দারিদ্র্যে থেমেছিল নিজের স্বপ্ন, সব সঞ্চয়ে গড়েছেন বালিকা বিদ্যালয়

এশিয়া পোস্ট নিউজ, গোপালগঞ্জ
দারিদ্র্যে থেমেছিল নিজের স্বপ্ন, সব সঞ্চয়ে গড়েছেন বালিকা বিদ্যালয়
কুমারী রেখা রানী ও তার স্কুল। ছবি: এশিয়া পোস্ট

দারিদ্র্য ও সামাজিক বাস্তবতায় শৈশবে নিজের পড়ার স্বপ্ন মাঝপথেই থমকে গিয়েছিল; কিন্তু শিক্ষার সেই আকুলতা হারিয়ে যায়নি মন থেকে। নিজের অপূর্ণ স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দিতে বিয়ের পিঁড়িতে না বসে, নার্সিং পেশার সারাজীবনের সব সঞ্চয় বিলিয়ে গ্রামের মেয়েদের জন্য গড়ে তুলেছেন বালিকা বিদ্যালয়।

Advertisement

গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার বুড়ুয়া গ্রামের ৮৫ বছর বয়সী কুমারী রেখা রানীর এই আত্মত্যাগ ও একক লড়াইয়ে আজ শত শত মেয়ে দেখছে আলোর মুখ।

১৯৪১ সালে এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া রেখা রানী ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে মাধ্যমিকের আগেই তার শিক্ষাজীবন থেমে যায়। বাবা অল্প বয়সে বিয়ে দিতে চাইলেও তিনি তাতে রাজি হননি। কখনও আত্মীয়ের বাড়িতে থেকে, কখনও নিজের চেষ্টায় পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত বাস্তবতার কাছে হার মানতে হয় তাকে। পরে নার্সিং প্রশিক্ষণ নিয়ে স্বাস্থ্যসেবাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে দীর্ঘদিন নার্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করে মানুষের সেবা করেন। ২০১৩ সালে সরকারি চাকরি থেকে অবসরে যান।

অবসরের পর নিজের ভবিষ্যৎ না ভেবে গ্রামের দরিদ্র মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ দিতে নিজের সারাজীবনের সঞ্চয় দিয়ে জমি কিনে ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেন কুমারী রেখা রানী গার্লস হাই স্কুল। শুরুতে একটি টিনশেড ঘরে মাত্র একজন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু হয় বিদ্যালয়টির। ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। পরে সরকারি অর্থায়নে নির্মিত হয় চারতলা একাডেমিক ভবন।

এ পর্যন্ত বিদ্যালয়টি থেকে তিনটি ব্যাচ এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। বর্তমানে অনেক শিক্ষার্থী দেশের বিভিন্ন স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছে। তবে বিদ্যালয়টি এখনও এমপিওভুক্ত হয়নি। ফলে শিক্ষক-কর্মচারীদের নিয়মিত বেতন দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা লিপিকা হালদার বলেন, শিক্ষকরা নিয়মিত বেতন না পাওয়ায় অনেক অভিভাবক বিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেন। এ কারণে কেউ কেউ তাদের সন্তানদের অন্য স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিচ্ছেন।

স্থানীয়রা জানান, রেখা রানী নিজের সারাজীবনের সঞ্চয় দিয়ে এই স্কুল গড়েছেন। এখন এমপিওভুক্ত না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকার দ্রুত উদ্যোগ নিলে হাজারো মেয়ের শিক্ষার পথ উন্মুক্ত থাকবে।

জানা গেছে, কয়েক বছর আগে রেখা রানীর ক্যানসার ধরা পড়ে। চিকিৎসার জন্য ভারতে যেতে হয়। চিকিৎসা ব্যয়ে শেষ হয়ে যায় তার সঞ্চিত প্রায় সব অর্থ। ফলে বিদ্যালয়ের ব্যয়ভার বহন করা এখন তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই মৃত্যুর আগে তার একটাই ইচ্ছা—নিজের হাতে গড়া বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত হোক।

রেখা রানী বলেন, আমি বাবার টাকায় পড়াশোনা করিনি। বাবা আমাকে পড়াতে চাইতেন না, ছোটবেলায় বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম বিয়ে করব না, পড়াশোনা করব। নিজের সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পারিনি বলেই গ্রামের মেয়েদের জন্য এই স্কুল করেছি।

তিনি বলেন, নারী শিক্ষার উন্নয়নের জন্য আমি জীবনের সর্বস্ব দিয়ে কাজ করেছি। সরকারের কাছে আমার একটাই অনুরোধ—মৃত্যুর আগে যেন আমার স্কুলটিকে এমপিওভুক্ত হতে দেখে যেতে পারি।