Advertisement

বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য অপসারণ স্থগিত

এশিয়া পোস্ট নিউজ, ঝিনাইদহ
বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য অপসারণ স্থগিত
ঝিনাইদহ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকা থেকে অপসারণ করা হচ্ছে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান চত্বর। ছবি : এশিয়া পোস্ট

ঝিনাইদহ শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকার চৌরাস্তায় নির্মিত বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য অপসারণকে কেন্দ্র করে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাস্কর্য ভাঙার ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে নিন্দা, ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা, বিশিষ্টজনসহ সাধারণ মানুষ।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার থেকে ধাপে ধাপে ভাস্কর্যটি অপসারণের কাজ শুরু হয়। শুক্রবার বিকেল নাগাদ প্রায় সাড়ে ৬ ফুট উচ্চতার ভাস্কর্যটির অধিকাংশ অংশই ভেঙে ফেলা হয়। এ ঘটনায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও জাতীয় ইতিহাসের প্রতি সম্মান রক্ষার প্রশ্নে নানা মহলে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ঝিনাইদহ শহরের প্রবেশমুখে কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালসংলগ্ন চৌরাস্তার মোড়ে ২০১৪ সালে ঝিনাইদহ পৌরসভার অর্থায়নে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৩২ লাখ টাকা। ২০১৬ সালে নির্মাণকাজ প্রায় শেষ হলেও আনুষ্ঠানিকভাবে এর উদ্বোধন করা হয়নি। দীর্ঘদিন ভাস্কর্যটি অযত্ন ও অবহেলায় পড়ে ছিল। স্থানীয়দের দাবি, যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এটি ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল।

এদিকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কয়েক দফা ভাস্কর্যটিতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। সর্বশেষ চলতি সপ্তাহে প্রশাসনিক তত্ত্বাবধানে ভাস্কর্যটি অপসারণের কাজ শুরু হলে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে।

ঘটনাটি নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার কামালুজ্জামান। তিনি বলেন, শুধু একটি ভাস্কর্য ভাঙা হয়নি, মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাসকে মুছে ফেলার অপচেষ্টা হয়েছে। এ ঘটনায় আমরা গভীরভাবে মর্মাহত। রোববার জেলার বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে বৈঠক করে পরবর্তী কর্মসূচি নির্ধারণ করা হবে।

বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাতিজা হাফিজুর রহমান বলেন, এর চেয়ে দুঃখজনক ঘটনা আর হতে পারে না। যিনি দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন, জন্মভূমিতেই তার স্মৃতিচিহ্ন ভেঙে ফেলা হয়েছে। এটি শুধু আমাদের পরিবারের নয়, সমগ্র জাতির জন্য বেদনাদায়ক।

তবে এ বিষয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছে প্রশাসন। ঝিনাইদহ পৌরসভার প্রশাসক রথীন্দ্রনাথ রায় বলেন, লোকমুখে ভাস্কর্য ভাঙার বিষয়টি জেনেছি। এ বিষয়ে পৌরসভার কোনো কর্মকর্তা আমাকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করেননি।

ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক মো. নোমান হোসেন বলেন, জাতীয় মহাসড়কের উন্নয়নকাজের প্রয়োজনেই ভাস্কর্যটি অপসারণ করা হচ্ছে বলে জেনেছি। তবে বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা হওয়ায় আপাতত অপসারণের কাজ স্থগিত রাখা হয়েছে। আগামীকাল সংশ্লিষ্টদের নিয়ে সভা অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে আলোচনা করে উপযুক্ত স্থান নির্বাচনপূর্বক বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য পুনর্নির্মাণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

এদিকে ভাস্কর্যটি অপসারণের পদ্ধতি, পূর্বঘোষণা না থাকা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা না করায় প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরাও। তাদের মতে, জাতীয় বীরদের স্মৃতিবিজড়িত স্থাপনা স্থানান্তর বা পুনর্নির্মাণের প্রয়োজন হলে তা স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় এবং জনমতকে গুরুত্ব দিয়ে করা উচিত ছিল।

বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান ১৯৫৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার খোর্দ্দ খালিশপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একজন সাহসী সিপাহি ছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৮ অক্টোবর মৌলভীবাজারের ধলাই সীমান্তঘাঁটি দখলের যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখসমরে বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে শহীদ হন। মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য সাহসিকতা ও আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে দেশের সর্বোচ্চ বীরত্বসূচক খেতাব ‘বীরশ্রেষ্ঠ’–এ ভূষিত করা হয়। তার আত্মত্যাগ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।

বিষয় :ঝিনাইদহ