logo
Advertisement

১৯ বছর ধরে বজ্রপাতের বিরুদ্ধে লড়ছেন শিক্ষক তাজ-উল

এশিয়া পোস্ট নিউজ
এশিয়া পোস্ট নিউজ,কেরানীগঞ্জ
১৯ বছর ধরে বজ্রপাতের বিরুদ্ধে লড়ছেন শিক্ষক তাজ-উল
ছবি: এশিয়া পোস্ট

জলবায়ু পরিবর্তন ও দেশজুড়ে বজ্রপাতের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি মোকাবিলায় ব্যক্তিগত উদ্যোগে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন কেরানীগঞ্জের এক স্কুল শিক্ষক মো. তাজ-উল ইসলাম চৌধুরী। কোনো সরকারি অনুদান বা প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা ছাড়াই বিগত ১৯ বছর ধরে নিজের বেতনের টাকা জমিয়ে কোন্ডা ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামীণ সড়কের পাশে প্রায় চার হাজার তালবীজ বুনেছেন তিনি। একক পরিশ্রমে রোপণ করা এই গাছগুলো এখন পূর্ণাঙ্গ রূপ পেয়ে পুরো এলাকার পরিবেশ বদলে দেওয়ার পাশাপাশি বজ্রপাত নিরোধক প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে।

Advertisement

তাজ-উল ইসলাম কেরানীগঞ্জের কোন্ডা ইউনিয়নের ব্রাহ্মণগাঁও গ্রামের বাসিন্দা। পেশায় শিক্ষক হলেও গত প্রায় দুই দশক ধরে তিনি হয়ে উঠেছেন পরিবেশের এক নীরব ও অক্লান্ত যোদ্ধা। তার লাগানো শত শত গাছ আজ ছায়া দিচ্ছে, ফল দিচ্ছে এবং বদলে দিচ্ছে পুরো এলাকার পরিবেশ ও আবহাওয়া।

১৯৯৮ সালে ছাত্রাবস্থায় তাজ-উল ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘নূতন কুঁড়ি স্কুল’। তখন থেকেই শিক্ষার পাশাপাশি সমাজের জন্য স্থায়ী কিছু করার তাগিদ ছিল তার মনে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই সামাজিক দায়বদ্ধতা রূপ নেয় গভীর বৃক্ষপ্রেমে। ফলদ, বনজ ও ঔষধি—বিভিন্ন ধরনের গাছ লাগালেও তালগাছের প্রতি তার বিশেষ ভালোবাসা তৈরি হয় এর অনন্য পরিবেশগত গুরুত্ব জানার পর।

তাজ-উল ইসলাম বলেন, ছোটবেলায় চারপাশে অসংখ্য তালগাছ দেখেছি। কিন্তু আবাসন আর নগরায়ণের ধাক্কায় ধীরে ধীরে সেগুলো হারিয়ে যেতে থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যুর হার আমাদের সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে। তখন ভাবলাম, সরকারি উদ্যোগের ভরসায় না থেকে কেউ না কেউ তো ব্যক্তিগতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। সেই তাড়না থেকেই ২০০৮ সালে শুরু হয় আমার তালবীজ বোনার যাত্রা।

কোনো বড় প্রকল্প বা সরকারি অনুদান ছাড়াই নিজের বেতনের টাকা জমিয়ে তিনি বছরের পর বছর তালবীজ সংগ্রহ করেছেন। তারপর বর্ষার মরসুমে সেগুলো বুনেছেন রাস্তার ধারে, খোলা জায়গায়, পরিত্যক্ত জমিতে কিংবা যেখানে গাছ বেড়ে ওঠার ন্যূনতম সুযোগ আছে। ১৯ বছরের এই দীর্ঘ যাত্রায় অনেক বীজ নষ্ট হয়েছে, কিছু চারা গরু-ছাগলে খেয়েছে কিংবা অযত্নে টিকেনি। তবুও তিনি দমে যাননি। আজ তার লাগানো প্রায় চার হাজার বীজের মধ্যে চার শতাধিক তালগাছ বিভিন্ন স্থানে ডালপালা মেলে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। অনেক গাছ পূর্ণতা পেয়ে এখন নিয়মিত ফলও দিচ্ছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, কয়েক বছর আগেও এই এলাকার গ্রামীণ রাস্তার পাশে তেমন কোনো গাছ ছিল না। এখন তালগাছের সারি শুধু চারপাশের সৌন্দর্যই বাড়ায়নি, তীব্র গরম ও বজ্রপাতের ঝুঁকি থেকে পুরো এলাকাকে এক ধরনের প্রাকৃতিক সুরক্ষা দিচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. আশিক বলেন, প্রতিদিন এই রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করি। আগে রোদের মধ্যে হাঁটা মুশকিল হতো। এখন রাস্তার দুই পাশে তালগাছ দেখে চোখ ও মন জুড়িয়ে যায়। একজন মানুষ যে একা চেষ্টা করে পুরো একটা জনপদের চেহারা বদলে দিতে পারেন, শিক্ষক তাজ-উল ইসলাম তার জীবন্ত উদাহরণ।

কোন্ডা ইউনিয়ন পরিষদের সচিব মোহাম্মদ ইফতেখারুল ইসলাম বলেন, তিনি ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় পরিবেশ রক্ষায় যে অবদান রাখছেন, তা অবিশ্বাস্য। ইউনিয়ন পরিষদ প্রাঙ্গণেও তার লাগানো বেশ কয়েকটি তালগাছ রয়েছে, যেগুলো এখন ফল দিচ্ছে। তার এই কাজ সমাজের অন্যদের জন্য অনুকরণীয়।

নিজের এই দীর্ঘদিনের কাজের জন্য কোনো পুরস্কার বা প্রচারণার মোহ নেই এই শিক্ষকের। বরং তার আনন্দের জায়গাটা একদমই সাধারণ। তাজ-উল ইসলাম বলেন, যখন দেখি দুপুরের কড়া রোদে পথের ক্লান্ত মানুষ আমার লাগানো গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে, তখন মনে হয় জীবনের সব পরিশ্রম সার্থক হয়েছে। আর গাছে যখন প্রথম ফল ধরে, সেই আনন্দ আসলে ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।