জলাবদ্ধতায় অতিষ্ঠ জামালপুরবাসী

জামালপুর পৌর শহরে জলাবদ্ধতা এখন স্থায়ী নাগরিক সংকটে পরিণত হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে একই সমস্যায় ভুগছেন নগরবাসী। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, দাবি-দাওয়া, আবেদন কিংবা অভিযোগে কাজ না হলেও আন্দোলনে নামলেই নড়েচড়ে বসে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। আন্দোলনের পর কিছুটা সমাধানও হয়। ফলে জলাবদ্ধতা নিরসনের দাবিতে গত দুই মাসে সড়ক ও রেলপথ অবরোধের মতো কর্মসূচিও পালন করতে হয়েছে ভুক্তভোগীদের।
পৌরসভার বাইপাস, গেটপাড়, ফকিরপাড়া, চন্দ্রা, হাটচন্দ্রা, মনিরাজপুর, শেখেরভিটা, পলাশতলা, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প এলাকা, পৌর কবরস্থান ও সীমান্তরক্ষী বাহিনী ক্যাম্পসংলগ্ন সড়কসহ বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টির পর পানি জমে থাকছে দীর্ঘ সময়। কোথাও হাঁটুসমান, কোথাও কোমরসমান পানি জমে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত, ব্যবসা-বাণিজ্য, কার্যালয়গামী মানুষের চলাচল এবং জরুরি সেবাও এতে ব্যাহত হচ্ছে।
জলাবদ্ধতা নিরসনের দাবিতে চলতি বছরের ৩ মে শেখেরভিটা এলাকায় রেলপথ অবরোধ করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। প্রায় ৪০ মিনিট দেওয়ানগঞ্জ থেকে ঢাকাগামী একটি লোকাল ট্রেন আটকে রেখে বিক্ষোভ করেন তারা। পরে প্রশাসনের আশ্বাসে কর্মসূচি প্রত্যাহার করা হয়।
এরপর ২৪ ও ২৫ মে দাপুনিয়া, জঙ্গলপাড়া, দড়িপাড়া, পূর্ব ফুলবাড়ীয়া, শাহাপুর ও ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প এলাকার বাসিন্দারা জামালপুর-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করেন। তাদের অভিযোগ ছিল, দীর্ঘ ১৯ বছর ধরে জলাবদ্ধতার কারণে ফসলি জমি ও বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ওই অবরোধে মহাসড়কের প্রায় এক কিলোমিটার এলাকায় যানজটের সৃষ্টি হয়।

সবশেষ গত ৯ জুলাই গেটপাড় এলাকায় জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানের দাবিতে শতাধিক নারী-পুরুষ সড়ক ও রেলপথ অবরোধ করেন। কয়েক ঘণ্টা বন্ধ থাকে ট্রেন চলাচল। আন্দোলনের মধ্যেই মাগরিবের নামাজের সময় হলে রেললাইনের ওপর জামাতে নামাজ আদায় করেন আন্দোলনকারীরা। পরে প্রশাসনের আশ্বাসে কর্মসূচি প্রত্যাহার করা হয়।
এই সবগুলো আন্দোলনের পর সেই এলাকায় পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করার জন্য ছুটে যায় পৌর কর্তৃপক্ষ। স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রশ্ন, সমস্যার সমাধানে যদি আন্দোলনই একমাত্র উপায় হয়, তাহলে নিয়মিত প্রশাসনিক তদারকি ও পরিকল্পনার প্রয়োজন কোথায়।
গেটপাড় এলাকার বাসিন্দা রাব্বি হোসেন বলেন, বৃষ্টি হলেই পুরো এলাকা পানির নিচে চলে যায়। রেললাইন পর্যন্ত ডুবে যায়। এটা জামালপুর শহরের একদম প্রধান কেন্দ্র, এখানেও পানি। বছরের পর বছর একই অবস্থা চলছে। আন্দোলন করার পর সবাই আসে, আশ্বাস দেয়। কিন্তু স্থায়ী সমাধান আর হয় না।
চন্দ্রা এলাকার বাসিন্দা সূচনা বলেন, জলাবদ্ধতার কারণে শিশু ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি কষ্টে থাকে। অনেক সময় ঘরে নর্দমার ময়লা পানি ঢুকে পড়ে। সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠানো যাচ্ছে না। রাস্তায় এক হাঁটু পানি। বিশুদ্ধ পানি পাওয়া যাচ্ছে না। রাস্তায় বের হলেই সাপ ও পোকামাকড়ের ভয় তো আছেই।
মানবাধিকারকর্মী জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, এটি শুধু অবকাঠামোগত সমস্যা নয়, পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনারও সমস্যা। খাল-নালা দখলমুক্ত করা, নর্দমা সংস্কার এবং নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম ছাড়া এ সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।
জামালপুর পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. হাফিজুর রহমান বলেন, অপরিকল্পিতভাবে মাটি ভরাট ও বাড়িঘর নির্মাণের কারণে স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। আনসার ক্যাম্প থেকে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর হয়ে ব্রহ্মপুত্র নদ পর্যন্ত একটি নর্দমা নির্মাণের কাজ চলছে। এটি শেষ হলে পৌরসভার বড় একটি অংশের জলাবদ্ধতা কমবে। পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে অন্যান্য এলাকার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থারও উন্নয়ন করা হবে।




