ক্লাস শেষে বাদাম বেচে সংসার চালায় শিশু মাহিম

শৈশবের রঙিন দিনগুলোতে যেখানে পড়াশোনার পাশাপাশি বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা করার কথা, সেখানে অভাবের সংসারের হাল ধরতে হয়েছে মেহেরপুর সদর উপজেলার ইসলামপুর গ্রামের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী মাহিমকে। স্কুল শেষে ছোট্ট সাইকেলে বাদামের প্যাকেট নিয়ে জীবিকার সন্ধানে বের হতে হয় তাকে।
শিশু মাহিম স্থানীয় ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। বাবা আব্দুল মান্নানের মৃত্যুর পর এই বয়সেই তার ওপর এসে পড়েছে সংসারের বড় দায়িত্ব।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ২০ বছর আগে পানিতে ডুবে মারা যায় মাহিমের এক ভাই। এরপর প্রায় দেড় বছর আগে স্ট্রোকে মারা যান তার বাবা আব্দুল মান্নান। একমাত্র বোনের বিয়ে হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে মা শিল্পী খাতুনকে নিয়েই থাকেন মাহিম। সংসারের আয় বলতে এখন তার বাদাম বিক্রির টাকাই একমাত্র ভরসা। প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে মা শিল্পী খাতুন প্রায় ৫০ প্যাকেট বাদাম ভেজে ছেলের জন্য প্রস্তুত করে দেন। মাহিম স্কুলের পোশাক পরে খাওয়াদাওয়া শেষে সেই বাদামের প্যাকেট নিয়ে সাইকেলে চেপে স্কুলে যায়। ক্লাস শেষে সহপাঠীরা যখন বাড়ি ফিরে খেলাধুলায় মেতে ওঠে, তখন মাহিম নেমে পড়ে বাদাম বিক্রিতে।
মাহিমের মা শিল্পী খাতুন বলেন, যে বয়সে আমার ছেলে স্কুল শেষে বাড়ি ফিরে লেখাপড়া করবে, বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা করবে, সেই বয়সে তাকে সংসারের জন্য বাদাম বিক্রি করতে হচ্ছে। মা হিসেবে এর চেয়ে কষ্টের আর কী হতে পারে? কিন্তু অভাবের কাছে আমি নিরুপায়।
তিনি আরও জানান, এখন পর্যন্ত তারা সরকারি কোনো সহযোগিতা পাননি। প্রতিদিন বাদাম বিক্রি করে মেহেরপুর শহর থেকে নতুন বাদাম কিনে আনে মাহিম। টানা বৃষ্টিতে ভিজে বাদাম বিক্রি করতে গিয়ে বর্তমানে সে জ্বরে ভুগছে। কিন্তু সংসারের তাগিদে এই অসুস্থ শরীরেও তাকে প্রতিদিন বের হতে হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রায় প্রতিদিনই মাহিমকে সাইকেলে করে বাদাম বিক্রি করতে দেখা যায়। তার এই সংগ্রামী জীবন এলাকার মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। তারা সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষদের শিশুটির পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।
ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মাহিমের জন্য প্রয়োজনীয় বই, খাতা ও কলমের ব্যবস্থা করেছে। পাশাপাশি তার পড়ালেখা যেন বন্ধ না হয়, সেজন্য স্কুল থেকে তাকে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।
মেহেরপুর সদর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. আনিছুর রহমান জানান, আগামী আগস্ট মাসের শেষ দিকে মাহিমের মায়ের জন্য বিধবা ভাতার ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি ইউনিসেফের আওতায় ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা শিশু হিসেবে মাহিমকে শিক্ষাবৃত্তির অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া সমাজসেবা কার্যালয় থেকেও পরিবারটিকে সম্ভাব্য সহায়তার আশ্বাস দেন তিনি।
.png)





