রাজারহাটে চামড়া ব্যবসায়ীদের মাথায় হাত

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সবচেয়ে বড় চামড়ার মোকাম যশোরের রাজারহাটে এবার কোরবানি-পরবর্তী মৌসুমি বাণিজ্য জমেনি। যে হাটে ঈদের পর মাসজুড়ে লক্ষাধিক কাঁচা চামড়া ওঠা ছিল নিয়মিত চিত্র, সেখানে এবার উঠেছে মাত্র ৩০ হাজারের মতো। ফলে হাটের চিরচেনা ব্যস্ততা যেমন কমেছে, তেমনি ধস নেমেছে কেনাবেচায়। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন ক্ষুদ্র ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা।
ঈদের পর গত এক মাস রাজারহাট চামড়া মোকাম ঘুরে ব্যবসায়ী, আড়তদার, প্রাণিসম্পদ বিভাগ, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে, গত বছরের তুলনায় হাটে ক্রেতার উপস্থিতি অনেকাংশে কমেছে। বিশেষ করে ঢাকার ট্যানারি মালিক ও বড় ক্রেতাদের সরাসরি অংশগ্রহণ আগের মতো নেই। এতে প্রতিযোগিতামূলক দর গড়ে উঠছে না। বাজারের নিয়ন্ত্রণ স্থানীয় বড় আড়তদারদের হাতেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের।
রাজারহাটে তিন শতাধিক আড়ত রয়েছে। খুলনা বিভাগের ১০ জেলা ছাড়াও রাজশাহী, পাবনা, নাটোর, ফরিদপুর ও ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীরা এখানে চামড়া কেনাবেচা করেন। প্রায় ১০ হাজার মানুষের জীবিকা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ বাজারের সঙ্গে জড়িত। প্রতিবছর কোরবানি-পরবর্তী এক মাসে এই মোকামে এক লাখের বেশি চামড়া উঠলেও এবার ৩০ জুন পর্যন্ত মাত্র ৩০ হাজারের মতো চামড়া এসেছে বলে জানায় বাজার সমিতি।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আলিম হোসেন ও জামাল হোসেন অভিযোগ করে বলেন, এবার বড় আকারের ভালো চামড়া ৯০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা, মাঝারি ৬০০ থেকে ৮০০ এবং ছোট চামড়া ৪০০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। তবে অনেক ভালো চামড়াকেও ‘লাম্পি স্কিন ডিজিজ’ (পশুত্বক রোগ), ‘করোনা’ বা ‘পক্স’ আক্রান্তের অজুহাত দেখিয়ে মাত্র ১৫০ থেকে ২৫০ টাকায় কিনে নেওয়া হয়েছে। তারা বলছেন, সরকারি দামের ওপর ভরসা করে মাঠ পর্যায় থেকে বেশি দামে চামড়া কিনলেও হাটে এসে সেই দাম আর পাওয়া যায়নি।
সাতক্ষীরার কলারোয়ার আফসার হোসেন ও খুলনার বটিয়াঘাটা এলাকার রহিম শেখ নামে দুই মৌসুমি ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, এখন বাইরের বড় ক্রেতা কম আসায় স্থানীয় আড়তদাররাই কার্যত বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন। ফলে চামড়া নিয়ে হাটে এলে বিক্রি করা ছাড়া উপায় না থাকায় লোকসান দিয়েই তা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন তারা।
যশোর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির নেতারা সিন্ডিকেটের অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, বাজারে ত্রুটিযুক্ত চামড়ার পরিমাণ বেড়েছে। এসব চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় সহজেই নষ্ট হয়ে যায়, তাই দামও কম। একই সঙ্গে তারা স্বীকার করেন, সরকার যে মূল্য নির্ধারণ করে দেয়, বাস্তবে সেই দামে বাজার পরিচালিত হয় না; কারণ মূল্য নির্ধারণে ট্যানারি মালিকদের ভূমিকাই প্রধান।
বৃহত্তর যশোর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিন মুকুল বলেন, প্রতিবছর কোরবানি-পরবর্তী এক মাসে এক লাখের বেশি চামড়া উঠলেও এবার মাত্র ৩০ হাজারের মতো চামড়া এসেছে। এছাড়া বাজারে নগদ অর্থের সংকট, ট্যানারি মালিকদের বকেয়া পরিশোধে বিলম্ব, লবণসহ প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যয়ের বৃদ্ধি এবং বাইরের ক্রেতা কমে যাওয়ার কারণে বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। পরিস্থিতি উত্তরণে তিনি কাঁচা বা ‘ওয়েট ব্লু’ চামড়া সরাসরি রপ্তানির সুযোগ দেওয়ার দাবি জানান।
যশোর সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ ফারুক হোসেন বলেন, কোরবানির পশুর হাটগুলোতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ‘লাম্পি স্কিন’ আক্রান্ত পশু দেখা যায়নি। তাই রোগের অজুহাতে বিপুল পরিমাণ চামড়ার মূল্য কমিয়ে দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের যশোর কার্যালয়ের সিনিয়র কৃষি বিপণন কর্মকর্তা কিশোর কুমার সাহা বলেন, সরকার নির্ধারিত দামে চামড়া বিক্রি নিশ্চিত করতে আমরা বাজার তদারকি করেছি এবং ব্যবসায়ীদের উদ্বুদ্ধ করেছি। তবে আইনগতভাবে কাউকে নির্দিষ্ট দামে কেনাবেচায় বাধ্য করার সুযোগ নেই।





