Advertisement

এভারকেয়ার হাসপাতালে অবহেলায় রোগীর মৃত্যু, অভিযোগ চিকিৎসক ভাইয়ের

এশিয়া পোস্ট নিউজ, চট্টগ্রাম
এভারকেয়ার হাসপাতালে অবহেলায় রোগীর মৃত্যু, অভিযোগ চিকিৎসক ভাইয়ের
চট্টগ্রামের বেসরকারি এভারকেয়ার হাসপাতাল। ছবি : সংগৃহীত

চট্টগ্রামের বেসরকারি এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসার অভাবে কেবিনেই সুবিমল দাশ সুবীর নামে এক রোগীর মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেছেন রোগীর ভাই ডা. আবীর দাশ। একই সঙ্গে তিনি হাসপাতালের চরম অবহেলা, প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনাসহ নানা অভিযোগ করেন।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, ৩৫ বছর বয়সী সুবিমল 'থ্যালামিক গ্লাইওমা' (মস্তিষ্কের টিউমার)-এ ভুগছিলেন। গত ২০ জুলাই রেডিয়েশন থেরাপির উদ্দেশ্যে সুবিমলকে এভারকেয়ার হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয় এবং দুপুর আড়াইটার কেবিনে ভর্তি করা হয়। ভর্তির পর থেকেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনার মুখোমুখি হতে হয় বলে স্বজনদের অভিযোগ।

আবীর দাশ পেশায় একজন চিকিৎসক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের আইডিতে এসব অভিযোগের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে একটি পোস্ট করেন তিনি।

পোস্টে ডা. আবির ‘এভারকেয়ার হাসপাতাল, চট্টগ্রাম ও হত্যাকাণ্ড’ শিরোনামে লেখেন, ‘বারবার ভাবছি, সবকিছু চেপে যাব; কিন্তু মনের সাথে যুদ্ধ করে আর পারছি না! গত ২০/৭/২৬ তারিখে দুপুর ১২.৪৫-এ রেডিয়েশন শুরু করার নিমিত্তে আমার ভাই সুবিমল দাশ সুবীরকে (থ্যালামিক গ্লাইওমা, ব্রেইন টিউমার) এভারকেয়ারের ইমারজেন্সিতে আনলে দুপুর ২.২০ ভর্তি দিয়ে রেডিয়েশনের চিকিৎসকের সাথে কথা বলে সব ভাইটালস ভাল দেখে আনুমানিক ৩.০টায় কেবিনে শিফট করে। আমরা সাথে সাথে কেবিনের সিস্টার এবং ডাক্তারকে বলি আমার ভাই ১২টার পর আর কোন ফিডিং পায়নি, একটু তাড়াতাড়ি ফিডিংয়ের ব্যবস্থা করেন। এর মধ্যে ওনাদের এত এত ফাইল ওয়ার্ক শেষ হয় না, যাই হোক সেই ফিডিং সন্ধ্যা ৬টায় দেয়া হয়, তাও ২০০ মিলি ডাবের পানি। সে ২ বেলা খিঁচুনি প্রতিরোধক ঔষধ পায় (৬টা আর ৯টা) কিন্তু সন্ধ্যা ৬টার ঔষধ ওনারা দেননি (বারবার বলা হয়ছে আমাদের সব মেডিসিন কেনা আছে, আমাদেরটাই দেন। ওনারা কর্ণপাত করল না, বলছে ওদের ফার্মেসি থেকেই দেয়া লাগবে)। সেই গুরুত্বপূর্ণ খিঁচুনির ঔষধ ৬টায় না দিয়ে ৯টার সময় একাসাথে ২ ধরনের দেয়। রাতেই আমার ভাই ড্রাউজি হযে যায়, তাই ওনারা রাতে বারবার MRI of Brain with contrast করাতে বললেও আমি রাজি হইনি। ২ ঘণ্টা পরপর পোস্টার চেঞ্জ করা ও টয়লেট পরিষ্কারের জন্য আয়া-মাসিদের সহজে পাওয়া যায়নি ফ্লোরে।’

