
ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই দিতে সরকারের আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় রাজবাড়ীতে নির্মাণ করা হয়েছে হাজারো ঘর। জমিসহ বরাদ্দ পাওয়া এসব ঘরগুলো হওয়ার কথা ছিল ভূমিহীন অসহায়দের নতুন বসতি। তবে সেই ঘরই এখন হাতবদল হচ্ছে টাকার বিনিময়ে। বরাদ্দপ্রাপ্ত অনেকে ঘরে না উঠে অন্যের কাছে বিক্রি করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া জেলার বিভিন্ন আশ্রয়ণ প্রকল্প ঘুরে মিলেছে ফাঁকা ও তালাবদ্ধ ঘর, বরাদ্দপ্রাপ্তদের অনুপস্থিতি এবং অন্যের দখলে চলে যাওয়ার মতো এমন আরও চিত্র।
সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, যাদের পুনর্বাসনের জন্য সরকারি অর্থে এসব ঘর নির্মাণ করা হয়েছে, তাদের কেউ কেউ ঘর পেয়েও সেখানে থাকছেন না। আবার ঘর না পাওয়া ভূমিহীন-গৃহহীন পরিবার অন্যের বরাদ্দ পাওয়া ঘরে আশ্রয় নিয়েছে। কোথাও ঘর বিক্রির লেনদেন হয়েছে, কোথাও বদলেছে দখল। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—ভূমিহীনদের জন্য নির্মিত আশ্রয়ণের ঘর কীভাবে বেচাকেনার পণ্যে পরিণত হলো?
সদর উপজেলার বিভিন্ন প্রকল্পে ফাঁকা ঘর
রাজবাড়ী সদর উপজেলায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের বিভিন্ন ধাপে এখন পর্যন্ত ৫৭৫টি ঘর উপকারভোগীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে আলীপুর ইউনিয়নে সবচেয়ে বেশি ঘর রয়েছে। প্রথম পর্যায়ে আলাদীপুর কলোনিতে ৭৬টি ঘর হস্তান্তর করা হয়।
সরেজমিনে আলাদীপুর কলোনি ঘুরে দেখা যায়, বেশ কয়েকটি ঘর তালাবদ্ধ। স্থানীয়দের অভিযোগ, বরাদ্দ পাওয়ার পরও অনেকে সেখানে বসবাস করছেন না। কেউ কেউ নিজেদের পুরোনো বাড়িতে ফিরে গেছেন। আবার কয়েকটি ঘর বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, আলাদীপুর কলোনির ১৮ নম্বর ঘরটির বরাদ্দপ্রাপ্ত ব্যক্তির তথ্য পাওয়া যায়নি। ১৯ নম্বর ঘরটি ডালিম বেগম, ২২ নম্বর ঘরটি ফরিদ মল্লিক গং, ২৫ নম্বর ঘরটি শহিদুল ইসলাম এবং ২৬ নম্বর ঘরটি সাজেদা বেগমের নামে বরাদ্দ রয়েছে।
১৮, ১৯, ২৫ ও ২৬ নম্বর ঘর নিয়ে অভিযোগ স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯ নম্বর ডালিম, ২৫ নম্বর শুকুর আলী এবং ২৬ নম্বর ঘরটি জাকিরের নামে বরাদ্দ ছিল। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব বরাদ্দপ্রাপ্ত ব্যক্তি ঘরে বসবাস না করে নিজেরাই ঘরগুলো অন্যের কাছে বিক্রি করে দিয়ে চলে গেছেন।
আলাদীপুর কলোনির ২২ নম্বর ঘরটি নিয়েও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বর্তমানে সেখানে বসবাস করছেন কামরুল ও তার স্ত্রী সুমি বেগম। তারা দাবি করেছেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরটি তাদের নামে বরাদ্দ হয়নি।
