লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত শেরপুরের জনজীবন, দুশ্চিন্তায় কৃষকরা

এশিয়া পোস্ট নিউজ, শেরপুর
লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত শেরপুরের জনজীবন, দুশ্চিন্তায় কৃষকরা
ছবি : সংগৃহীত

তীব্র গরমের মধ্যে বিদ্যুতের ঘাটতিতে শেরপুর জেলাজুড়ে বেড়েছে লোডশেডিং। দিনে-রাতে বারবার বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থরা। একই সঙ্গে শিক্ষার্থী, কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাও ব্যাহত হচ্ছে।

Advertisement

স্থানীয়দের অভিযোগ, জেলার বিভিন্ন এলাকায় দিনে কয়েক দফা বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও টানা এক থেকে দুই ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে বাসিন্দাদের। সন্ধ্যার পর লোডশেডিংয়ের কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে। প্রচণ্ড গরমে ঘরে অবস্থান করাও কষ্টকর হয়ে পড়েছে। বৈদ্যুতিক পানির পাম্প বন্ধ থাকায় অনেক এলাকায় বিশুদ্ধ পানির সংকটও দেখা দিয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলা সদর, শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী, নালিতাবাড়ী ও নকলা উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিং চলছে। বিশেষ করে বিকেল থেকে গভীর রাত এবং ভোর পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিভ্রাট তীব্র আকার ধারণ করেছে। কোনো কোনো এলাকায় দিনে ৮ থেকে ১০ বার পর্যন্ত বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

লোডশেডিংয়ের কারণে সেচকাজ ব্যাহত হওয়ায় দুশ্চিন্তায় রয়েছেন কৃষকরা। অন্যদিকে ফ্রিজে সংরক্ষিত খাদ্যপণ্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় ক্ষতির মুখে পড়ছেন ব্যবসায়ীরা। অনলাইনভিত্তিক কাজ, মোবাইল ব্যাংকিং সেবা এবং ইন্টারনেটনির্ভর বিভিন্ন কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।

জেলা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, শেরপুর জেলায় বিদ্যুতের মোট চাহিদা প্রায় ৫৩ মেগাওয়াট। বর্তমানে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৩৩ থেকে ৩৪ মেগাওয়াট। ফলে ২০ থেকে ২১ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি রয়েছে।

অন্যদিকে জেলা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি সূত্রে জানা গেছে, তাদের আওতাধীন এলাকায় বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৭০ মেগাওয়াট। বর্তমানে গড়ে ৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে প্রায় ৪০ মেগাওয়াটের ঘাটতি রয়েছে। এই ঘাটতির কারণেই জেলার বিভিন্ন এলাকায় পর্যায়ক্রমে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে পল্লী বিদ্যুতের লোডশেডিং সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে।

জেলা শহরের নারায়ণপুর মহল্লার বাসিন্দা শামীম আহম্মেদ বলেন, গরমের মধ্যে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় পরিবারের সবাই কষ্টে আছি। বিশেষ করে ছোট শিশু ও বৃদ্ধদের নিয়ে দুর্ভোগের শেষ নেই। দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি হওয়া প্রয়োজন। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের জন্য খুব কঠিন হয়ে পড়বে।

শ্রীবরদী উপজেলার ভায়াডাঙ্গা এলাকার শিক্ষার্থী আয়শা বলেন, রাতে বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় ঠিকমতো পড়াশোনা করতে পারছি না। সামনে পরীক্ষা, কিন্তু এই অবস্থায় প্রস্তুতি নেওয়া খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। সন্ধ্যার পর থেকেই আমাদের এলাকায় বিদ্যুৎ থাকে না।

একই এলাকার বাসিন্দা আব্দুল করিম বলেন, এইডা কী অবস্থা হইল। দিনেও কারেন্ট থাহে না, রাইতেও না। আমরা ঠিকমতো ঘুমাইতেও পারি না। সবজি লাগাইছি, পানি দিমু সেটাও হয়তাছে না। পানি না দিলে সবজির ক্ষতি হবে। আমরা বড় বিপদে আছি।

ঝিনাইগাতী উপজেলার দিঘীরপাড় এলাকার বাসিন্দা রহিমা বেগম বলেন, গরমে ঘরের ভিতর থাইক্যা থাকা যায় না। কারেন্ট আইলে আবার একটু পরেই চইলা যায়। বাচ্চাগো খুব কষ্ট অয়। কয়ডা দিন থনে এমুন অবস্থা শুরু হইছে।

একই এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, দোকানে ফ্রিজে রাখা ঠান্ডা জিনিস নষ্ট অইয়া যায়। কারেন্টের এই অবস্থা থাকলে ব্যবসা কইরা টিক্যা থাকা মুশকিল অইব।

পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির শেরপুর জেলা শাখার ভারপ্রাপ্ত জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশলী আক্তারুজ্জামান বলেন, বর্তমানে জেলায় বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৭০ মেগাওয়াট। তবে গড়ে ৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে প্রায় ৪০ মেগাওয়াটের ঘাটতি রয়েছে। এছাড়া প্রতি ঘণ্টায় বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহের পরিমাণ ওঠানামা করে। তবুও গ্রাহকদের ভোগান্তি কমিয়ে বিদ্যুতের চাহিদা যথাসম্ভব পূরণের চেষ্টা করা হচ্ছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানোর বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

জেলা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সাহাবুদ্দিন আহমেদ বলেন, গত চার দিনের তুলনায় আজ চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। গত চার দিনে জেলায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল প্রায় ৫৩ মেগাওয়াট, কিন্তু জাতীয় গ্রিড থেকে পাওয়া গেছে মাত্র ৩৩ থেকে ৩৪ মেগাওয়াট। তবে আজ চাহিদা অনুযায়ী পুরো ৫৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া গেছে।

তিনি বলেন, জাতীয় গ্রিড থেকে প্রয়োজনের তুলনায় কম বিদ্যুৎ বরাদ্দ পাওয়ায় বাধ্য হয়ে বিভিন্ন এলাকায় পর্যায়ক্রমে লোডশেডিং করতে হয়েছে। গ্রিড থেকে সরবরাহ বৃদ্ধি পেলে পরিস্থিতির আরও উন্নতি হবে। সাময়িক এই ভোগান্তির জন্য গ্রাহকদের কাছে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি।

বিষয় :শেরপুর