হুমকিতে সুন্দরী, বিলুপ্তির শঙ্কা

বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত। ইউনেসকো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যের এ বন দেশের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং উপকূলীয় অঞ্চলকে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সুরক্ষা দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সুন্দরবনের নামও এসেছে সুন্দরী গাছের নাম থেকে। একসময় বনটির বড় অংশজুড়ে আধিপত্য ছিল এ বৃক্ষের।
সুন্দরী গাছ শুধু বনজ সম্পদ নয়, উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তিও। এর শিকড় ভূমিক্ষয় রোধ করে এবং ঝরা পাতা ও শিকড় মাছ, চিংড়িসহ বিভিন্ন জলজপ্রাণীর আবাসস্থল তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে আগা মরা (টপ ডাইং) রোগ ও লবণাক্ততার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের সঙ্গে লড়াই করতে থাকা সুন্দরবনের প্রধান এই বৃক্ষ নতুন এক হুমকির মুখে পড়েছে। বনজুড়ে দ্রুত বিস্তার লাভ করছে পরজীবী উদ্ভিদ বা পরগাছা, যা সুন্দরী গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত করে ধীরে ধীরে গাছকে দুর্বল করে দিচ্ছে। বন বিভাগ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আগামী কয়েক দশকে সুন্দরবনের পরিচয়বাহী এ বৃক্ষের অস্তিত্বই সংকটের মুখে পড়তে পারে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, আগে পরগাছা মূলত গাছের ডালপালা ও শাখা-প্রশাখায় দেখা গেলেও বর্তমানে তা সুন্দরী গাছের কাণ্ড ও মূল অংশেও ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে আক্রান্ত গাছ দ্রুত রোগাক্রান্ত হয়ে শুকিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর বিস্তার উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাওয়ায় বন সংরক্ষণ সংশ্লিষ্টদের উদ্বেগও বাড়ছে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ভোলা নদীর প্রায় ১৬ কিলোমিটার অংশ দীর্ঘদিন ধরে পলি জমে ভরাট হয়ে স্থানীয়ভাবে ‘মরা ভোলা’ নামে পরিচিত হয়েছে। নদীর নাব্য কমে যাওয়ায় বনাঞ্চলের অভ্যন্তরীণ খালগুলোতেও পানিপ্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে উদ্ভিদবৈচিত্র্যের ওপর।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, পানির স্বাভাবিক প্রবাহ কমে যাওয়ায় সুন্দরীসহ বিভিন্ন ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ দুর্বল হয়ে পড়ছে। ফলে আগা মরা রোগ ও পরগাছার আক্রমণও বাড়ছে। বনাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে ইতোমধ্যে অসংখ্য সুন্দরী গাছ শুকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের অংশে সুন্দরবনের আয়তন প্রায় ৬ হাজার ৫১৭ বর্গকিলোমিটার। এখানে শতাধিক প্রজাতির উদ্ভিদ এবং শত শত প্রজাতির বন্যপ্রাণীর আবাস রয়েছে। বন ও বননির্ভর সম্পদের ওপর নির্ভর করে প্রায় ১০ লাখ মানুষের জীবিকা। মাছ ও কাঁকড়া আহরণ, মধু সংগ্রহ, গোলপাতা সংগ্রহ এবং পর্যটন খাতের সঙ্গে জড়িত অসংখ্য মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. ওয়াসিউল ইসলাম বলেন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সুন্দরবনের পরিবেশ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আগা মরা রোগ ও পরগাছার কারণে সুন্দরী গাছের সংখ্যা কমে গেলে পুরো খাদ্যশৃঙ্খল ও বাস্তুতন্ত্র মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।
তিনি আরও বলেন, পরগাছা নিয়ন্ত্রণ, লবণাক্ততা মোকাবিলা এবং নদী-খাল পুনঃখননের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া সুন্দরবনের প্রধান বৃক্ষ সুন্দরীকে রক্ষা করা কঠিন হবে।

সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, পরগাছা বর্তমানে সুন্দরী গাছের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বনাঞ্চলের প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ সুন্দরী গাছে এর আক্রমণের লক্ষণ দেখা গেছে। বিষয়টি উদ্বেগজনক। এ পরজীবী উদ্ভিদের বিস্তার রোধে দ্রুত গবেষণা ও কার্যকর ব্যবস্থার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, সুন্দরবন সুরক্ষা প্রকল্পের আওতায় ভরাট হয়ে যাওয়া ভোলা নদীর কিছু অংশ খনন করা হয়েছে। বর্তমানে কাজ স্থগিত থাকলেও ভবিষ্যতে নদীর অবশিষ্ট অংশ খননের পরিকল্পনা রয়েছে। ভোলা নদীতে পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক হলে বনের বিস্তীর্ণ এলাকায় জলপ্রবাহ বাড়বে, পরিবেশগত ভারসাম্য ফিরবে এবং সুন্দরবনের সজীবতা পুনরুদ্ধারে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আমরা আশা করছি।






