মাসে বিক্রি ১২০ কোটি টাকার শুঁটকি, নেই একটি হিমাগার

উত্তরাঞ্চলের বৃহত্তম এবং দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শুঁটকি বন্দর নীলফামারীর সৈয়দপুর। সপ্তাহে দুদিন বসা হাটে কোটি কোটি টাকার শুঁটকি কেনাবেচা হলেও বর্তমানে নানা সংকটে রয়েছেন এখানকার ব্যবসায়ীরা। হিমাগারের অভাব, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদ, শুঁটকির সরবরাহ কমে যাওয়া এবং রপ্তানি হ্রাসের কারণে বাড়ছে লোকসান। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় এই শুঁটকি বন্দর তার আগের জৌলুস হারাবে।
সৈয়দপুর বাস টার্মিনাল-সংলগ্ন শুঁটকি বন্দরে গিয়ে দেখা যায়, সারি সারি আড়তে বস্তাভর্তি বিভিন্ন প্রজাতির শুঁটকি সাজানো রয়েছে। কোথাও চলছে দরদাম, কোথাও শ্রমিকেরা ব্যস্ত শুঁটকি বস্তাবন্দী ও সেলাইয়ের কাজে। প্রতি শনিবার ও মঙ্গলবার পাইকারি ক্রেতাদের উপস্থিতিতে জমে ওঠে হাট।
ব্যবসায়ী নেতাদের হিসাবে, শুধু দুদিনের হাটেই প্রায় ৫০ কোটি টাকার শুঁটকি কেনাবেচা হয়। অন্য দিনগুলোতে নিয়মিত খুচরা বিক্রি চলে। বর্তমানে দেশি শুঁটকির সরবরাহ তুলনামূলক ভালো থাকায় দাম কিছুটা কমেছে এবং ক্রেতার উপস্থিতিও বেড়েছে। তবে দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সমস্যাগুলোর কোনো সমাধান হয়নি।
১৯৮০ সালে সৈয়দপুর বাস টার্মিনাল এলাকায় ছোট পরিসরে যাত্রা শুরু হয় শুঁটকি আড়তের। সময়ের সঙ্গে এটি উত্তরাঞ্চলের বৃহত্তম এবং দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শুঁটকি মোকামে পরিণত হয়। খুলনা, বরিশাল, বরগুনা, সাতক্ষীরা, কক্সবাজার, পাবনা, নাটোরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে এখানে পুঁটি, চিংড়ি, লইট্টা, চ্যাপা, বোয়াল, কাচকিসহ ৬০ থেকে ৭০ প্রজাতির শুঁটকি আসে। এক সময় সৈয়দপুর থেকে বছরে প্রায় দুই হাজার ৪০০ টন পুঁটি শুঁটকি ভারতে রপ্তানি হতো। ব্যবসায়ীদের দাবি, বর্তমানে সেই রপ্তানি প্রায় বন্ধ হওয়ার পথে। চলতি মৌসুমে জুন পর্যন্ত রপ্তানি হয়েছে মাত্র ৪০০ টন।
ব্যবসায়ী আক্তারুজ্জামান বলেন, সৈয়দপুরে হিমাগার না থাকায় শুঁটকি সংরক্ষণের জন্য ঢাকা, চট্টগ্রাম ও জামালপুরে পাঠাতে হয়। এতে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায়, লাভ কমে আসে। দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করতে গিয়ে অনেক সময় শুঁটকি নষ্টও হয়ে যায়।

আরেক ব্যবসায়ী গোলাম কিবরিয়া বলেন, চলনবিল থেকে সবচেয়ে বেশি পুঁটি শুঁটকি আসে। এ বছর বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় উৎপাদনও কমেছে। হিমাগার না থাকায় প্রয়োজনমতো শুঁটকি মজুত করা সম্ভব হচ্ছে না।
ময়মনসিংহের ব্যবসায়ী লিয়াকত আলী বলেন, প্রতি বছর সৈয়দপুর থেকে পুঁটি শুঁটকি কিনে ভারতে রপ্তানি করেন তিনি। তবে দুই দেশের বাণিজ্যিক পরিস্থিতি এবং সময়মতো এলসি (ঋণপত্র) না পাওয়ায় এবার রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
রপ্তানিকারক আলাল উদ্দিন বলেন, রপ্তানির আশায় ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছিলেন। কিন্তু রপ্তানি কমে যাওয়ায় এখন ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে।
পার্বতীপুরের পাইকার লুৎফর রহমান বলেন, সৈয়দপুরের শুঁটকির মান ভালো এবং দাম তুলনামূলক কম হওয়ায় নিয়মিত এখান থেকেই শুঁটকি কেনেন। একইভাবে খানসামার খুচরা ব্যবসায়ী নাজমুল হক বলেন, কম দামে ভালো মানের বিভিন্ন ধরনের শুঁটকি পাওয়া যায় বলেই সৈয়দপুরের বাজারের প্রতি তাদের আগ্রহ বেশি।

শুঁটকি মাছ ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি বাছের আলী বাখার এশিয়া পোস্টকে বলেন, বন্দরে ১৩টি পাইকারি আড়ত ও ৭৪টি খুচরা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। মাসে প্রায় ১২০ কোটি টাকার শুঁটকি কেনাবেচা হয়। প্রায় এক হাজার শ্রমিক এই বন্দরের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু রপ্তানি কমে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা আর্থিক চাপে পড়েছেন।
সমিতির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন বলেন, একটি হিমাগার নির্মাণ এবং ব্যাংকঋণের সুদের হার কমানো গেলে ব্যবসা অনেকটাই স্বাভাবিক হবে। একই সঙ্গে রপ্তানি বাড়াতে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
এ বিষয়ে নীলফামারীর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামান এশিয়া পোস্টকে বলেন, সরকারি উদ্যোগে এখনও সৈয়দপুরে কোনো হিমাগার নির্মাণ হয়নি। তবে ব্যক্তি উদ্যোগে কেউ হিমাগার স্থাপন করতে চাইলে জেলা প্রশাসন প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবে। পাশাপাশি কৃষিপণ্যভিত্তিক একটি হিমাগার নির্মাণের প্রস্তাব সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের মতে, চার দশকের ঐতিহ্যবাহী সৈয়দপুর শুঁটকি বন্দর শুধু একটি বাণিজ্যকেন্দ্র নয়, উত্তরাঞ্চলের হাজারো মানুষের জীবিকার উৎস। আধুনিক সংরক্ষণব্যবস্থা, সহজ শর্তে ঋণ এবং রপ্তানি সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় এই বন্দর আবারও তার আগের রূপ ফিরে পাবে।
.png)






