কালীগঞ্জ শহরে আধুনিক মুক্তমঞ্চের দাবি সর্বস্তরের মানুষের

এশিয়া পোস্ট নিউজ, ঝিনাইদহ
কালীগঞ্জ শহরে আধুনিক মুক্তমঞ্চের দাবি সর্বস্তরের মানুষের
ছবি এআই দিয়ে তৈরি।

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ শহরে একটি আধুনিক, উন্মুক্ত ও বহুমুখী মুক্তমঞ্চ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন সর্বস্তরের মানুষ। রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষামূলক এবং রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য উপযুক্ত কোনো উন্মুক্ত স্থাপনা না থাকায় দীর্ঘদিন ধরেই এই দাবি জানিয়ে আসছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের মতে, একটি পরিকল্পিত মুক্তমঞ্চ নির্মিত হলে শুধু সাংস্কৃতিক চর্চাই নয়, নাগরিক জীবনের নানা আয়োজনও আরও সুশৃঙ্খল ও প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, বর্তমানে কালীগঞ্জ শহরে বড় ধরনের কোনো সভা-সমাবেশ বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের মতো পর্যাপ্ত উন্মুক্ত স্থান নেই। ফলে প্রয়োজনের তাগিদে যশোর-ঝিনাইদহ মহাসড়কের প্রধান বাস টার্মিনাল এলাকার অল্প পরিসরের জায়গায় অনুষ্ঠান করতে হয়। এতে মহাসড়কে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয় এবং জরুরি যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয়ে সাধারণ মানুষকে ভোগান্তিতে পড়তে হয়।

সচেতন মহলের দাবি, একটি আধুনিক মুক্তমঞ্চ নির্মিত হলে সেখানে জাতীয় ও ধর্মীয় উৎসব, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নাটক, মেলা, সেমিনার, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এবং সামাজিক সচেতনতামূলক নানা কর্মসূচি সুচারুভাবে আয়োজন করা সম্ভব হবে। স্থানীয়দের প্রস্তাব, যশোর-ঝিনাইদহ মহাসড়কের পাশে মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সের দক্ষিণ পাশের লেকসংলগ্ন সরকারি জমিতে দর্শকদের জন্য গ্যালারি, উন্নত আলো ও সাউন্ড সিস্টেমসহ পরিকল্পিতভাবে এই মঞ্চটি নির্মাণ করা যেতে পারে।

শহরের প্রবীণ সাংবাদিক ও বিএনপি নেতা আনোয়ারুল ইসলাম রবি বলেন, কালীগঞ্জ একটি গুরুত্বপূর্ণ পৌর শহর হলেও এখানে একটি মুক্তমঞ্চ নেই। ফলে প্রতিটি বড় আয়োজনের সময় মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। উন্নত ও পরিকল্পিত একটি মুক্তমঞ্চ নির্মাণ এখন সময়ের দাবি। আমরা চাই বর্তমান সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি বিবেচনাপূর্বক আমাদের চাওয়া-পাওয়ার যথাযথ মূল্যায়ন করবেন।

জেলা জামায়াতের প্রশিক্ষক সাধারণ সম্পাদক মাওলানা ওলিয়ার রহমান বলেন, মুক্তমঞ্চ কোনো নির্দিষ্ট দল বা গোষ্ঠীর জন্য নয়, এটি হবে সাধারণ মানুষের সম্পদ। দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই যাতে এটি ব্যবহার করতে পারেন, সে লক্ষ্যেই পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত। যার যার জায়গা থেকে এই বিষয়ে আমাদের সোচ্চার হতে হবে। এ ব্যাপারে আমি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুডৃষ্টি কামনা করছি এবং বিষয়টি নিয়ে আমি আমাদের এমপি মহোদয়ের নিকট আলোচনা করব।

সামাজিক, পরিবেশবাদী ও মানবাধিকার কর্মী শিবুপদ বিশ্বাস বলেন, শহরের মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সের দক্ষিণ পাশে লেকের সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রেখে পরিবেশবান্ধব নকশায় মুক্তমঞ্চ নির্মাণ করা হলে এটি একদিকে যেমন সভা-সমাবেশ, ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হবে, অন্যদিকে শহরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করবে। পর্যাপ্ত বৃক্ষরোপণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। আমি জনপ্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি আন্তরিকতার সাথে দেখার আহ্বান করছি।

স্থানীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সংগীত শিল্পী সুভাষ দাস বলেন, নতুন প্রজন্মকে সুস্থ সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখতে একটি স্থায়ী মুক্তমঞ্চ অত্যন্ত জরুরি। নিয়মিত ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বাড়লে মাদক, কিশোর অপরাধ ও সামাজিক অবক্ষয় রোধেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। মুক্তমঞ্চে আমরা সকল ধর্ম, বর্ণ, দল-মত নির্বিশেষে বিভিন্ন উৎসব মুক্ত মনে উন্মুক্তভাবে বলতে পারব। তাই মুক্তমঞ্চ আমাদের প্রয়োজন।

সাবেক উপজেলা বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সেকেন্দার আলী মোল্লা বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, দেশপ্রেম ও ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে একটি উন্মুক্ত সাংস্কৃতিক মঞ্চ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। জাতীয় দিবসগুলো মর্যাদার সঙ্গে উদযাপনের জন্যও এমন একটি স্থাপনার প্রয়োজন রয়েছে। যেখানে দাঁড়িয়ে শির উঁচু করে মহান মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস আগামী প্রজন্মের নিকট বলতে পারি। এমন একটা মুক্তমঞ্চ আমাদের প্রয়োজন যেখানে সবার সমঅধিকার থাকবে। আমি নিজে ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্যের নিকট বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করব।

উপজেলা ইমাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক হাফেজ হেদায়েত উল্লাহ বলেন, একটি মুক্তমঞ্চ শুধু সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের স্থান নয়, এটি সামাজিক সচেতনতা ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলারও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে। এখানে ইসলামী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, হামদ-নাত, কিরাত, নৈতিকতা ও মূল্যবোধভিত্তিক আলোচনা, মাদক ও সন্ত্রাসবিরোধী জনসচেতনতামূলক কর্মসূচিসহ বিভিন্ন ইতিবাচক আয়োজন করা সম্ভব। দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের জন্য উন্মুক্ত ও সম্প্রীতির প্রতীক হিসেবে একটি আধুনিক মুক্তমঞ্চ নির্মাণ করা হলে তা কালীগঞ্জের সামাজিক বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করবে।

এ বিষয়ে ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য মাওলানা আবু তালিব বলেন, কালীগঞ্জের মানুষের যৌক্তিক ও জনকল্যাণমূলক যেকোনো দাবিকে আমি ইতিবাচকভাবে দেখি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয়তা ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের মাধ্যমে একটি আধুনিক মুক্তমঞ্চ নির্মাণের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। জনস্বার্থে বাস্তবসম্মত উদ্যোগ গ্রহণে আমি সর্বোচ্চ সহযোগিতা করব। একটি মুক্তমঞ্চ এবং শিল্পকলা একাডেমি আমাদের একান্ত প্রয়োজন। আমি ইতিমধ্যে জেলা প্রশাসক মহোদয়ের সাথে আলোচনা করেছি। শিল্পকলা একাডেমির জন্য একটা বরাদ্দ পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। আর মুক্তমঞ্চের বিষয়টিকেও গুরুত্বের সাথে দেখছি। আশা করি সম্ভব হবে, যেহেতু জায়গা নির্ধারণ করা আছে। ওখানেই মুক্তমঞ্চ হবে।

বিষয় :ঝিনাইদহ