
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশ এক গণ-অভ্যুত্থানের সাক্ষী ছিল। ছাত্র-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত সেই আন্দোলনে দেশের পরিস্থিতি পাল্টে যায়। সে সময় বহু জীবন উৎসর্গ হয়েছিল, বহু মানুষ আহত হয়েছিল, আর তাদের পরিবারের ওপর নেমে এসেছিল অসীম শোক। রক্তাক্ত সেই স্মৃতিগুলো এখনো সবার মনে তাজা, কিন্তু সময়ের স্রোতে কিছু মানুষের অবদান হারিয়ে যায়, যাদের ত্যাগের বিনিময়ে আজকের বাংলাদেশ।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে সাভারের স্কুলছাত্র শহীদ আলিফ আহম্মেদ সিয়াম ছিল জুলাই আন্দোলনের রাজপথের সাহসী যোদ্ধা। জাহাঙ্গীরনগর স্কুলে তৃতীয় ও সপ্তম শ্রেণির ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে শিকার হয় কোটা-বৈষম্যের। কষ্ট ও ক্ষোভের আগুনে দগ্ধ এই কিশোরকে ১৬ জুলাই পুলিশের রাবার বুলেট ও টিয়ার শেলের আঘাত দমাতে না পারলেও, ৫ আগস্ট ঘাতকের বুলেট প্রাণ কেড়ে নেয় এসএসসি পরীক্ষার্থী আলিফের।
আন্দোলনের মাঠ থেকে শহীদ আলিফ তার মায়ের সঙ্গে শেষবার বলেছিল, ‘মা, এখান থেকে যদি আমি বেঁচে ফিরি বিজয়ের বেশে, তোমার কোলে ফিরব। আর যদি না ফিরি, তাহলে আমি শহীদ হব। তুমি হবে শহীদের মা।’ সন্তানের এই শেষ কথাগুলো আজও ভুলতে পারছেন না শহীদ আলিফের মা তানিয়া আক্তার।
বাগেরহাটের বড় বাঁশবাড়ীয়া গ্রামের বুলবুল কবিরের একমাত্র সন্তান আলিফ আহমেদ সিয়াম। ১০ মাস বয়সে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বাবার সঙ্গে চলে আসে সাভারের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন ইসলামনগর এলাকায়। এখানেই তার বেড়ে ওঠা। ডেইরি ফার্ম হাই স্কুলে তার পড়াশোনা শুরু।
আর দশটি শহীদ পরিবারের মতো শহীদ আলিফের পরিবার সন্তানের হত্যাকারীদের বিচার চান। কিন্তু বিচারপ্রক্রিয়ার ধীরগতি বা ব্যর্থতা দেখে তারা আজ চরম হতাশ। এই বিচারহীনতা তাদের শোককে আরও বাড়িয়ে তুলেছে বলে জানিয়েছেন শহীদ আলিফের পরিবার।
বিচার না পাওয়ার বেদনা
একমাত্র সন্তানকে হারানো আলিফের মা তানিয়া আক্তার এশিয়া পোস্টকে বলেন, 'আমাদের তো মনে হচ্ছে আমরা এবং বাংলাদেশের জনগণ যেটি চাচ্ছে না, সেটি তারা (বর্তমান সরকার) চাচ্ছে। যেমন বিচারের রায় হয়েছে কিন্তু কার্যকর হয়নি। ক্ষমতায় এসে এটি কার্যকর করার কথা ছিল। এ ছাড়া জুলাই সনদ স্বাক্ষর না হওয়া, এগুলোর বদলে আমর মনে হচ্ছে ফ্যাসিস্টদের ফিরিয়ে আনার জন্য যা যা করণীয় সেগুলো করছে তারা।’
তিনি বলেন, ‘মনে হচ্ছে সরকার জুলাই যোদ্ধা ও শহীদদের ভুলে যাচ্ছে, সাইড করে রাখছে, মনে রাখতে চাচ্ছে না তারা। এবং সেটা ভোটেই বুঝিয়ে দিয়েছেন, যেমন গণভোট বাস্তবায়নে স্বাক্ষর করেনি এবং হ্যাঁ ভোট, না ভোট যেটা হয়েছে, সেটাও মানছে না তারা। ফলে আমরা কী করে বুঝব যে দলীয় সরকার এসে আমাদের মনে রাখবে?’
