‘শিক্ষকও হাসবেন-কাঁদবেন, বৃষ্টিতে ভিজবেন-প্রকৃতিকে ভালোবাসবেন’

‘শিক্ষক মানেই তিনি মানুষ নন এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। শিক্ষকও হাসবেন, কাঁদবেন, বৃষ্টিতে ভিজবেন, প্রকৃতিকে ভালোবাসবেন। তার কাছ থেকে শালীনতা, দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতা যেমন প্রত্যাশিত। তেমনি তার অনুভূতিকে অস্বীকার করা যায় না।’
ফেসবুক পোস্টে এসব কথা লেখেন সাংবাদিক রিমু সিদ্দিক। পোস্টে তিনি নিজের একটি ভিডিওজুড়ে দিয়েছেন। ভিডিওতে ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ গান যুক্ত করে তিনি আও লেখেন–‘সমালোচনা হওয়া উচিত দায়িত্বহীনতা, দুর্নীতি বা অনৈতিক আচরণ, শিশু বলাৎকারের বিরুদ্ধে। সুস্থ শিল্প আর নির্মল আনন্দের বিরুদ্ধে নয়।’
সম্প্রতি সিলেটের এক নারী শিক্ষককে ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ গানের সঙ্গে ভিডিও বানিয়ে ফেসবুকে শেয়ার করায় সমালোচনা সৃষ্টি হয়। সমালোচনার প্রতিবাদ জানিয়ে সাংবাদিক রিমু সিদ্দিক পোস্টটি শেয়ার করেন।
রিমু সিদ্দিক আরও লেখেন, ‘বিউটি রানী পালের গানে আমারও একটুখানি বৃষ্টি উপভোগ। বৃষ্টি কখনও উল্লাস, কখনও আনন্দ, কখনও বিরহ আবার কখনও বেদনা। প্রত্যেকে নিজের অনুভূতি দিয়ে বৃষ্টিকে উপলব্ধি করে। তাই প্রকৃতিকে উপভোগ করা অশালীনতা বা অপরাধ হিসেবে দেখার কোনো কারণ দেখি না। একজন শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষকের বৃষ্টি উপভোগ করা দোষের না। বরং সেটিকে অশালীনতা বা অপরাধ এমন ধারণা সমাজকে আরও সংকীর্ণ করে।
তিনি লেখেন, ‘কিন্তু একজন শিক্ষকের কয়েক সেকেন্ডের বৃষ্টি উপভোগ করাকে সামাজিক অপরাধ বানিয়ে ফেলা আমাদের সামাজিক মানসিকতার সংকীর্ণতারই প্রতিফলন। আর এটিকে এত বড় বিতর্কে পরিণত করাও অযৌক্তিক। বিউটি রানী পালের বৃষ্টির গানে আমারও একটুখানি বৃষ্টি উপভোগ। বৃষ্টি তো শেষ পর্যন্ত অনুভূতিরই আরেক নাম।’
সমালোচনার মুখে পড়া বিউটি রানী পাল সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ভিডিও বানানোর কারণে জেলা পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ এই স্কুল শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি ওঠে।
বিউটি রানী পাল সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিক। তিনি ২০২৬ সালে জেলা পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হন।
সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া এক ভিডিওতে দেখা যায়, ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ গানের সঙ্গে স্কুল প্রাঙ্গণে হাঁটাহাঁটি করছেন বিউটি। শাড়ি পরিহিত বিউটির এই ভিডিও নিয়ে ট্রল শুরু হয়।
এমন পরিস্থিতিতে বিউটি পালের পাশে দাঁড়িয়েছেন তার সহকর্মীসহ নানা পেশার মানুষ। বিউটি পালকে নিয়ে ট্রলের প্রতিবাদ জানাচ্ছেন সারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষকরা। বিউটি পালের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে ফেসবুকে একই গানের সঙ্গে নিজের ভিডিও প্রচার করছেন তারা।
বিভিন্ন মিমস ছড়িয়ে পাল্টা প্রতিবাদ শুরু করেন। একই গানের সঙ্গে ভিডিও বানিয়ে ফেসবুকে শেয়ার করতে শুরু করেন। এরই মধ্যে তা ব্যাপক জনপ্রিয়তাও পেয়েছে। ফেসবুকে এ গানটিও এখন ট্রেন্ডিংয়ে রয়েছে।
রাজবাড়ীর একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা রাহেলা আক্তার ফেসবুকে লেখেন, ‘শিক্ষকদেরও ব্যক্তিগত জীবন আছে। তারা গাইতে পারে, নাচতে পারে। ফেসবুকে নিজের ছবি ও ভিডিও শেয়ার দিতেও পারে। এ নিয়ে সমালোচনা করার কারণ কী বুঝছি না।’

