Advertisement

স্বর্ণ অক্ষত কিন্তু গায়েব মোবাইল, লক্ষ্মীপুরে চার হত্যাকাণ্ডে নতুন রহস্য

আতোয়ার রহমান মনির, লক্ষ্মীপুর
স্বর্ণ অক্ষত কিন্তু গায়েব মোবাইল, লক্ষ্মীপুরে চার হত্যাকাণ্ডে নতুন রহস্য
মা ও তিন বোনের সঙ্গে সিফাত। ছবি : সংগৃহীত

লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে মা ও তিন বোন হত্যার এক মাস পেরিয়ে গেলেও এখনও উন্মোচিত হয়নি চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য। সন্দেহভাজন অন্তর মজুমদার একাই এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন, নাকি এর সঙ্গে আরও কেউ জড়িত ছিল—তা নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ। তদন্তে ইতিমধ্যে উঠে এসেছে, সন্দেহভাজন ব্যক্তি ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে এলাকায় বসবাস করতেন।

এদিকে এক মাসেও হত্যারহস্য উদ্ঘাটন না হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। দ্রুত তদন্ত শেষ করে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

তালাবদ্ধ ঘরের সামনে সিফাতের অপেক্ষা

রায়পুর পৌরসভার ধানহাটা এলাকার নদীপাড়ের সেই ভাড়া বাসাটি এখনও তালাবদ্ধ। মাঝেমধ্যে ১৬ বছর বয়সি জুনায়েদ ইসলাম সিফাত এসে দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে। তার চোখে যেন খুঁজে ফেরে পরিচিত মুখগুলো—মা শাহিনুর বেগম এবং তিন বোন সায়মা, ইকরা ও শিফাকে। এক মাস আগে এই ঘরেই নৃশংসভাবে হত্যার শিকার হন তার মা ও তিন বোন। মুহূর্তেই নিঃশেষ হয়ে যায় একটি পরিবার। শুধু বেঁচে যায় সিফাত, কারণ ঘটনার সময় সে কর্মস্থলে ছিল।

বিচারে দাবিতে মানববন্ধন। ছবি : সংগৃহীত
বিচারে দাবিতে মানববন্ধন। ছবি : সংগৃহীত

এখনও সিফাতের মনে একটাই প্রশ্ন—কেন হত্যা করা হলো তার মা ও তিন বোনকে? হত্যার পেছনে কী ছিল উদ্দেশ্য? এ ঘটনার সঙ্গে কি শুধু একজনই জড়িত, নাকি আরও কেউ রয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অমীমাংসিত।

ভুয়া পরিচয়ে এলাকায় ছিলেন অন্তর

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সন্দেহভাজন অন্তর মজুমদার ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে দীর্ঘদিন রায়পুরে বসবাস করেন। প্রায় দেড় বছর আগে তিনি ‘অন্তর মিয়াজী’ পরিচয়ে একই ভবনে একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, তিনি এক নারীকে স্ত্রী পরিচয়ে সেখানে রাখতেন। পরে তার পরিচয় নিয়ে সন্দেহ তৈরি হলে তিনি বাসা ছেড়ে দেন। তার ব্যবহৃত জাতীয় পরিচয়পত্র বর্তমানে পুলিশের হেফাজতে রয়েছে।

অন্তর মজুমদারের ভুয়া আইডি কার্ড ও জন্ম সনদ। ছবি : সংগৃহীত
অন্তর মজুমদারের ভুয়া আইডি কার্ড ও জন্ম সনদ। ছবি : সংগৃহীত

গত ২৫ জুন বেলা ১১টার দিকে রায়পুর পৌরসভার ধানহাটা এলাকার ওই ভাড়া বাসা থেকে শাহিনুর বেগম, তার মেয়ে সায়মা ও শিফার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় ইকরাকে। পরে ঢাকায় নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। ঘটনার পর স্থানীয়রা সন্দেহভাজন অন্তর মজুমদারকে আটক করে গণপিটুনি দেয়। পরে হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। অন্তর নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার বাসিন্দা ছিলেন। পুলিশ জানিয়েছে, তিনি রায়পুরে ফেরি করে ফল বিক্রি করতেন।

তদন্তে যেসব প্রশ্ন

পুলিশ জানিয়েছে, মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড, সিসি ক্যামেরার ফুটেজ, ফরেনসিক আলামতসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। শুরুতে হত্যাকাণ্ডের পেছনে লুটপাটের উদ্দেশ্যের কথা বলা হলেও পরে বাসা থেকে স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা উদ্ধার হয়। তবে পরিবারের ব্যবহৃত দুটি মোবাইল ফোন কেন সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল, সেটি এখনো তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

অন্তর মজুমদার। ছবি : সংগৃহীত
অন্তর মজুমদার। ছবি : সংগৃহীত

স্থানীয়দের প্রশ্ন, অন্তর মজুমদার একাই কি চারজনকে হত্যা করেছেন, নাকি এর সঙ্গে আরও কেউ জড়িত ছিল?

২০১৯ সালে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান সিফাতের বাবা কামাল উদ্দিন। এরপর চার সন্তানকে নিয়ে সংগ্রামের জীবন শুরু করেন শাহিনুর বেগম। অভাব থাকলেও ভালোবাসার কমতি ছিল না। মায়ের স্বপ্ন ছিল সন্তানদের পড়াশোনা করিয়ে মানুষ করা। বাবার মৃত্যুর পর সংসারের দায়িত্ব ভাগ করে নিয়েছিল সিফাতও। একাদশ শ্রেণিতে পড়ার পাশাপাশি কাজ করত সে। নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি মা ও তিন বোনের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন ছিল তার। কিন্তু এক মুহূর্তে বদলে যায় সব। এখন পৃথিবীতে কার্যত একাই সিফাত।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে চায় সিফাত

সিফাত জানায়, তার এখন দুটি চাওয়া। প্রথমত, মা ও তিন বোন হত্যার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন এবং জড়িতদের বিচার। দ্বিতীয়ত, একবারের জন্য হলেও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করা। সিফাত বলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে কোনো টাকা চাই না। আমি শুধু চাই তিনি আমার মাথায় একবার হাত রাখুন। আমি যেন মনে করি, আমারও একজন অভিভাবক আছেন। আর যারা আমার মা ও তিন বোনকে হত্যা করেছে, তাদের বিচার যেন হয়।’

লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য আবুল খায়ের ভূঁইয়া বলেন, ‘এই হত্যাকাণ্ড উদ্দেশ্য ছাড়া হয়নি। এর পেছনে অবশ্যই কোনো কারণ রয়েছে। সেই উদ্দেশ্য কী এবং কারা জড়িত, তা দ্রুত উদ্ঘাটন করতে হবে। আমি চাই পুলিশ প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনুক।’

রায়পুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নিজাম উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, ‘তদন্তের সব দিক গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। বিভিন্ন প্রযুক্তিগত আলামত বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। হত্যার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন, জড়িতদের শনাক্ত এবং আইনের আওতায় আনতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে।’