Advertisement

অন্যকে হাই তুলতে দেখলেও কেন নিজের হাই আসে

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
অন্যকে হাই তুলতে দেখলেও কেন নিজের হাই আসে
হাই হলো শরীরের একটি স্বয়ংক্রিয় প্রতিক্রিয়া।

হাই তোলা এমন একটি স্বাভাবিক শারীরিক প্রতিক্রিয়া, যা প্রায় সবাই প্রতিদিনই অনুভব করেন। অফিসে কাজ করতে করতে, ক্লাসে বসে, রাতে ঘুমানোর আগে কিংবা সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর হঠাৎ করেই মুখ বড় করে হাই উঠে যেতে পারে। এমনকি অন্য কাউকে হাই তুলতে দেখলেও নিজের অজান্তেই হাই চলে আসে অনেক সময়।

কিন্তু মানুষ কেন হাই তোলে? এটি কি শুধু ঘুম পাওয়ার লক্ষণ, নাকি এর পেছনে আরও কোনো বৈজ্ঞানিক কারণ রয়েছে?

বিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরে এ বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করলেও এখনো একটি নির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিতভাবে বলতে পারেননি। তবে বেশ কয়েকটি শক্তিশালী তত্ত্ব রয়েছে, যেগুলো হাই তোলার সম্ভাব্য ব্যাখ্যা দেয়।


হাই আসলে কী?

হাই হলো শরীরের একটি স্বয়ংক্রিয় প্রতিক্রিয়া। এতে মানুষ সাধারণত মুখ অনেকটা খুলে গভীরভাবে শ্বাস নেয়, এরপর ধীরে ধীরে শ্বাস ছেড়ে দেয়। পুরো প্রক্রিয়াটি সাধারণত ৫ সেকেন্ডের মতো স্থায়ী হয়। অনেক সময় এর সঙ্গে শরীর টানটান করে হাত-পা প্রসারিত করার প্রবণতাও দেখা যায়।

শুধু ঘুম পেলেই কি হাই ওঠে?

অনেকেই মনে করেন, হাই মানেই ঘুম পাচ্ছে। আসলে বিষয়টি এতটা সহজ নয়।

হাই সাধারণত বেশি দেখা যায় যখন একজন মানুষ জেগে থাকা থেকে ঘুমের দিকে যাচ্ছে অথবা ঘুম থেকে জেগে উঠছে। এছাড়া দীর্ঘ সময় একঘেয়ে কাজ করলে, বিরক্ত লাগলে বা মনোযোগ কমে গেলে হাই উঠতে পারে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এসব সময়ে হাই শরীরকে আরও সতর্ক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করতে পারে।

মস্তিষ্ককে ঠান্ডা রাখার সঙ্গে কি সম্পর্ক আছে?

বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত তত্ত্বগুলোর একটি হলো, হাই মস্তিষ্কের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে।

যখন আমরা হাই তুলি, তখন চোয়াল, মুখ ও মাথার কিছু পেশি সক্রিয় হয় এবং গভীর শ্বাস নেওয়া হয়। এতে মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল কিছুটা পরিবর্তিত হয় এবং তুলনামূলক ঠান্ডা বাতাস শরীরে প্রবেশ করে। গবেষকদের ধারণা, এর মাধ্যমে মস্তিষ্কের তাপমাত্রা কিছুটা কমে যেতে পারে, যা তাকে আরও কার্যকরভাবে কাজ করতে সাহায্য করে।

তবে এটিও এখনো একটি তত্ত্ব। এ নিয়ে আরও গবেষণা চলছে।

অন্যকে হাই তুলতে দেখলে নিজেরও হাই কেন আসে?