আরেক শিক্ষক হাসনাহেনা শাপলা লেখেন, ‘সব দোষ প্রাইমারি শিক্ষকদের। শিক্ষক তুমি নাচবে কেন, গাইবে কেন, ফেসবুকে আসবে কেন, স্বাধীনতা তোমার থাকবে কেন? তুমি জানো না তুমি শিকলে বাঁধা? এ আমার নীরব প্রতিবাদ।’
উম্মে কুলসুম নামের আরেক শিক্ষক লেখেন, ‘শিক্ষক মানে কি শুধু ক্লাসরুম, খাতা-কলম আর দায়িত্বের বোঝা? শিক্ষকরাও মানুষ, তাদেরও মন আছে, অনুভূতি আছে, আনন্দ-বেদনা আছে। শিক্ষকদের রোবট ভাববেন না। একজন শিক্ষক একটু হাসতে চায়, একটু আনন্দ করতে চায়, নিজের মনকে একটু ভালো রাখতে চায়। কারণ, একজন প্রফুল্ল আর মানসিকভাবে ভালো থাকা শিক্ষকই তার শিক্ষার্থীদের আরও সুন্দরভাবে শেখাতে পারেন। তাই অযথা ট্রল নয়, আসুন একে অপরের প্রতি সম্মান ও সহমর্মিতা দেখাই।’
গানের সঙ্গে ভিডিও দিয়ে শিক্ষক দিপা মন্ডল লেখেন, ‘শিক্ষকদের নাকি নাচ, গানে, অভিনয়ে পারদর্শী হতে হয়। তবে আজ কেন এত কথা? যন্ত্রের মত শুধু শ্রেণিতে সব কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ক্লাসে পাঠে মনোযোগী করতে, একঘেয়েমি দূর করতে, পাঠে আনন্দের সঙ্গে উপস্থাপন করতে শিক্ষককে সব করতে হবে। আর সেই শিক্ষকের কোন মন থাকবে না, থাকবে না কোন আনন্দের মুহূর্ত। এটাই তো? একজন সম্মানিত শিক্ষক শাড়ি পরিহিত অবস্থায় কী করে অশ্লীলতা প্রকাশ করতে পারে? সে তো প্যান্ট, শার্ট বা টপস পরিহিত ছিলেন না। তবে হোক প্রতিবাদ।
অ্যাকটিভিস্ট শহীদুজ্জামান পাপলু লেখেন, ‘শ্রাবণের হাওয়া যখন উতাল-পাতাল হয়ে বইতে থাকে, তখন মনও একটু দুলবে। এটাই তো স্বাভাবিক। হাজারো ব্যস্ততা আর মানসিক চাপের মাঝেও যদি কেউ প্রকৃতির সৌন্দর্যে কিছুক্ষণ আনন্দ খুঁজে নেয়, তাতে আপত্তির কী আছে?’
শিশু সাহিত্যিক হুমায়ুন কবীর ঢালী লেখেন, ‘একজন শিক্ষকও রক্ত-মাংসের মানুষ। তারও আনন্দ উদ্যাপন করার অধিকার আছে, তেমনি কষ্টে মন খারাপ হওয়ার অধিকারও তার রয়েছে। শিক্ষক মানেই কোনো নিরাসক্ত যন্ত্র নন, সমাজ ও পরিস্থিতির প্রভাবে তার মনেও নানা অনুভূতির জন্ম হয়।’
তিনি লেখেন, ‘যা অশ্লীল, তা শুধু শিক্ষকের ক্ষেত্রে নয়, সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রেও অশ্লীল। একইভাবে, যা শ্লীল, মার্জিত ও সুন্দর তা নির্দিষ্ট কোনো পেশার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা সকলের জন্য প্রযোজ্য। শিক্ষক সমাজের পথপ্রদর্শক হলেও দিনশেষে তিনিও সমাজেরই একজন মানুষ।’
সাংবাদিক ঝরনা মনি লেখেন, ‘বিউটি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। ওরা ছোটবেলায় মাকে হারিয়েছে। আমরা এক সাথে বড় হয়েছি। আমাদের বাড়ির পুকুরে একসঙ্গে সাঁতার কাটতাম। সন্ধ্যায় ওদের অঙ্ক শেখাতাম। চুল বেনি করে দিতাম। একসঙ্গে গান গাইতাম। ধামাইল নাচ করতাম।’
তিনি লেখেন, ‘আমরা স্কুলের প্রতিটি অনুষ্ঠানে বিজয় দিবসই হোক, আর একুশে ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবসই হোক নাচ, গান, আবৃত্তি, উপস্থিত বক্তৃতা হতোই।’
জানতে চাইলে বিউটি পাল বলেন, ‘এটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। মানুষের ব্যক্তিগত লাইফ থাকতে পারে না? একজন শিক্ষক যখন একটি জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক নির্বাচিত হন, তখন নিশ্চয় ধরে নিতে হয় তিনি তার যোগ্যতা, দক্ষতা, নিষ্ঠা ও কর্মের মাধ্যমে এই সম্মান অর্জন করেছেন। তিনি একজন শিক্ষক, কিন্তু তার আগে তিনি একজন মানুষ, একজন নারী। তারও একটি মন আছে, আনন্দ আছে, ভালো লাগা আছে, নিজের মতো করে বাঁচার অধিকার আছে।’
.png)






