কত দিন পরপর বিছানার চাদর ধোয়া উচিত

এপি নিউজ
কত দিন পরপর বিছানার চাদর ধোয়া উচিত

অনেকেই মনে করেন পরিষ্কার চাদর মানেই নিরাপদ ঘুম। কিন্তু বাস্তবে আপনি কখনোই একা ঘুমান না। আপনার বিছানায় থাকে অসংখ্য ধুলিকণা, ব্যাকটেরিয়া, ডাস্ট মাইট এবং শরীর থেকে ঝরে পড়া মৃত ত্বকের কোষ। এর সঙ্গে বাইরে থেকে আসা ধুলা বা অ্যালার্জেনও বিছানায় জমতে পারে।

Advertisement

চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, বিছানার চাদর অন্তত সপ্তাহে একবার ধোয়া উচিত। এতে ঘুমের সময় শরীরের সঙ্গে থাকা জীবাণু ও অ্যালার্জেনের (অ্যালার্জেন , এমন পদার্থ যা কিছু ব্যক্তির মধ্যে অ্যালার্জির অতি সংবেদনশীল অবস্থা সৃষ্টি করে) পরিমাণ কমে। বালিশ ও কম্বল তুলনামূলক কম ধোয়া লাগে, তবে কয়েক মাস পরপর পরিষ্কার করা ভালো। গরমের সময় বা বাড়িতে পোষা প্রাণী থাকলে এগুলো আরও ঘন ঘন ধোয়ার প্রয়োজন হতে পারে।

বাংলাদেশের মতো গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় ঘাম বেশি হওয়ার কারণে বিছানার চাদর দ্রুত নোংরা হয়। তাই নিয়মিত পরিষ্কার রাখা স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

বিছানার চাদরে কী কী জমে

আমরা প্রতিদিন অনেক সময় বিছানায় কাটাই। ফলে চাদর ধীরে ধীরে বিভিন্ন ময়লা ও জীবাণুর জন্য উপযুক্ত পরিবেশ হয়ে ওঠে। সাধারণত সেখানে জমে থাকে

- ডাস্ট মাইট (ডাস্ট মাইট হলো ঘরের ধুলোয় বসবাসকারী অত্যন্ত ক্ষুদ্র, আণুবীক্ষণিক প্রাণী)

- মৃত ত্বকের কোষ

- ঘাম ও শরীরের তেল

- ধুলা ও ময়লা

- ব্যাকটেরিয়া

- অ্যালার্জেন, যেমন ধুলা বা পোষা প্রাণীর লোম

মানুষ প্রতিদিন প্রায় দেড় গ্রাম মৃত ত্বক ঝরায়। পরিমাণটি দেখতে প্রায় আধা চা চামচের মতো। ঘুমের সময় চাদরের সঙ্গে শরীরের ঘর্ষণের কারণে এই ত্বকের কোষগুলো সহজেই বিছানায় জমে যায়।

এই মৃত ত্বক ব্যাকটেরিয়া ও ডাস্ট মাইটের জন্য খাবারের মতো কাজ করে। ফলে বিছানার পরিবেশ দ্রুত নোংরা হয়ে উঠতে পারে।

কত দিন পরপর চাদর ধোয়া দরকার তা কিছু বিষয়ের ওপর নির্ভর করে

বিছানার চাদরে থাকা অদৃশ্য জীবাণু ত্বকে র‍্যাশ, চুলকানি বা একজিমার মতো সমস্যার কারণ হতে পারে। কিছু পরিস্থিতিতে চাদর আরও ঘন ঘন ধোয়া দরকার। যেমন

- যদি কারও হাঁপানি বা অ্যালার্জি থাকে

- যদি খুব বেশি ঘাম হয়

- আবহাওয়া খুব গরম বা আর্দ্র হলে

- পোষা প্রাণী বিছানায় ঘুমালে

- অসুস্থতা বা সংক্রমণ থেকে সেরে ওঠার সময়

- যদি কেউ কাপড় ছাড়া ঘুমায়

কোন লক্ষণ দেখলে বুঝবেন চাদর ধোয়া দরকার

চাদর দেখতে পরিষ্কার মনে হলেও ভেতরে ময়লা জমে থাকতে পারে। কিছু লক্ষণ দেখলে দ্রুত ধুয়ে ফেলা ভালো। যেমন

- চাদরের রঙ ফ্যাকাশে বা বদলে যাওয়া

- চাদর আঠালো বা ময়লা মনে হওয়া

- দৃশ্যমান দাগ

- ঘামের দাগ

- দুর্গন্ধ

- চাদরে ধুলা, খাবারের কণা বা পোকামাকড়ের উপস্থিতি

পরিষ্কার চাদরের উপকারিতা

নিয়মিত চাদর ধোয়া শুধু পরিষ্কার রাখে না, বরং ভালো ঘুমের পরিবেশ তৈরি করে। এর কিছু উপকারিতা হলো

