Advertisement

কাফরুলে হত্যাকাণ্ড/যুবদল নেতা হত্যায় ২৫ লাখ টাকায় ভাড়া করা হয় চার শুটার

এশিয়া পোস্ট প্রতিবেদক
যুবদল নেতা হত্যায় ২৫ লাখ টাকায় ভাড়া করা হয় চার শুটার
যুবদলকর্মী মো. ইউসুফ হত্যার ঘটনায় জড়িত সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ছবি: ডিবি

রাজধানীর কাফরুলে যুবদলকর্মী মো. ইউসুফ হত্যাকাণ্ড ছিল পূর্বপরিকল্পিত। তবে নিহত ইউসুফ হামলাকারীদের মূল টার্গেট ছিলেন না। প্রতিপক্ষ কাফরুল থানা যুবদলের সদস্যসচিব হাফিজুল ইসলাম বাবুকে হত্যার উদ্দেশ্যে ভাড়াটে খুনি এনে কয়েক দফা পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

ডিবির দাবি, কিন্তু ঘটনার রাতে সন্দেহভাজনদের পরিচয় জানতে চাওয়া ও তল্লাশির চেষ্টাকে কেন্দ্র করে গুলি ছোড়া হলে বুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান যুবদলকর্মী ইউসুফ।

এ ঘটনায় জড়িত সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও কাফরুল থানা পুলিশ।

সোমবার (২৭ জুলাই) দুপুরে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম এসব তথ্য জানান।

তিনি বলেন, হত্যাকাণ্ডের পেছনে সুপরিকল্পিত একটি চক্র কাজ করেছে। মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে উঠে এসেছে হাফিজুর রহমান হাফিজ ওরফে ‘সিএনজি হাফিজ’-এর নাম। তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। এছাড়া হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- মো. নাহিদ হাসান (২১), মো. শাফিন আহমেদ (২২), মো. জিয়ারুল মোল্লা (৩৯), মো. আলী হোসেন (৪৫), মো. জিহাদ মোল্লা (৩০), মো. মাসুম বিল্লাহ (২৮) ও মো. আবির হাওলাদার (২৫)।

ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ডিবি জানায়, গত ২৪ জুলাই রাত ১১টা ১০ মিনিটের দিকে কাফরুল থানার ওপেক্স গার্মেন্টসের দক্ষিণ পাশের লিংক রোড এলাকায় অস্ত্রধারীদের গুলিতে যুবদলকর্মী ইউসুফ, সবজি বিক্রেতা নালাম সরদার ও মনির হোসেন গুলিবিদ্ধ হন। স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক ইউসুফকে মৃত ঘোষণা করেন। অপর দুইজন এখনও চিকিৎসাধীন।

ঘটনার পর পালিয়ে যাওয়ার সময় স্থানীয় জনতা এক সন্ত্রাসীকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। তার কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল ও চার রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। পরে নিহত ইউসুফের বড় ভাই বাদী হয়ে কাফরুল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।

এক মাস ধরে চলছিল হত্যার ছক

সংবাদ সম্মেলনে ডিবি জানায়, হত্যার পরিকল্পনা শুরু হয় প্রায় এক মাস আগে। গত ২৯ জুন মাগুরাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে কয়েকজন পেশাদার খুনি ঢাকায় আসে। তারা সিএনজি হাফিজের সঙ্গে বৈঠক করে এবং মিরপুর-১০ এলাকার একটি আবাসিক হোটেলে ওঠে।

পরে হাফিজের গ্যারেজে বৈঠকের সময় আবির হাওলাদারের কাছ থেকে আনা দুটি পিস্তলে গুলি ভরার সময় একটি অস্ত্র থেকে আকস্মিক মিসফায়ার হয়। এতে সেদিনের পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। তবে অভিযুক্তরা লক্ষ্যব্যক্তি হাফিজুল ইসলাম বাবুর অফিস, চলাফেরা ও অবস্থান সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে এবং অগ্রিম ৫০ হাজার টাকা নিয়ে ফিরে যায়।

দ্বিতীয় দফায় ঢাকায় এসে শেষ প্রস্তুতি

ডিবির তদন্তে জানা গেছে, ২২ জুলাই আবারও ঢাকায় আসে ভাড়াটে খুনিরা। তারা মিরপুর-২ এলাকার একটি হোটেলে অবস্থান নেয়। পরদিন সন্ধ্যায় সবাই সিএনজি হাফিজের গ্যারেজে একত্রিত হয়।

সেখানে নাহিদের কাছ থেকে জিহাদ দুটি লোড করা পিস্তল গ্রহণ করে। পরে একটি জিয়ারুল এবং অন্যটি চঞ্চল নামে আরেক সহযোগীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর তারা বাবুর অফিসের সামনে অবস্থান নেয়।

তদন্তে উঠে এসেছে, শাফিন আহমেদ ও আলী হোসেনের দায়িত্ব ছিল রেকি করা, টার্গেটের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ, হামলাকারীদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া এবং পুলিশের তৎপরতা সম্পর্কে তথ্য সরবরাহ করা।

সন্দেহ ও তল্লাশি, অতঃপর গুলি

ডিবির ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার রাতে হাফিজুল ইসলাম বাবু তার কার্যালয়ের সামনে নেতা-কর্মীদের সঙ্গে অবস্থান করছিলেন। এ সময় আশপাশে ঘোরাফেরা করা কয়েকজন অপরিচিত ব্যক্তিকে দেখে সন্দেহ হয় তার। তিনি তাদের পরিচয় জানতে চান এবং একপর্যায়ে তল্লাশির চেষ্টা করেন।

এ অবস্থায় অভিযুক্তদের একজন অস্ত্র বের করে গুলি চালায়। মুহূর্তেই এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। গুলি লাগে যুবদলকর্মী ইউসুফের বুকে। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

চার জেলা ঘিরে অভিযান

হত্যাকাণ্ডের পরপরই মাঠে নামে ডিবি মিরপুর বিভাগ ও কাফরুল থানা পুলিশ। প্রযুক্তিগত তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ এবং গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে মিরপুর, মাগুরা, শরীয়তপুর ও যশোরের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। অপর আসামি আবির হাওলাদারকে ঘটনাস্থলেই স্থানীয় জনতা আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করে।

ডিবি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া আরও কয়েকজন পলাতক রয়েছে। তাদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি অস্ত্রের উৎস, অর্থদাতা এবং পরিকল্পনার নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের বিষয়ে তদন্ত চলছে।

সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের একটি বড় অংশকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার এবং হত্যার নেপথ্যের পুরো নেটওয়ার্ক উন্মোচনে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।