কাদের কারণে সরকার, সেটা মন্তব্য করে তানিয়া আক্তার বলেন, ‘এমনকি তাদের অনেকে বলছে, এখন একাত্তরের যুদ্ধটাই যুদ্ধ, জুলাইয়ের যুদ্ধটা যুদ্ধ না। এটা স্পষ্ট ভাষায় বলতে না পারলেও আকারে-ইঙ্গিতে তা-ই বোঝাচ্ছে। কিন্তু এটা বুঝছে না তারা যে গত ১৫ বছর তারা ক্ষমতায় আসতে পারেনি, বাইরে বের হতে পারেনি, কোনো কিছুই করতে পারেনি। রাস্তায় দাঁড়ানোর মতো ক্ষমতা তাদের ছিল না। আজ তাদের দাঁড় করাল কারা? কারা ক্ষমতায় আনল তাদের? ক্ষমতায় এসে তারা সব ভুলে গিয়েছে।’
কেন এমনটি হচ্ছে বলে মনে করেন, এমন প্রশ্নের জবাবে আলিফের মা বলেন, 'কেন যে এমনটি হচ্ছে সেই প্রশ্নটি এখন আমারও। কেন এখন তারা আমাদের ভুলে গেল? নির্বাচনের আগে একরকম ছিল, নির্বাচনের পর পুরোপুরি পাল্টে গেছে। আমরা এমনটি আশা করিনি। আমরা ভেবেছিলাম যে ক্ষমতায় আসার আগে তারা যেভাবে আমাদের প্রতি সহানুভূতি দেখাচ্ছে, বিভিন্ন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে, খোঁজখবর নিয়েছে, আশ্বাস দিয়েছে। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর সব ভুলে গেছে। সরকারের কাছে প্রশ্ন, কেন এমন হলো? আমাদের অপরাধটা কী? আমাদের সন্তানরা যে মারা গেল, তাদের রক্তের বিনিময়ে ক্ষমতা পেল, সেই সরকার আমাদের ভুলে গেল?’
আলিফকে দেওয়া আশ্বাসের বাস্তবায়ন হয়নি
তানিয়া আক্তার বলেন, 'আমার ছেলের নামে একটি গেটের নামকরণ করার কথা ছিল। তা তো করলই না, বরঞ্চ যেখানে শহীদ হয়েছিল, সে জায়গায় একটি মেমোরি স্মৃতিস্তম্ভ করার কথা ছিল, তাও হয়নি। এখন শুধু আশ্বাসেই সীমাবদ্ধ সবকিছু। বর্তমান এমপিসহ ইউএনওদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি এ বিষয় নিয়ে, কোনো লাভ হয়নি।’
কেউ কথা রাখেনি, এমনটা আর্তনাদ করে শহীদ আলিফের মা বলেন, ‘আমাদের পুনর্বাসনের কথা বলেছিল, পরিবারে একজনকে সরকারি চাকরি দেওয়ার কথা ছিল, তাও বাস্তবায়ন হয়নি। খোঁজখবরই তো নিচ্ছে না। ওর (শহীদ আলিফের) বাবার শরীরের অবস্থা খুবই খারাপ। আমার একমাত্র সম্বল ছেলেকে নিয়ে আমার কত স্বপ্ন ছিল। ওর বাবার কিছু হয়ে গেলে আমাদের কী অবস্থা হবে জানি না। আমাদের উপার্জন করে খাওয়াবে কে, তাও ভাবতে পারছি না।’
জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন ঘুমাচ্ছে
