এক মাস ধরে অচল নাকুগাঁও বন্দর, কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি

ভারতের মেঘালয় রাজ্যে টানা ভারী বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় শেরপুরের নালিতাবাড়ীর নাকুগাঁও স্থলবন্দরে প্রায় এক মাস ধরে বন্ধ রয়েছে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম। এতে কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে বন্দরকেন্দ্রিক সকল বাণিজ্যিক কার্যক্রম। ফলে লোড-আনলোড করতে না পেরে হাজারো শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন, বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। আর কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মেঘালয়ের পশ্চিম গারো হিলস ও দক্ষিণ গারো হিলস জেলার ডালু-মহেন্দ্রগঞ্জ-গারোবাধা-তুরা এবং ডালু-তুরা সড়কের বিভিন্ন অংশে সম্প্রতি ভূমিধস ও পাহাড়ি ঢলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। অনেক স্থানে সড়কের ওপর মাটি ধসে পড়ায় যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। ফলে নাকুগাঁও স্থলবন্দরে পণ্যবাহী ট্রাকের প্রবেশও বন্ধ রয়েছে। প্রতিদিন যেসব ট্রাকে পাথর ও কয়লা আসার কথা, সেগুলো দীর্ঘদিন ধরে না আসায় বন্দরে এখন সুনসান নীরবতা। আমদানিকারক, রপ্তানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন দিনমজুর শ্রমিকরা।
সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন শ্রমিকরা
শ্রমিকরা জানান, আমদানি বন্ধ থাকায় তাদের আয়-রোজগারের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। লোড-আনলোড ও পাথর ভাঙার কাজের ওপর নির্ভরশীল হাজারো শ্রমিক এখন বেকার। দীর্ঘদিন কাজ না থাকায় অনেকেই ধারদেনা করে কোনোমতে সংসার চালাচ্ছেন।
বন্দরের শ্রমিক তোফাজ্জাল হোসেন বলেন, ‘বন্দরে পাথর ওঠানো-নামানো আর ভাঙার কাজ কইরাই আমার সংসার চলে। কিন্তু এক মাস ধইরা পাথর আসা বন্ধ, তাই কোনো কামও নাই। ঘরে বসে থাকতে হচ্ছে। জমানো টাকা শেষ, এখন ধার করে কোনোমতে সংসার চালাইতেছি।’

আরেক শ্রমিক নাজমা বেগম বলেন, ‘আমার স্বামী ও আমি বন্দরে কামকাজ কইরা সংসার চালাই। পাথর না আসায় অনেক দিন ধইরা কোনো ইনকাম নাই। ঘরের বাজার-খরচ চালানো মেলা কঠিন হইয়া গেছে।’
ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ ও রাজস্ব ক্ষতি
ব্যবসায়ীরা জানান, দীর্ঘদিন আমদানি বন্ধ থাকায় বন্দরের ব্যবসায়িক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে এবং সরকারের রাজস্ব আদায় মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক করা না গেলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে।
ব্যবসায়ী শরিফুর রহমান বলেন, ‘পাথর আমদানি বন্ধ থাকায় বন্দরের সব ধরনের ব্যবসায়িক কার্যক্রমে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। শ্রমিক থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী সবাই ক্ষতির মুখে। দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক করে আমদানি চালুর ব্যবস্থা করা দরকার।’
নাকুগাঁও স্থলবন্দরের আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান মুকুল বলেন, ‘প্রায় এক মাস ধরে পাথর আমদানি বন্ধ থাকায় ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। আমি বারবার যোগাযোগ করে জেনেছি, নতুন করে ভারী বৃষ্টি বা পাহাড়ি ঢল না হলে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সড়ক সংস্কার শেষ হতে পারে। সে ক্ষেত্রে আমদানি কার্যক্রমও স্বাভাবিক হওয়ার আশা রয়েছে।’
ভুটানের বিকল্প রুট ও বন্দরের বর্তমান চিত্র
নাকুগাঁও স্থলবন্দরের সহকারী পরিচালক জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘ভারতের অংশে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পাথর বা কয়লাবাহী কোনো ট্রাক বন্দরে প্রবেশ করতে পারেনি। তবে, গত তিন দিন আগে বিকল্প সড়ক ব্যবহার করে বিশেষ ব্যবস্থায় ভুটান থেকে একটি পাথরবাহী ট্রাক বন্দরে এসেছে। আশা করছি, ভারী বৃষ্টিপাত না হলে দ্রুতই সড়ক সংস্কার শেষ হবে এবং আগের মতো যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হবে।’
১৯৯৭ সালে নালিতাবাড়ী উপজেলায় নাকুগাঁও শুল্ক বন্দরের কার্যক্রম শুরু হলেও ২০০২ সালে কয়লা ও পাথর ছাড়া সব পণ্য আমদানি বন্ধ হয়ে যায়। পরে ২০০৯ সালে এটি পূর্ণাঙ্গ বন্দর হিসেবে ঘোষণা পায় এবং ২০১৫ সালে স্থলবন্দরের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। বর্তমানে ২১টি পণ্য আমদানির অনুমোদন থাকলেও কার্যত শুধু পাথরই আমদানি হচ্ছে; মাঝে মধ্যে কয়লা আনেন ব্যবসায়ীরা। চলতি অর্থবছরে নাকুগাঁও স্থলবন্দর দিয়ে ১ লাখ ৯৪ হাজার ৬১৪ টন পাথর বাংলাদেশে আমদানি হয়েছে। এ থেকে কাস্টমস বিভাগ ৭ কোটি ৩৪ লাখ ৯১ হাজার ৭৯১ টাকা এবং বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ ৩ কোটি ৫৫ লাখ ৮৭ হাজার ১৬৮ টাকা ট্যারিফ আদায় করেছে।
.png)






