Advertisement

ময়মনসিংহ মেডিকেলে জুলাইতেই ৭ মাসের রেকর্ড ভাঙল ডেঙ্গু

কামরুজ্জামান মিন্টু, ময়মনসিংহ
ময়মনসিংহ মেডিকেলে জুলাইতেই ৭ মাসের রেকর্ড ভাঙল ডেঙ্গু
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। ছবি: এশিয়া পোস্ট

বর্ষা শুরু হতেই ময়মনসিংহে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে ডেঙ্গু। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে যত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, জুলাই মাসে সেই সংখ্যাকে অনেকটা ছাড়িয়ে গেছে।

শনিবার (১ আগস্ট) সকাল পর্যন্ত ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডেঙ্গু তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৪৯৭ জন। এরমধ্যে মৃত্যু হয়েছে ৬ জনের।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের শুরু থেকে ২২ জুলাই সকাল পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩৪৬ জন। এর মধ্যে শুধু জুলাই মাসে ভর্তি হয়েছেন ৩৬০ জন। বিপরীতে জানুয়ারি থেকে জুন —এই ছয় মাসে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ১২৬।

জুলাইয়ে রোগীর সংখ্যা আগের ছয় মাসের তুলনায় প্রায় ৭৪ শতাংশ বেড়েছে। চলতি বছর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ডেঙ্গুতে মারা গেছে ছয়জন। এর মধ্যে ফেব্রুয়ারিতে একজন, জুনে তিনজন এবং জুলাইয়ে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালের পৃথক ডেঙ্গু ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে গত ২ জুলাই। এর আগে বিভিন্ন ওয়ার্ডে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হলেও রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকায় আলাদা ওয়ার্ডের প্রয়োজন হয়।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য বলছে, প্রতি বছর জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুর সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি থাকে। গত বছরও একই চিত্র দেখা যায়। গত বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ১৭৬ জন রোগী এবং মৃত্যু হয়েছিল একজনের। তবে আগস্ট থেকে ডিসেম্বর- এই পাঁচ মাসেই ভর্তি হন ২ হাজার ২২৭ জন, মারা যান ২৮ জন। তবে চলতি বছরের জুলাইতে এই ওয়ার্ডেই ভর্তি হয়েছেন ৩৬০ জন রোগী। তাদের মধ্যে শতাধিক ময়মনসিংহ জেলার বাসিন্দা। জেলার রোগীদের প্রায় ৫৬ শতাংশই সিটি করপোরেশন এলাকার। সবচেয়ে বেশি রোগী এসেছেন নগরীর নওমহল, আকুয়া মাদ্রাসা কোয়ার্টার ও বাউন্ডারি রোড এলাকা থেকে।

জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বাইরে জেলার ১২টি উপজেলায় আরও ৩৫ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের মধ্যে বর্তমানে পাঁচজন হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।

ময়মনসিংহ মেডিকেলে ডেঙ্গু ওয়ার্ড। ছবি: এশিয়া পোস্ট
ময়মনসিংহ মেডিকেলে ডেঙ্গু ওয়ার্ড। ছবি: এশিয়া পোস্ট

শনিবার (১ আগস্ট) বিকেলে সরেজমিনে ময়মনসিংহ মেডিকেলের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন বয়সি ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী শয্যায় শুয়ে আছে। আবার অনেকেই শয্যা না পেয়ে মেঝেতেই চিকিৎসা নিচ্ছে।

এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ভর্তি হয়েছেন আরও ১১ জন। এ সময়ের মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ১১ জন। বর্তমানে হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে ভর্তি আছেন ৫৪ জন। এরমধ্যে পুরুষ ৩৫ জন, নারী ১৮ জন ও শিশু রয়েছে একজন। ডেঙ্গু আক্রান্তদের বড়ো অংশই ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন এলাকার বাসিন্দা। সংক্রমণের হার বিবেচনায় নগরের ৬, ১০, ১১, ১২, ১৩ ও ১৪ নম্বর ওয়ার্ডকে ‘স্পেশাল জোন’ ঘোষণা করেছে সিটি করপোরেশন।

সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত আক্রান্ত ছিলেন মাত্র চারজন। জুনে আক্রান্ত হন আটজন। আর ২১ জুলাই পর্যন্ত নতুন আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৮ জন। সব মিলিয়ে চলতি বছরে আক্রান্ত হয়েছেন ৭০ জন, যাদের মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে।

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত কয়েকজন রোগী ও তাদের স্বজনরা জানান, প্রথম দিকে অনেকেই সাধারণ জ্বর বা টাইফয়েড ভেবে চিকিৎসা নিয়েছেন। ফলে সময়মতো ডেঙ্গু শনাক্ত না হওয়ায় কারও কারও শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে। একাধিক রোগীর প্লাটিলেট উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় রক্ত ও নিবিড় পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন হয়েছে।

ডেঙ্গু ওয়ার্ডে ভর্তি জেলার ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার কাছিমপুর গ্রামের বাসিন্দা তাসলিমা আক্তার (২০) জানান, প্রথমে স্থানীয় ফার্মেসি থেকে ওষুধ খাওয়া হয়। পরে চিকিৎসক টাইফয়েড সন্দেহে সাত দিন ইনজেকশন দিলেও জ্বর কমেনি। এরপর ময়মনসিংহ মেডিকেলে আসার পর ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। এখনো তেমন উন্নতি হয়নি।

ময়মনসিংহ শহরে এ জলাধারে তৈরি হয় এডিস মশা। ছবি: এশিয়া পোস্ট
ময়মনসিংহ শহরে এ জলাধারে তৈরি হয় এডিস মশা। ছবি: এশিয়া পোস্ট

ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর একটি চরপাড়া এলাকা। এই এলাকার বাসিন্দা আহম্মেদ হোসেন বলেন, মশার উপদ্রব আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। নিয়মিত ওষুধ ছেটানো হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল মিলছে না। সন্ধ্যার পর ঘরের বাইরে থাকা তো দূরের কথা, ঘরের ভেতরেও স্বস্তিতে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।

বাঁশবাড়ি কলোনি এলাকার গৃহিণী মরিয়ম খাতুন বলেন, মশার ভয়ে রাতে ঘুমানো যায় না। দিনে কিছুটা কম থাকলেও রাতে মশার উপদ্রব অনেক বেশি। সিটি করপোরেশন থেকে ওষুধ দেওয়া হলেও তাতে তেমন কোনো ফল পাওয়া যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে ওষুধেও ভেজাল রয়েছে।

ময়মনসিংহের সিভিল সার্জন ডা. ফয়সল আহমেদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম ও জনসচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে।

ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. রুকুনোজ্জামান রোকন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব এলাকায় প্রতিদিন দুই দফায় ফগিং ও স্প্রে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি বাড়ি বাড়ি লিফলেট বিতরণ করে জনসচেতনতা বাড়ানো এবং বাসাবাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখার আহ্বান জানানো হচ্ছে।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মোহাম্মদ মাইন উদ্দিন খান এশিয়া পোস্টকে জানান, বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়া স্বাভাবিক। রোগীর চাপ বিবেচনায় হাসপাতালে পৃথক আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত রাখতে হাসপাতাল প্রস্তুত রয়েছে।

তার মতে, জ্বর ও শরীরে র‍্যাশ নিয়ে আসা রোগীদের দ্রুত পরীক্ষা করিয়ে ডেঙ্গু শনাক্ত করা গেলে জটিলতা অনেকটাই কমানো সম্ভব।

বিষয় :ময়মনসিংহ