Advertisement

ফেসবুকে ‘তান্ত্রিক’ সেজে প্রতারণা, পিবিআইয়ের চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ

এশিয়া পোস্ট প্রতিবেদক
ফেসবুকে ‘তান্ত্রিক’ সেজে প্রতারণা, পিবিআইয়ের চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ
গ্রেপ্তার তিন আসামি। ছবি: পিবিআই

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ‘তান্ত্রিক’ ও ‘কবিরাজ’ পরিচয়ে মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস, পারিবারিক সংকট ও কুসংস্কারকে পুঁজি করে চরম প্রতারণা চালিয়ে আসছিল একটি সংঘবদ্ধ চক্র। ভুক্তভোগীদের শরীরে রাসায়নিক কৌশলে ক্ষত সৃষ্টি করে তা ‘জ্বীনের আছর’ বা ‘অলৌকিক শক্তির প্রভাব’ বলে ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় করত তারা। অবশেষে এই চক্রটির রহস্য উন্মোচনের দাবি করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

সোমবার (২৭ জুলাই) সকাল সাড়ে ১১টায় রাজধানীর দক্ষিণ কল্যাণপুরে পিবিআই স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড অপারেশন (এসআইঅ্যান্ডও-উত্তর) কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য তুলে ধরেন বিশেষ পুলিশ সুপার মো. ফজলে এলাহী।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এ ঘটনায় জড়িত তিনজনকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা হলেন কুমিল্লার চান্দিনা এলাকার অহিদ মিয়া ওরফে কুয়েত (২৪), মাহে আলম (২৭) এবং নোয়াখালীর সুধারাম এলাকার মো. হাসান আলী (২০)। এদের মধ্যে দুজন আদালতে নিজেদের অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন।

যেভাবে শুরু হয় প্রতারণার তদন্ত

পিবিআই জানায়, রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকার এক নারী ফেসবুকে ‘রহমত আলী কবিরাজ’ নামের একটি আইডির মাধ্যমে কথিত এক তান্ত্রিকের সঙ্গে পরিচিত হন। স্বামীর পরকীয়া বন্ধ করার প্রলোভন দেখিয়ে প্রথমে তার কাছ থেকে ‘হাদিয়া’ বাবদ ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং পরে ‘জালালী কবুতর’ কেনার কথা বলে আরও ৩ হাজার ৫০০ টাকা হাতিয়ে নেয় চক্রটি।

পরে জ্বীনের মাধ্যমে সমস্যা স্থায়ী সমাধানের কথা বলে তাকে পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট ও রসালো মিষ্টি কিনে ইমু ভিডিও কলে তাদের দেওয়া নির্দেশ অনুযায়ী তা ব্যবহার করতে বলা হয়। সরল বিশ্বাসে নির্দেশ মানার পর রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে ওই নারীর হাতে মারাত্মক ক্ষত সৃষ্টি হয়।

হাতের সেই ক্ষত সারিয়ে দেওয়ার আশ্বাস এবং জ্বীনের ভয় দেখিয়ে বিভিন্ন ধাপে ওই নারীর কাছ থেকে সব মিলিয়ে ২১ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয় প্রতারকেরা। পরে গত ২১ জুন খিলক্ষেত থানায় সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর ২২(২) ধারায় মামলা দায়ের করা হলে পিবিআই এসআইঅ্যান্ডও (উত্তর) মামলার তদন্তভার গ্রহণ করে।

ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণে আসামিদের সন্ধান

তদন্তকারী কর্মকর্তারা ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট, মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক ট্র্যাকিং, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যক্রম এবং আর্থিক লেনদেন বিশ্লেষণ করে চক্রের সদস্যদের সুনির্দিষ্ট অবস্থান শনাক্ত করেন।

এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৪ জুলাই কুমিল্লার চান্দিনা ও নোয়াখালীর সুধারামে আলাদা অভিযান চালিয়ে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত একাধিক মোবাইল ফোন ও সিম কার্ড জব্দ করে পিবিআই। গ্রেপ্তার অহিদ মিয়া এবং মো. হাসান আলী আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে ভুয়া কবিরাজের ফাঁদ

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, চক্রটি ‘রহমত আলী কবিরাজ’, ‘হোসেন কবিরাজ’, ‘আসমা কবিরাজ’ এবং ‘তান্ত্রিক কবিরাজ’সহ হরেক নামে ভুয়া ফেসবুক আইডি ও ইমু অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করে আসছিল।

এসব পেজ ও আইডি থেকে মূলত পারিবারিক ও ব্যক্তিগত সমস্যায় পড়া নারীদের টার্গেট করা হতো। প্রথমে ভুয়া আশ্বাসে আস্থা অর্জন, এরপর কৌশলে পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট ও মিষ্টিজাতীয় পদার্থের সংমিশ্রণে কায়দা করে শরীরে তীব্র ক্ষত সৃষ্টি করা হতো। সেই ক্ষতকে ‘জ্বীনের আছর’ বা ‘অলৌকিক ঘটনা’ সাজিয়ে তা ভালো করে দেওয়ার নামে লাখ লাখ টাকা দাবি করত এই প্রতারক দল।

ভারতে নেটওয়ার্ক বিস্তার ও হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাচার

পিবিআইর তদন্তে দেখা গেছে, চক্রটির কার্যক্রম কেবল বাংলাদেশে সীমাবদ্ধ ছিল না। ভারতেও একই কৌশলে ভুয়া পেজ চালিয়ে ভারতীয় মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করা হতো। সেখানে ‘গুগল পে’-এর মাধ্যমে টাকা নিয়ে পরে হুন্ডির মাধ্যমে তা বাংলাদেশে আনা হতো। এ ছাড়া বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাতে তারা নিয়মিত ফেসবুক পেজে পেইড বুস্টিং বা বিজ্ঞাপনও ব্যবহার করত।

বার্ন ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অন্তত ২০০ ভুক্তভোগী

সংবাদ সম্মেলনে পিবিআই কর্মকর্তা ফজলে এলাহী জানান, জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে গত কয়েক মাসে একই ধরনের কেমিক্যাল বান বা ক্ষত নিয়ে অন্তত ২০০ জন চিকিৎসা নিয়েছেন। লজ্জা বা কুসংস্কারের কারণে অনেকেই মুখ না খোলায় প্রকৃত ভুক্তভোগীর সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পিবিআইর কঠোর সতর্কবার্তা

বিশেষ পুলিশ সুপার মো. ফজলে এলাহী বলেন, ‘প্রযুক্তির অপব্যবহার করে ধর্মীয় বিশ্বাস ও কুসংস্কারকে কাজে লাগিয়ে প্রতারণা করা চক্রের বিরুদ্ধে পিবিআই জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। ইন্টারনেটে ছড়িয়ে থাকা এসব ভূয়া কবিরাজ বা তান্ত্রিকের প্রলোভনে কেউ যেন পা না দেন।’ তিনি প্রতারণার শিকার হলে সরাসরি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করার অনুরোধ জানান।