সমালোচনা করে আলিফের মা বলেন, 'অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন থেকে খোঁজখবর নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ফাউন্ডেশনও এখন ঘুমিয়ে আছে, তাদের জাগাতে হবে। এখন সরকার আসছে, তারা ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে আছে। তাদের আবার কোন সরকার এসে জাগাবে, কে জানে? তখন আবায় হয়তো আমাদের খোঁজখবর নেবে।’
এরপর কেউ আর রাস্তায় নামবে না জানিয়ে তিনি বলেন, ‘শুনেছি জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের শত শত কোটি টাকা রাখার জায়গা নেই। কিন্তু যারা আন্দোলন করছে, তারা কিছুই পাচ্ছে না। বৈষম্য দূরের বদলে তারাই বৈষম্য তৈরি করেছে। বৈষম্য দূর করার জন্য আন্দোলন হয়েছিল। এখন সেই বৈষম্যই হচ্ছে। মাঝখান দিয়ে আমাদের সন্তান হারিয়েছি। আমরা মায়েরা সন্তানহারা হয়েছি আর কিছুই হয়নি। পরবর্তীতে যে ডাকবে, একটা মানুষও নামবে না তো রাস্তায়, নামার সাহস পাবে না তারা। কারণ আমাদের মতো নিরীহ মায়ের সন্তানগুলো মারা যাবে, পরে এই জীবনগুলোর আর কোনো মূল্য থাকে না। আমাদের সন্তানরা মরবে রাস্তায়, আর ওরা ফুর্তি করে খাবে, এটাই। কাকে ভালো বলব বলেন? আমাদের একটা আস্থা ছিল যে আর কেউ খোঁজ নিক বা না নিক, জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশন থেকে অন্তত খবর নেবে।’
এখনো যে স্বপ্ন দেখেন সন্তানকে নিয়ে
তানিয়া আক্তার বলেন, 'আমাদের ও রকম কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। আমাদের কোনো ক্ষোভ নেই, আর কোনো আশাও করি না। তবে সবচেয়ে বেশি খারাপ লাগে, ঈদের দিন বলেন আর এমনি দিন বলেন, মাঝেমধ্যে মনে হয় আমার সন্তানকে যদি ওরা ফিরিয়ে দিত। আমার সন্তান আমাকে মা বলে ডাকত, আমার কাছে এসে বসত, আমি শুয়ে আছি, সে আমাকে একটু উঠিয়ে দিত, আর আমাকে মা বলে ডাকত।’
কথাগুলো বলতে বলতে অঝোরে কাঁদতে শুরু করেন শহীদ আলিফের মা। সন্তানের মায়ায় এই প্রতিবেদকের সামনে কিছুক্ষণ কেঁদে আবার বলতে শুরু করেন, 'আপনাকে যে এই এত কথা বললাম, এটি দেয়নি, সেটি দেয়নি, আসলে এগুলো কোনো কথা না। সব থেকে বড় প্রয়োজন আমার সন্তানকে ফিরিয়ে দিক ওরা। টাকাপয়সা বড় বিষয় না, আমাদের খোঁজখবর নেওয়াটাই বড়।’
কেউই মূল্যায়ন করতে পারেনি অভিযোগ করে আলিফের মা বলেন, ‘মনের কষ্ট হচ্ছে আমার সন্তানের লাশ যারা কাঁধে নিয়েছে, যারা আমার সন্তানকে কবর দিয়েছে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের যাদের সঙ্গে আমার ছেলে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছে, তারাও আজ আমাদের ভুলে গেল!’