কামরুল জানান, আলীপুর ইউনিয়ন পরিষদের এক নারী সদস্যের কাছ থেকে টাকা দিয়ে তারা ঘরটি নিয়েছেন। প্রথমে তিনি ৬০ হাজার টাকা দেওয়ার কথা বললেও পরে তার স্ত্রী সুমি বেগম জানান, নারী ইউপি সদস্যকে ৪০ হাজার টাকা দেওয়ার পর তারা ঘরটিতে ওঠেন। তবে এখনো তাদের নামে ঘরটি লিখে দেওয়া হয়নি।
অভিযোগটি আলীপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য শেফালীর বিরুদ্ধে। তবে এ বিষয়ে ইউপি সদস্য শেফালী অভিযোগের বিষয়টি স্বীকার করেছেন ।
আলাদীপুর কলোনির ১৯ নম্বর ঘরে বসবাসকারী পারভিন খাতুন জানান, তার থাকার মতো কোনো ঘর ছিল না। ঘরের জন্য আবেদন করেও তিনি বরাদ্দ পাননি।
তিনি বলেন, এখন যে ১৯ নম্বর ঘরটিতে আছি, এটি ডালিম নামের একজনের ঘর। তিনি ঘর পাওয়ার পর আর ঘরে ওঠেননি। একপর্যায়ে বিক্রির কথা বললে নগদ ৪০ হাজার টাকা দিয়ে স্ট্যাম্প করে কিনে নিয়েছি।
তবে স্থানীয় সূত্রের দাবি, পারভিন খাতুন শুধু ১৯ নম্বর নয়, ১৮ নম্বর ঘরটিও ব্যবহার করছেন। অর্থাৎ একই ব্যক্তির কাছে আশ্রয়ণ প্রকল্পের একাধিক ঘর থাকার অভিযোগও রয়েছে।

খানগঞ্জে ৪৬ ঘরের মধ্যে ২০টির বেশি ফাঁকা
সদর উপজেলার খানগঞ্জ ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের আশ্রয়ণ প্রকল্পে রয়েছে ৪৬টি ঘর। স্থানীয়দের দাবি, এর মধ্যে ২০টির বেশি ঘরে কেউ বসবাস করেন না। অনেক ঘরেই ঝুলছে তালা।
অন্যদিকে, সেখানে বসবাসকারীদের মধ্যে এমন মানুষও রয়েছেন, যারা ওই প্রকল্পের মূল উপকারভোগী নন। নিজেদের ঘরবাড়ি না থাকায় বরাদ্দপ্রাপ্তদের ফাঁকা ঘরে তারা আশ্রয় নিয়েছেন বলে জানান।
খানগঞ্জ ইউনিয়নের হাসিনা বেগম বলেন, যাদের জায়গা-জমি আছে, তারাই ঘর পেয়েছে। এখন অনেকেই আর এই ঘরে থাকে না। আমরা অসহায়, আমাদের ঘরবাড়ি নেই। তাই যারা ঘর পেয়েও থাকেন না, তাদের ফাঁকা ঘরে থাকছি।
আশ্রয়ণ প্রকল্পে থাকা মহিনউদ্দিন বলেন, যারা ঘর পেয়েছিল, তাদের অনেকেই এখন আর এখানে থাকে না। অনেকেই ঘরে তালা দিয়ে নিজেদের বাড়িতে চলে গেছে।
সদর উপজেলার চন্দনী ইউনিয়নের আশ্রয়ণ প্রকল্পেও অনেক বরাদ্দপ্রাপ্ত পরিবার ঘরে থাকছেন না বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। কেউ কেউ ঘর ছেড়ে চলে গেছেন, আবার কিছু ঘর তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
শুধু সদর নয়, পুরো জেলার আশ্রয়ণ প্রকল্পেই খালি ঘরের অভিযোগ
রাজবাড়ী সদর উপজেলার কয়েকটি প্রকল্পের পাশাপাশি জেলার অন্যান্য উপজেলার আশ্রয়ণ প্রকল্পের কলোনিগুলোতেও খোঁজ নিয়ে একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গোয়ালন্দ, পাংশা, বালিয়াকান্দি ও কালুখালী উপজেলার বিভিন্ন আশ্রয়ণ প্রকল্পেও বেশ কিছু ঘর ফাঁকা ও তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে রয়েছে। কোথাও উপকারভোগীরা ঘর পেয়েও অন্যত্র বসবাস করছেন, আবার কোথাও প্রকৃত ভূমিহীন পরিবার অন্যের বরাদ্দ পাওয়া ঘরে বসবাস করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
