সীমান্তে মাদকচক্রের ভোলবদল, বাড়ছে নারী সম্পৃক্ততা

খান মাহমুদ আল রাফি, মেহেরপুর
সীমান্তে মাদকচক্রের ভোলবদল, বাড়ছে নারী সম্পৃক্ততা
প্রতীকী চিত্র। ছবি: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি

মেহেরপুর সীমান্তে মাদক পাচারের চিরচেনা চিত্রে এসেছে বড় ধরনের পরিবর্তন। একসময় যে সীমান্তে ফেনসিডিলের বড় বড় চালান ছিল নিয়মিত ঘটনা, সেখানে এখন জায়গা করে নিয়েছে নতুন ধরনের ভারতীয় নিষিদ্ধ সিরাপ। একই সঙ্গে বদলেছে পাচারের কৌশলও। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি ও অভিযানের কারণে বড় চালানের পরিবর্তে ছোট ছোট চালানে ঝুঁকছে মাদকচক্র। পাশাপাশি বাড়ছে নারী সম্পৃক্ততাও।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গত দেড় বছরের মাদকবিরোধী অভিযানের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের শুরু থেকে চলতি বছরের ২৬ জুন পর্যন্ত মেহেরপুর জেলায় মোট ২৮০টি মাদক মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালে মামলা ছিল ১৮১টি এবং ২০২৬ সালের ২৬ জুন পর্যন্ত হয়েছে ৯৯টি। এসব মামলায় মোট ৩৭৮ জন এজাহারভুক্ত আসামির মধ্যে ৩৪৫ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে মামলার সংখ্যা আনুপাতিক হারে কিছুটা বেড়েছে। মাসিক গড় হিসেবে মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬টির বেশি। একই সঙ্গে বেড়েছে গ্রেপ্তারের হারও। ২০২৫ সালে গ্রেপ্তারের হার ছিল ৮৮ দশমিক ৮ শতাংশ। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে তা বেড়ে হয়েছে ৯৬ দশমিক ১ শতাংশ।

মাদক উদ্ধারের তথ্যেও স্পষ্ট হয়েছে সীমান্তের পরিবর্তিত বাস্তবতা। এক সময় সীমান্তজুড়ে আধিপত্য বিস্তার করা ফেনসিডিলের উপস্থিতি এখন অনেকটাই কমে গেছে। ২০২৫ সালে ৫৮৫ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার হলেও চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে উদ্ধার হয়েছে মাত্র ২৮ বোতল।

তবে ফেনসিডিলের জায়গায় বাজারে প্রবেশ করেছে নতুন ধরনের ভারতীয় সিরাপ। এর মধ্যে এসকাফ, ফেয়ারডিল ও উইনসেরেক্স নামের সিরাপের উপস্থিতি লক্ষ করা যাচ্ছে। গত বছর এসব সিরাপ উদ্ধারের তালিকায় ছিল না।

হেরোইন উদ্ধারের পরিমাণেও এসেছে পরিবর্তন। ২০২৫ সালে জেলায় ২৯১ গ্রাম হেরোইন উদ্ধার করা হলেও চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে উদ্ধার হয়েছে মাত্র ৭৯ গ্রাম, যা গত বছরের মোট উদ্ধারের প্রায় ২৭ শতাংশ।

বিভিন্ন মাদক মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বড় চালানে মাদক পরিবহনের ঝুঁকি এড়াতে কৌশল বদলেছে কারবারিরা। এখন তারা ছোট ছোট চালানে মাদক পাচার করছে। এর বড় প্রমাণ পরিত্যক্ত মাদকের সংখ্যা কমে যাওয়া। ২০২৫ সালে ৫০ বোতল ফেনসিডিল পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া গেলেও চলতি বছরে এখন পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া সব মাদকই আসামিদের সরাসরি হেফাজত থেকে পাওয়া গেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে সীমান্তের ঝোপঝাড় বা নির্জন স্থানে মাদক ফেলে রাখার প্রবণতা কমেছে। পরিবর্তে শরীরের সঙ্গে বহন কিংবা গৃহস্থালি পণ্যের আড়ালে পরিবহনের কৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে।