- ঘুমের মান উন্নত হয়

- শরীর ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে

- অ্যালার্জির উপসর্গ কমায়

- ত্বকের জ্বালা বা অস্বস্তি কমায়

- দুর্গন্ধ ও দাগ দূর করে

- ত্বক সুস্থ রাখতে সাহায্য করে

- আরামদায়ক অনুভূতি দেয়

বিছানা পরিষ্কার রাখার সহজ উপায়

বিছানাকে যতটা সম্ভব পরিষ্কার রাখতে কিছু সহজ অভ্যাস গড়ে তোলা দরকার।

নিয়মিত চাদর পরিবর্তন করুন : প্রতি এক থেকে দুই সপ্তাহে চাদর পরিবর্তন করা ভালো। কম্বল, বালিশ বা অন্য বিছানার জিনিস প্রয়োজন অনুযায়ী বা প্রায় ছয় মাস পরপর ধোয়া যেতে পারে।

গরম পানিতে ধোয়া ভালো : গরম পানি ডাস্ট মাইট ধ্বংস করতে সাহায্য করে এবং কাপড় ভালোভাবে পরিষ্কার করে।

ঘুম থেকে উঠেই বিছানা গুছিয়ে ফেলবেন না : সকালে কিছু সময় বিছানা খোলা রাখলে ঘামের আর্দ্রতা শুকিয়ে যায়। এতে ডাস্ট মাইট ও ব্যাকটেরিয়া কম বাড়ে।

ম্যাট্রেস পরিষ্কার করুন : প্রতি কয়েক মাস পরপর ম্যাট্রেস ভ্যাকুয়াম করা উচিত। এতে ধুলো, মৃত ত্বক ও ডাস্ট মাইট কমে।

অন্য বিছানার জিনিস কতদিন পরপর পরিষ্কার করবেন

চাদরের পাশাপাশি অন্য বিছানার জিনিসও নিয়মিত পরিষ্কার রাখা দরকার। সংক্ষেপে সময়সূচি হতে পারে

চাদর: প্রতি ১ থেকে ২ সপ্তাহ

ম্যাট্রেস কভার: প্রতি ১ থেকে ২ সপ্তাহ

ডুভেট কভার: প্রতি ১ থেকে ২ সপ্তাহ

ডুভেট বা লেপ: বছরে অন্তত ২ বার

কম্বল: প্রতি ১ থেকে ২ মাস

বালিশ: প্রতি ৩ থেকে ৬ মাস

ম্যাট্রেস: প্রতি ৩ থেকে ৬ মাসে ভ্যাকুয়াম

ম্যাট্রেস টপার: প্রয়োজন অনুযায়ী পরিষ্কার

বিছানার চাদর ধোয়ার ৫টি কার্যকর পরামর্শ

নিয়মিত ছোট লোডে কাপড় ধোয়ার অভ্যাস করুন : অনেক কাপড় জমে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা না করে অল্প অল্প করে ধোয়া ভালো। এতে কাজ সহজ হয়।

চাদর, কম্বল ও তোয়ালে আলাদা করে ধুতে হবে : এগুলোর কাপড়, আকার ও ওজন আলাদা হওয়ায় একসঙ্গে ধুলে ঠিকভাবে পরিষ্কার নাও হতে পারে।

বাড়িতে অতিরিক্ত চাদর ও তোয়ালে রাখুন : প্রতিটি বিছানার জন্য অন্তত তিন সেট চাদর রাখা সুবিধাজনক। এতে ধোয়ার সময় সমস্যা হয় না।

প্রয়োজনে ব্লিচ বা হোয়াইটনার ব্যবহার করুন : সাদা কাপড় উজ্জ্বল রাখতে এগুলো ব্যবহার করা যায়। তবে ব্যবহার করার আগে নির্দেশনা পড়ে নেওয়া জরুরি।

পানির তাপমাত্রা সম্পর্কে সতর্ক থাকুন : কিছু বিছানার কাপড় বেশি গরম পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সাধারণত মাঝারি তাপমাত্রা ও হালকা ডিটারজেন্ট ব্যবহার করা ভালো।

স্বাস্থ্যকর ঘুমের জন্য পরিষ্কার বিছানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই বিষয়টি গুরুত্ব না দিলেও বিছানার চাদরে দ্রুত জীবাণু, ধুলো ও মৃত ত্বক জমে যায়। নিয়মিত চাদর ধোয়া এবং বালিশ, কম্বল ও ম্যাট্রেস পরিষ্কার রাখলে ত্বক সুস্থ থাকে, অ্যালার্জির ঝুঁকি কমে এবং ঘুমের মানও ভালো হয়।

বিশেষ করে গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় বসবাসকারী মানুষের জন্য এই অভ্যাস আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই পরিষ্কার বিছানা শুধু আরাম নয়, সুস্থ জীবনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।