এটি সম্ভবত হাই তোলার সবচেয়ে মজার দিক।

আপনি নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন, কেউ হাই তুললে আপনিও কিছুক্ষণের মধ্যে হাই তুলে ফেলেন। শুধু সামনে বসে থাকা মানুষ নয়, ছবি, ভিডিও বা এমনকি হাই নিয়ে পড়তে পড়তেও অনেকের হাই চলে আসে।

এটিকে বলা হয় সংক্রামক হাই বা কনটেজিয়াস ইয়নিং।

গবেষকদের ধারণা, এটি মানুষের সামাজিক আচরণ ও সহমর্মিতার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। যাদের সঙ্গে আমাদের মানসিক সম্পর্ক বেশি, যেমন পরিবারের সদস্য বা ঘনিষ্ঠ বন্ধু, তাদের হাই আমাদের মধ্যেও সহজে ছড়িয়ে পড়ে। তবে ঠিক কী কারণে এটি ঘটে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি।

আগে যে ধারণা ছিল, এখন তা কতটা সত্য?

অনেক বছর ধরে ধারণা করা হতো, শরীরে অক্সিজেন কমে গেলে বা কার্বন ডাই অক্সাইড বেড়ে গেলে মানুষ হাই তোলে।

কিন্তু আধুনিক গবেষণায় এই ধারণার পক্ষে শক্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অতিরিক্ত অক্সিজেন দিলেও হাই কমে না। তাই বিজ্ঞানীরা এখন মনে করেন, হাই তোলার কারণ শুধু অক্সিজেনের ঘাটতি নয়।

কখন বেশি হাই উঠতে পারে?

নিচের পরিস্থিতিতে হাই বেশি দেখা যেতে পারে।

ঘুম কম হলে, অতিরিক্ত ক্লান্ত থাকলে, দীর্ঘ সময় একঘেয়ে কাজ করলে, সকালে ঘুম থেকে ওঠার সময়, রাতে ঘুমানোর আগে, মানসিক চাপ বা উদ্বেগের সময় বা অন্য কাউকে হাই তুলতে দেখলে

অতিরিক্ত হাই কি কোনো সমস্যার লক্ষণ?

মাঝেমধ্যে হাই তোলা একেবারেই স্বাভাবিক। তবে খুব ঘন ঘন বা অস্বাভাবিকভাবে হাই উঠলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।

অতিরিক্ত হাইয়ের পেছনে ঘুমের সমস্যা, যেমন স্লিপ অ্যাপনিয়া, দীর্ঘদিনের ঘুমের ঘাটতি বা কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকতে পারে। বিরল ক্ষেত্রে এটি স্নায়ুতন্ত্র বা হৃদ্‌যন্ত্রের কিছু সমস্যার সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে।

যদি অতিরিক্ত হাইয়ের সঙ্গে বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা, অজ্ঞান হওয়ার অনুভূতি বা অন্য কোনো অস্বাভাবিক উপসর্গ থাকে, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

প্রাণীরাও কি হাই তোলে?

হ্যাঁ। মানুষ ছাড়াও অনেক স্তন্যপায়ী প্রাণী, পাখি এমনকি কিছু সরীসৃপের মধ্যেও হাই তোলার আচরণ দেখা যায়। এটি ইঙ্গিত করে যে হাই একটি প্রাচীন জৈবিক আচরণ, যা বিবর্তনের অনেক আগেই তৈরি হয়েছে। তবে বিভিন্ন প্রাণীর ক্ষেত্রে এর উদ্দেশ্য এক কি না, তা এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি।

হাই তোলা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের খুবই সাধারণ একটি ঘটনা। আগে এটি শুধু ঘুম বা অলসতার লক্ষণ বলে মনে করা হলেও, আধুনিক গবেষণা বলছে বিষয়টি অনেক বেশি জটিল। মস্তিষ্কের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, সতর্কতা বাড়ানো, সামাজিক যোগাযোগ এবং সহমর্মিতার মতো বিভিন্ন বিষয় এর সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে।

তবে একটি বিষয় নিশ্চিত। হাই তোলা শরীরের স্বাভাবিক একটি প্রতিক্রিয়া এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি উদ্বেগের কারণ নয়। যদিও এর প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে বিজ্ঞানীদের গবেষণা এখনো চলছে, প্রতিটি নতুন গবেষণা আমাদের এই পরিচিত অভ্যাস সম্পর্কে আরও নতুন তথ্য জানাচ্ছে।

সূত্র: বিবিসি, ওয়েব মেড,ইউনিভার্সিটি অব মিয়ামি নিউজ