এদিকে সীমান্ত এলাকায় মাদক পরিবহনে নারীদের ব্যবহারও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। গত বছর মেহেরপুর সদর, গাংনী ও মুজিবনগর এলাকায় সক্রিয় মাদকচক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত ৩১ জন নারী পুলিশ এবং জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভিযানে মাদকসহ গ্রেপ্তার হয়েছেন।

অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক দারিদ্র্যকে কাজে লাগিয়ে মূলহোতারা নিজেদের আড়ালে রেখে নারীদের ব্যবহার করছে বলে জানিয়েছেন কয়েকটি মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা।

পুলিশের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, গৃহস্থালি পণ্য বহন কিংবা শিশুদের সঙ্গে চলাচলের কারণে অনেক সময় তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সন্দেহের বাইরে থেকে যান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. লুবনা হক বলেন, গ্রামীণ সমাজের অর্থনৈতিক চাপ ও সামাজিক পরিবর্তনের কারণে নারীদের একটি অংশ অপরাধচক্রের ফাঁদে পড়ছে।

মেহেরপুরের মানবাধিকার কর্মী দিলারা জাহান এশিয়া পোস্টকে বলেন, মেহেরপুর সীমান্তের পরিবর্তিত এই চিত্র শুধু মামলার পরিসংখ্যান নয়। এটি সীমান্তভিত্তিক অপরাধের একটি নতুন ও জটিল বাস্তবতা, যা মোকাবিলায় সামাজিক সচেতনতা ও আইন প্রয়োগ, দুই ক্ষেত্রেই নতুন কৌশল প্রয়োজন।

মেহেরপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য অ্যাডভোকেট মিজানুর রহমান বলেন, সম্প্রতি ফেনসিডিলের জায়গা দখল করে মাদকের বাজারে নতুন ধরনের ভারতীয় সিরাপ প্রবেশের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এর মধ্যে এসকাফ, ফেয়ারডিল ও উইনসেরেক্স নামের সিরাপের উপস্থিতি লক্ষ করা যাচ্ছে। অতীতে এসব সিরাপ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উদ্ধার তালিকায় তেমন ছিল না এবং প্রচলিত আইন বা মাদকের সংজ্ঞায়ও এসবের স্পষ্ট উল্লেখ নেই। এতে আইনি ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে মাদক কারবারীরা নানা কৌশল অবলম্বন করছে এবং কিছু ক্ষেত্রে আদালতে বাড়তি সুবিধা পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। রাষ্ট্রের উচিত বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা এবং প্রয়োজন হলে সময়োপযোগী আইন ও বিধিমালার সংশোধন আনা।

চুয়াডাঙ্গা ব্যাটেলিয়নের (৬ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাজমুল হাসান এশিয়া পোস্টকে বলেন, সীমান্ত এলাকায় মাদক পাচারের কৌশলে পরিবর্তন এসেছে। বড় চালানের পরিবর্তে এখন ছোট ছোট চালানে মাদক আনার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সীমান্তে বিজিবির টহল, গোয়েন্দা নজরদারি ও প্রযুক্তিনির্ভর কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে। মাদক পাচার ও সংশ্লিষ্ট অপরাধ দমনে বিজিবি সর্বোচ্চ কঠোর অবস্থানে রয়েছে। সীমান্তকে নিরাপদ রাখতে স্থানীয় জনগণকেও তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়েছি আমরা।

মেহেরপুরের পুলিশ সুপার উজ্জ্বল কুমার রায় বলেন, মাদক কারবারিরা কৌশল পরিবর্তন করলেও জেলা পুলিশের গোয়েন্দা নজরদারি ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গ্রেপ্তারের হার বৃদ্ধি এবং সরাসরি মাদক উদ্ধার আমাদের অভিযানের কার্যকারিতার প্রতিফলন।

বিষয় :মেহেরপুর