রাজবাড়ী জেলাকে ২০২৩ সালের আগস্টে আনুষ্ঠানিকভাবে ভূমিহীন ও গৃহহীনমুক্ত জেলা ঘোষণা করা হয়। বিভিন্ন ধাপে জেলার পাঁচটি উপজেলায় সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ২ হাজার ৩৯৯টির বেশি ভূমিহীন পরিবারকে জমিসহ ঘর দেওয়া হয়েছে।
সদর উপজেলায় বিভিন্ন ধাপে ৫৪০টির বেশি ঘর দেওয়ার পর সর্বশেষ পর্যায়ে আরও ৩৫টি ঘর হস্তান্তর করা হয়। গোয়ালন্দ উপজেলায় প্রথম দিকে ৪৩০টি ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয় এবং সর্বশেষ ধাপে আরও দুটি পরিবার ঘর পায়।
পাংশা উপজেলায় প্রথম পর্যায়ে ১০০টি এবং চতুর্থ পর্যায়ে আরও ১২০টি ঘর দেওয়া হয়। বালিয়াকান্দিতে প্রথম দফায় ৭০টি এবং চতুর্থ পর্যায়ে ১২০টি নতুন ঘর হস্তান্তর করা হয়। কালুখালী উপজেলায় প্রথম পর্যায়ে ৪০টি ঘর দেওয়ার পর উপজেলাটি জেলার প্রথম ভূমিহীন-গৃহহীনমুক্ত উপজেলা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। প্রতিটি আশ্রয়ণের বাড়িতে সাধারণত দুটি কক্ষ, একটি রান্নাঘর, একটি বারান্দা ও একটি টয়লেট রয়েছে।
ঘর পাওয়ার পর বসবাসকারীদের কেউ কেউ নির্মাণকাজের মান নিয়েও অভিযোগ করেছেন। তাদের দাবি, কয়েকটি ঘরের মেঝে ও দেয়ালের পলেস্তারা উঠে যাচ্ছে। দরজা-জানালা ঠিকমতো লাগছে না। টিনের ছাদের স্ক্রু উঠে গিয়ে বৃষ্টির পানি ঘরের ভেতরে পড়ছে।
কিছু প্রকল্পে টিউবওয়েল ও চলাচলের রাস্তা না থাকার অভিযোগও রয়েছে। ফলে সরকারি অর্থে নির্মিত ঘর পাওয়ার পরও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাবে অনেকে সমস্যায় পড়ছেন বলে জানান বাসিন্দারা।
আশ্রয়ণ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে পুনর্বাসন করা। কিন্তু ঘর পেয়েও উপকারভোগীদের একটি অংশ সেখানে না থাকা, ঘর তালাবদ্ধ পড়ে থাকা, ঘর বিক্রির অভিযোগ এবং প্রকৃত ভূমিহীনদের অন্যের ফাঁকা ঘরে বসবাসের ঘটনায় এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে উপকারভোগী নির্বাচন ও ঘর বরাদ্দের প্রক্রিয়ায় কোথাও ত্রুটি রয়েছে কিনা।
একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, যারা ঘর পেয়েও সেখানে থাকছেন না, তাদের বরাদ্দ বাতিল করে প্রকৃত ভূমিহীন পরিবারকে পুনর্বাসনের কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না।
এ বিষয়ে রাজবাড়ী সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফয়জুর রহমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, আমি নতুন এসেছি। বিষয়টি আপনার মাধ্যমে জানলাম। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেব।
স্থানীয়দের দাবি, শুধু অভিযোগ শোনা নয় জেলার প্রতিটি আশ্রয়ণ প্রকল্পে সরেজমিন যাচাই করে উপকারভোগীদের বর্তমান অবস্থান, ঘরে বসবাসের তথ্য, ঘর তালাবদ্ধ থাকার কারণ এবং ঘর বিক্রি বা হস্তান্তরের অভিযোগ তদন্ত করা হোক।
