জেলা গঠনের ৪৫ বছরেও ডুবুরি দল পায়নি বান্দরবান

১৯৮১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে জেলা হিসেবে ঘোষণার পর দীর্ঘ ৪৫ বছর পেরিয়ে গেলেও একটি স্থায়ী ডুবুরি দল পায়নি পাহাড় ও নদীবেষ্টিত বান্দরবান। অথচ এই দীর্ঘ সময়ে জেলার বুক চিরে বয়ে চলা সাঙ্গু নদী, বিভিন্ন ঝরনা ও জলাশয়ে প্রতি বছরই অকালে ঝরছে বহু প্রাণ। স্থানীয়দের অভিযোগ, বান্দরবানে কোনো স্থায়ী ডুবুরি দল (টিম) না থাকায় নদীতে কেউ নিখোঁজ হলে উদ্ধার অভিযানের জন্য চট্টগ্রাম থেকে বিশেষায়িত দলের অপেক্ষা করতে হয়। এতে বিলম্বিত হয় উদ্ধারকাজ, বাড়ে প্রাণহানির আশঙ্কা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সাঙ্গু নদীসহ জেলার বিভিন্ন নদী, ঝরনা ও জলাশয়ে প্রতি বছরই অসচেতনতা ও তীব্র স্রোতের কারণে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। সম্প্রতি গত ২৫ এপ্রিল সদর উপজেলার কালাঘাটা এলাকায় মো. হোসাইন নামে এক যুবক নদীতে গোসল করতে নেমে তলিয়ে যান। স্থানীয়রা উদ্ধার করতে ব্যর্থ হওয়ার পর চট্টগ্রাম থেকে ডুবুরি দল এসে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে।
এর কিছুদিন পরই গত ২০ জুন সদর উপজেলার বালাঘাটা এলাকায় মো. আরিফিন (১১) নামে এক শিশু নদীর ঘাটে হাত-পা ধোয়ার সময় স্রোতে ভেসে যায়। স্থানীয় প্রশাসন ও বাসিন্দারা তাৎক্ষণিক চেষ্টা চালালেও দক্ষ ডুবুরির অভাবে কার্যকর অনুসন্ধান সম্ভব হয়নি। দুর্ঘটনার দুদিন পর অর্থাৎ ২২ জুন চট্টগ্রাম থেকে ডুবুরি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও দীর্ঘ চেষ্টার পর শিশুটিকে জীবিত বা মৃত কোনোভাবেই উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
বালাঘাটার বাসিন্দা মোহাম্মদ আবদুল কাদের বলেন, একটি জেলা শহরে ডুবুরি দল না থাকা খুবই হতাশাজনক। দুর্ঘটনার পর আমরা অসহায়ের মতো অপেক্ষা করি। স্থানীয়ভাবে উদ্ধার ব্যবস্থা থাকলে হয়তো অনেক জীবন বাঁচানো যেত।
কালাঘাটা এলাকার বাসিন্দা মো. নুরুল আলম বলেন, প্রতি বছর একই ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছে, কিন্তু স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। বাইরে থেকে দল আসতে অনেক সময় লেগে যায়, এতে উদ্ধার অভিযান ব্যাহত হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা মিনহাজ সাব্বির বলেন, ১৯৮১ সালে বান্দরবানকে আনুষ্ঠানিকভাবে জেলা হিসেবে ঘোষণা করা হলেও দীর্ঘ ৪৫ বছর পেরিয়ে আজও এই গুরুত্বপূর্ণ পার্বত্য জেলায় কোনো স্থায়ী ডুবুরি টিম গড়ে ওঠেনি। আশা করি, জননিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত বান্দরবানে একটি স্থায়ী ও আধুনিক ডুবুরি টিম গঠনের উদ্যোগ নেবে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, সাঙ্গু নদীসংলগ্ন এলাকায় হাজারো মানুষের বসবাস। বর্ষাকালে নদীর স্রোত আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে। তাই এখানে একটি আধুনিক উদ্ধার ও ডুবুরি ইউনিট গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
বান্দরবান সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মারুফা সুলতানা খান হীরামনি বলেন, বান্দরবানের মতো পাহাড়ি ও নদীবেষ্টিত এলাকায় ডুবুরি দল থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন সময় নদীতে দুর্ঘটনার পর আমাদের বাইরের সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হয়। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।
বান্দরবান সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শাহেদ পারভেজ বলেন, দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য স্থানীয় পর্যায়ে একটি ডুবুরি টিম থাকা প্রয়োজন। এমন ইউনিট গড়ে উঠলে উদ্ধার তৎপরতা আরও কার্যকর হবে।
বান্দরবান ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক আব্দুল মান্নান আনসারী বলেন, বান্দরবান একটি পর্যটনসমৃদ্ধ জেলা। এখানে অসংখ্য ঝরনা, গভীর কূপ, নদী ও জলাশয় রয়েছে। প্রতিবছর অনেক পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দা ঝরনা বা নদীতে নেমে দুর্ঘটনার শিকার হন। কিন্তু স্থায়ী ডুবুরি টিম না থাকায় আমরা দ্রুত উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করতে পারি না। তাই বান্দরবানে একটি প্রশিক্ষিত ডুবুরি টিম গঠন এখন অত্যন্ত জরুরি।





