স্বাভাবিক জীবনে বান্দরবানের পাহাড়িরা, নিজ ভিটায় ফিরেছে ২২১ পরিবার

কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) দীর্ঘদিনের সশস্ত্র তৎপরতায় অস্থির হয়ে ওঠা বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি জনপদে ধীরে ধীরে ফিরছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। নিরাপত্তা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, মানবিক সহায়তা, যোগাযোগব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং পুনর্বাসন কার্যক্রমের ফলে বাস্তুচ্যুত বম, ত্রিপুরা ও ম্রো সম্প্রদায়ের বহু পরিবার আবার নিজ গ্রামে ফিরে এসেছে।
সেনাবাহিনী সূত্রে জানা গেছে, এ পর্যন্ত বাস্তুচ্যুত ২২১টি পরিবারের ৫৩১ জন সদস্য নিজ গ্রামে ফিরে স্বাভাবিক জীবন শুরু করেছেন। একই সঙ্গে কেএনএফের সঙ্গে সম্পৃক্ত কয়েকজন সদস্য আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছেন বলেও জানানো হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, কেএনএফের সশস্ত্র তৎপরতার সময় দুর্গম এলাকার সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটিয়েছেন। নির্যাতন, ভয়ভীতি ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে বহু পরিবার নিজেদের বসতভিটা ছেড়ে বান্দরবান সদর, আলীকদম, লামা এবং সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। এতে শিক্ষা, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
বিশেষ করে থানচি উপজেলার দুর্গম বাকলাইপাড়া, পাতাপাড়া, কাইতনপাড়া ও আশপাশের এলাকার বাসিন্দারা জানান, কয়েক বছর আগেও এলাকায় চরম আতঙ্ক বিরাজ করলেও বর্তমানে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার হওয়ায় মানুষ আবার নিজ নিজ গ্রামে ফিরে কৃষিকাজ শুরু করেছেন। শিক্ষার্থীরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে পারছে এবং বাজার, যোগাযোগ ও সামাজিক কর্মকাণ্ডও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে।
পুনর্বাসন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বান্দরবান রিজিয়নের তত্ত্বাবধানে স্থানীয় জনগণের জন্য বিভিন্ন উন্নয়ন ও মানবিক উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এরমধ্যে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা একটি পর্যটনকেন্দ্র পুনরায় চালু, একটি ইকো রিসোর্ট স্থানীয় জনগণের কাছে হস্তান্তর এবং দুর্গম এলাকার মানুষের যাতায়াত সহজ করতে দুটি ‘চাঁদের গাড়ি’ প্রদান উল্লেখযোগ্য।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এসব চাঁদের গাড়ি শুধু যাত্রী পরিবহনের জন্য নয়, রোগী হাসপাতালে নেওয়াসহ শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াত, কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ এবং জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহার করা হবে। পাশাপাশি এসব উদ্যোগ স্থানীয় তরুণদের কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগও সৃষ্টি করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
স্থানীয় সামাজিক সংগঠনের নেতারা বলেন, সহিংসতার কারণে একসময় অনেক গ্রাম প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়েছিল। জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তার অভাবে মানুষ এলাকা ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিল। তবে বর্তমানে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি এবং সরকারি সহায়তার ফলে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো ধীরে ধীরে নিজ গ্রামে ফিরে আসছে। এতে পাহাড়ে সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আবারও সচল হতে শুরু করেছে।
সেনাবাহিনী আরও জানায়, ২০২০ সাল থেকে কেএনএফের সশস্ত্র তৎপরতায় বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন, দুর্গম অঞ্চলে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ এবং পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরিয়ে আনতে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
বম সম্প্রদায়ের বাসিন্দা লালথাং বম এশিয়া পোস্টকে বলেন, আগে আমরা সবসময় ভয়ের মধ্যে থাকতাম। রাতের পর বাইরে বের হতে সাহস পেতাম না। এখন পরিস্থিতি অনেক শান্ত হয়েছে। পরিবার নিয়ে আবার নিজের গ্রামে ফিরে এসেছি। জমিতে চাষাবাদও শুরু করেছি।
স্থানীয় বাসিন্দা থুইসিং বম বলেন, বাড়িঘর ছেড়ে অন্য জায়গায় থাকতে অনেক কষ্ট হয়েছে। এখন নিরাপত্তা বেড়েছে বলে আমরা আবার গ্রামে ফিরেছি। সন্তানরা নিয়মিত স্কুলে যেতে পারছে, এটিই আমাদের সবচেয়ে বড় স্বস্তি।
যুবক লিয়ানচিং বম বলেন, গ্রামে ফিরে আসার পর মানুষের মধ্যে আবার কর্মচাঞ্চল্য দেখা যাচ্ছে। কৃষিকাজ, বাজারে যাওয়া এবং সামাজিক অনুষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে। আমরা চাই এই শান্তিপূর্ণ পরিবেশ দীর্ঘদিন বজায় থাকুক।
গৃহিণী নুয়াই বম বলেন, বাস্তুচ্যুত অবস্থায় জীবন খুব কষ্টের ছিল। এখন নিজের ঘরে ফিরে স্বাভাবিকভাবে বসবাস করতে পারছি। সরকার ও সেনাবাহিনীর বিভিন্ন সহায়তায় নতুন করে জীবন শুরু করার সুযোগ পেয়েছি।
এ বিষয়ে বান্দরবান রিজিয়নের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আরি আরিফুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, যারা বাংলাদেশের আইন মেনে চলবে না এবং দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি সৃষ্টি করবে, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে। তবে পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ লক্ষ্যেই সেনাবাহিনী স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সমন্বয় করে উন্নয়ন ও মানবিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নিরাপত্তা ব্যবস্থার পাশাপাশি উন্নয়ন, পুনর্বাসন এবং জনসম্পৃক্ত কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে অব্যাহত থাকলে বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি ও টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি আরও সুদৃঢ় হবে। একই সঙ্গে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর স্বাভাবিক জীবনে পূর্ণাঙ্গভাবে ফিরে আসার প্রক্রিয়াও আরও গতিশীল হবে।