তিনি আরও বলেন, ‘পরের দিন সকালে ৪ জন স্পেশালিষ্ট দেখেছেন; নিউরোসার্জন ও রেডিও-অনকোলজিস্ট ফাইনাল ডিশিসন দিলেন MRI with contrast করা লাগবেই, যদিও আমি বলেছিলাম ওর ৩টা MRI ও ৬টা CT scan করা ছিল। এটাও বলছিলাম, ও কি MRI করার মত ফিট আছে কিনা? ওনারা বলল, ফিট। এখানে বলে রাখা উচিত, ওর মেনিনজাইটিস ছিল কিন্তু এর আগের ৭ দিন কোন জ্বর ছিল না, ভাইটালস নরমাল কিন্তু GCS low ছিল গত ১ মাস ধরে। ২১/৭/২৬ এ CRP- 6 যেটা এর আগে CRP- 38 ছিল, নিম্নগামী ছিল। এভারকেয়ারের নিউরোসার্জন এ অবস্থায় ব্রেইন টিউমার রিসেকশনের ডিশিসন দিলেন। যদিও INDIA, USA ও Bangladesh-এর ৮ জন প্রফেসর সবাই নন-অপারেবল বলেছিলেন। ২১/৭/২৬ MRI with contrast করে রাতে কেবিনে আনার পর থেকে হাইগ্রেড জ্বর যেটা নাপা ইন্জেকশন দিয়ে কমাতে পারিনি। ২২/৭/২৬ সকাল ৯টায় রেডিয়েশন ও ICU এর ডাক্তার বলেন সুবীরকে ICU-তে শিফট করা লাগবে, আমি সাথে সাথে রাজি হয়ে গেলাম। এখানে বলা রাখা ভালো, এভারকেয়ারএ একাউন্টে আমার এডাভান্স টাকা দিয়ে রাখছিলাম, যাতে টাকার জন্য ওর চিকিৎসা বন্ধ না থাকে। দুপুর ২টায় কেবিনে ফিডিং দেয়, আর ২.২০-এ আমার ভাইয়ের সেশুরেশন ফল করে। আমার মা ৩০ মিনিট ধরে বলার পরও কোন চিকিৎসক আসেনি, আর যখন আসছে, তখন সব শেষ। আরো অনেক মিস ম্যানেজমেন্ট হয়ছে সব লিখে শেষ করা যাবে না।’

ডা. আবীর লেখেন, ‘আমার প্রশ্ন, সকাল ৯টায় ডিশিসন নেয়া হলো ICU-তে শিফট হবে কেন আমার ভাই বিকাল ২.৩৫-এ কেবিনেই মারা গেল? আজকে ৭ দিন গত হলো ভাই নেই, আমরা ২ ভাই ডাক্তার জেনেও যখন আপনারা অর্থের লোভে আনএথিক্যাল কাজ করেন, সাধারণ মানুষ কেমনে বুঝতে পারবে যে আপনারা সেবার নামে মানুষ মেরে ফেলার ফাঁদ তৈরি করে রেখেছেন? আবারও বলি, “আগে তোঁরা মানুষ হ”। পরপারে ভালো থাকিস ভাই; এই অসভ্যতা তোকে তোর অনাগত সন্তানের মুখদর্শন করতে দিল না।’

চিকিৎসায় অবহেলার ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয় সচেতন মহলে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। পাশাপাশি ডা. আবীরের দেওয়া পোস্টের কমেন্টে অনেক ভুক্তভোগীকে তাদের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরতে দেখা গেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. আবীর এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আমি শুধু মনটাকে হালকা করার জন্য পুরো ঘটনাটা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছি। এটি আসলে একটা সম্মিলিত অব্যবস্থাপনার ফসল এবং এর প্রতিকারের জন্য কোনো লড়াই করার আগ্রহ আমার নেই। আমি কোথাও কোনো অভিযোগও করতে চাই না। কারণ এখন অনেকে হয়তো বলছে পাশে থাকবে। কিন্তু বাস্তবতা সে রকম নয়। তা ছাড়া করপোরেট হাসপাতালের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ করার ইচ্ছেও আমার নেই।‘

অভিযোগ বিষয়ে জানতে এভারকেয়ার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও দীর্ঘ সময় ধরে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

এভারকেয়ার হাসপাতালের অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার (ব্র্যান্ড অ্যান্ড কমিউনিকেশন) মো. আল মামুনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, হাসপাতালের পিআর পার্টনার এই বিষয়ে যোগাযোগ করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানাবেন।

পরে হাসপাতালের পিআর পার্টনার কনসিটো পিআরের সহকারী মিডিয়া ব্যবস্থাপক রিপন ইসলাম এই প্রতিবেদককে ফোন করে মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) সন্ধ্যা নাগাদ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানানো হবে বলে আশ্বস্ত করেন।

তবে সন্ধ্যার পর যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, ‘হাসপাতাল ম্যানেজম্যান্ট এই বিষয় নিয়ে বেশ কয়েকটি সভা করেছে। তবে তারা বক্তব্য না দেওয়ায় কিছুই বলা যাচ্ছে না। পরে হাসপাতালের বক্তব্য পেলে জানানো হবে।’

এ বিষয়ে বুধবার (২৯ জুলাই) সহকারী মিডিয়া ব্যবস্থাপকের নম্বরে বার্তা পাঠানো হয়। এই রিপোর্ট প্রকাশ করার আগ পর্যন্ত কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বক্তব্য পেলে পরে সংবাদে তা হালনাগাদ করা হবে।