ট্রিজ অব সাউথ এশিয়ান আমেরিকা (২০১৩)’-তে ১৮৯০-এর দশক থেকে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা মুসলিম বাঙালি ফেরিওয়ালা ও নাবিকদের জীবনের গল্প তুলে ধরেছেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কীভাবে তাঁরা শ্রমজীবী, বিশেষ করে আফ্রিকান-আমেরিকান পরিবারগুলোর সঙ্গে মিশে গিয়েছিলেন, সেই চিত্রও উঠে এসেছে বইটিতে।
বৈশ্বিক সংযোগের এই অজানা গল্পগুলোই বলে দেয়, ব্যবসা, আত্মীয়তা ও কর্মসংস্থানের বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের কাঠামোর মধ্যে বাংলাদেশ অধ্যয়নকে যুক্ত করা এখন কতটা জরুরি।
গত ৪০ বছরে বাংলাদেশ অধ্যয়ন বেশ বিকশিত হয়েছে। এটি ছড়িয়ে পড়েছে বহুমাত্রিক দিকে। দারুণ সব নতুন সংযোগের একটি নিবিড় বলয় তৈরি হয়েছে এতে। এটি এখন বেশ প্রাণবন্ত ও দ্রুত বিকাশ লাভ করছে। তবে এর মধ্যে নিঃসন্দেহে আরও বেশি সমন্বয় ও সুনির্দিষ্ট গবেষণাধর্মী বিতর্কের সুযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিসরে এর আরও বেশি প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি প্রয়োজন। এটি হয়তো খুব শিগগিরই ঘটবে। আর তা হলে আমাদের বর্তমান সীমাবদ্ধতাগুলো কাটিয়ে ওঠা সহজ হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশ অধ্যয়নে সামাজিক পরিবর্তনের যেসব দিক এখনো যথাযথ মনোযোগ পায়নি, সেগুলোও আমরা আরও গভীরভাবে অনুসন্ধান করতে পারব।
টিকা
[১] এ ধরনের উদ্যোগের একটি সাম্প্রতিক উদাহরণ হলো রাজগিরে (বিহার) নতুন প্রতিষ্ঠিত এবং বিপুল তহবিলপ্রাপ্ত নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে শীর্ষস্থানীয় অনাবাসী ভারতীয় শিক্ষাবিদদের যুক্ত হওয়া।
[২] উদাহরণস্বরূপ, ইউনিভার্সিটি অব বাথ (যুক্তরাজ্য), সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ (কোপেনহেগেন, ডেনমার্ক) এবং ক্রিশ্চিয়ান মাইকেলসেন ইনস্টিটিউট (বার্গেন, নরওয়ে)—এগুলো সবই একসময় বাংলাদেশ নিয়ে কাজ করা গবেষক দলগুলোর আতিথ্য দিয়েছে। আর নব্বইয়ের দশকে ‘ইউরোপিয়ান নেটওয়ার্ক অব বাংলাদেশ স্টাডিজ’ বেশ কয়েকটি সম্মেলনের আয়োজন করেছিল।
লেখক পরিচিতি
ড. উইলেম ফন শেনডেল হলেন নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ ও নৃবিজ্ঞানী। বাংলাদেশ নিয়ে তার লেখা উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘আ হিস্ট্রি অব বাংলাদেশ’ (২০০৯), ‘রিভাইভিং আ রুরাল ইন্ডাস্ট্রি: সিল্ক প্রডিউসারস অ্যান্ড অফিশিয়ালস ইন ইন্ডিয়া অ্যান্ড বাংলাদেশ, ১৮৮০স টু ১৯৮০স’ (১৯৯৬) এবং ‘গ্লোবাল ব্লু: ইন্ডিগো অ্যান্ড এসপায়োনেজ ইন কলোনিয়াল বেঙ্গল’ (২০০৬; সহলেখক: পিয়ের পল দারাক)।
(এই প্রবন্ধটি ২০১৪ সালে ‘সাউথ এশিয়া ক্রনিকল’-এর ৪র্থ সংখ্যায় প্রথম প্রকাশিত হয়।)
.png)