শহীদ আলিফের মায়ের দাবি
ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, 'আশা ছিল আমার সন্তানের নামে একটা গেট অথবা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলের নামকরণ হবে, তাহলে বৃদ্ধ বয়সেও সন্তানের একটা স্মৃতি দেখতে পেতাম। তাকিয়ে দেখতাম আমার সন্তানের নাম এখানে আছে, হাজারো সন্তান পড়াশোনা করছে। কিন্তু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সেটা করেনি।’
ছেলের বিষয়ে কথা হয় শহীদ আলিফের বাবা বুলবুল কবিরের সঙ্গে। এশিয়া পোস্টকে তিনি বলেন, 'আমার ছেলে বেঁচে থাকলে এ বছর ১৭ বছরে পা দিত। আমি এখন বাড়িতে। এই বছর প্রথম ঈদ বাড়িতে করেছি ছেলের কবর সামনে নিয়ে। আমাদের ঈদ শেষ হয়ে গেছে ৫ তারিখেই। সমাজে চলতে হয় তাই চলি। আল্লাহ বাঁচিয়ে রেখেছেন তাই খাচ্ছি। এ ছাড়া আর কোনো আনন্দ নেই।’
তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় ড. ইউনূস বলেছিলেন আমাদের ৩০ লাখ টাকা অনুদান দেবেন, সেটার কিছু অংশ পেয়েছি এবং গত জুলাই থেকে একটি ভাতার টাকা অ্যাকাউন্টে এসেছে। দেখেন টাকাপয়সা তো বড় কথা না, আমার সন্তান হচ্ছে বড়। আর এই সরকার আসার আগে সবই আম্বাস দিয়েছে। কিন্তু প্রথমেই একটা গাদ্দারি করল। আমি বিএনপি করে এলাকা ছেড়েছিলাম, আমি একটি ইউনিয়নে যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলাম এবং ওয়ার্ড যুবদলের সভাপতি ছিলাম। তিনটা মামলা খেয়ে আমি বাড়ি ছেড়ে চলে যাই। ১৫ বছর ঢাকায় ছিলাম। পুরো জাহাঙ্গীরনগর এলাকা জানে যে আমরা বাপ-ছেলে একসঙ্গে আন্দোলন করেছি। সাধারণত কোনো বাবা তার সন্তানকে আন্দোলনে নামায় না। আর আমি সেই বাবা, কলঙ্কিত বাবা যে তার ছেলেকে নিয়ে রাজপথে ছিলাম। সরকার প্রথমে এসেই জুলাই সনদ সই করল না। হ্যাঁ ও না ভোটের মূল্যায়ন করল না। তারেক সাহেব বলেছিলেন সবাইকে হ্যাঁ ভোট দিতে। আমরা বুঝি, হয়তোবা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য এ কথা বলেছিলেন, কিন্তু ক্ষমতায় আসতে না আসতেই যদি বলে হ্যাঁ ভোটের ভ্যালু নেই, শহীদদের স্বীকৃতি জুলাই সনদে সই করল না, তাহলে আমরা এই সরকারের কাছে কী আশা করতে পারি?’
‘একটা ঈদ গেল। জুলাইয়ে যারা শহীদ পরিবার আছে, তাদের একটা খোঁজখবর নেওয়া উচিত ছিল। দ্বিতীয়ত যারা আহত আছে, তাদের খোঁজখবর এবং যারা এখনো চিকিৎসাধীন, তাদের খোঁজখবর নেওয়ার নির্দেশ দিতে পারতেন যার যার এলাকার এমপি। এটাই আমাদের চাওয়া-পাওয়া। টাকাপয়সা মুখ্য নয়, আমরা ভাতা পাচ্ছি, ঈদ উপলক্ষে একটি বোনাস পেয়েছি, কিন্তু মূল্যায়নটা হচ্ছে বড় বিষয়। আমি চাই যারা আহত, একটা চোখ নেই, হাত নেই, তাদের চিকিৎসাটা আগে করা উচিত।’
শহীদ আলিফের ছোট বোন অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইসরাত জাহান লামহা এশিয়া পোস্টকে বলে, আমরা একটা ধারণা করেছিলাম যে সবাই আমাদের ভুলে যাবে। আর এবার সেটিই দেখলাম। সবাই ভুলে গিয়েছে আমাদের। জাহাঙ্গীরনগরের পরিচিত দু-একজন বড় ভাইয়া ফোন করেছিল। এ ছাড়া কোনো রাজনৈতিক দল বা কোনো সংস্থা থেকে আমাদের কোনো খোঁজখবর নেয়নি।’
সে আরও বলে, ‘গত বছর প্রথম ভাইয়াকে ছাড়া ঈদ পালন করেছি, খুব খারাপ লেগেছিল, তখন অনেকে খোঁজখবর নেওয়ায় কষ্ট কিছুটা কম হয়েছিল। আর এ বছর ভাইয়ার কবরের সামনে ঈদ উদযাপন করছি এবং কেউ একটু খবর নেয়নি। ভাইয়ের কবরের সামনে দাঁড়িয়ে একটি ছোট বোনের আর কিছু বলার নেই।‘
এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইফুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, এ বছর জুলাই যোদ্ধা বা শহীদ পরিবারের জন্য আলাদা করে আমাদের সহযোগিতা করার কোনো নির্দেশনা আসেনি। আমরা নির্দেশনা বাস্তবায়ন করি, সিদ্ধান্ত দিতে পারি না।




